যারা আল্লাহর বিধান ব্যতীত অন্য বিধান দিয়ে শাসন করে তাদের ব্যাপারে শরীয়তের হুকুম কি?

প্রশ্ন: যারা আল্লাহর বিধান ব্যতীত অন্য বিধান দিয়ে শাসন করে তাদের ব্যাপারে শরীয়তের হুকুম কি?

তারা কি উমাইয়্যা কিংবা আব্বাসিদের মতো ‘কুফর দুনা কুফর’ এর অন্তর্গত? না তাদের কুফরটি এমন বড় কুফর যা কোন ব্যক্তিকে ইসলামের গন্ডী থেকে বের করে দেয়?

আর আমাদের উপর এসব শাসকদের ব্যাপারে হুকুম কি যেন এ ব্যাপারে আল্লাহর সামনে আমরা ক্ষমা পেতে পারি (সে অনুযায়ী কাজ করে), যদি উভয় প্রেক্ষিতেই হয়?

উত্তর: যারা আল্লাহ যে বিধান দিয়েছেন তা অনুযায়ী শাসন করে না, এবং মানব রচিত আইন দ্বারা শাসন করে, অথবা তাদের খেয়াল খুশি ও ঐতিহ্যনুযায়ী (বাপ দাদা, গোত্রীয় ইত্যাদি) করে, তাহলে তারা কাফের ও মুশরিক।

আল্লাহ বলেন,

وَلَا يُشْرِكُ فِي حُكْمِهِ أَحَدًا

“তিনি কাউকে নিজ কর্তৃত্বে শরীক করেন না।” (সূরা কাহাফ – ২৬)

আল্লাহ আরও বলেন,

إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ

“নির্দেশ চলে আল্লাহর” (সূরা ইউসূফ – ৬৭)

ইজমা অনুযায়ী তাদের কুফর হচ্ছে বড় কুফর (কুফর আল আকবার),আর এ ইজমার ব্যাপারে ইবনে কাসির ও আধুনিক যুগের আহলে সুন্নাতের অনেক উলামা বর্ণনা করেছেন।

আল্লাহ বলেন,

وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَـٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ

“যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফায়সালা করে না, তারাই কাফের।” (সূরা মায়েদা – ৪৪)

আল্লাহ আরও বলেন,

أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَن يَكْفُرُوا بِه

“আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা দাবী করে যে, যা আপনার প্রতি অবর্তীর্ণ হয়েছে আমরা সে বিষয়ের উপর ঈমান এনেছি এবং আপনার পূর্বে যা অবর্তীণ হয়েছে। তারা বিরোধীয় বিষয়কে শয়তানের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে, যাতে তারা ওকে মান্য না করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।” (সূরা নিসা – ৬০)

এবং আল্লাহ বলেন,

أَمْ لَهُمْ شُرَكَاءُ شَرَعُوا لَهُم مِّنَ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَن بِهِ اللَّهُ

তাদের কি এমন শরীক দেবতা আছে, যারা তাদের জন্যে সে ধর্ম সিদ্ধ করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি ? যদি চুড়ান্ত সিন্ধান্ত না থাকত, তবে তাদের ব্যাপারে ফয়সালা হয়ে যেত। নিশ্চয় যালেমদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা আশ-শুরা ২১)

 

আর আজ আমরা এটাই ঘটতে দেখছি। আপনি দেখবেন, আদালত গুলো মানব রচিত আইন দ্বারা মানুষদের মাঝে বিচার ফয়সালা করে, যদিও কোন কোন স্থানে এর আসল গোমর ফাঁস করা হয় না (অর্থ্যাত এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে থাকা ধোঁকা ও জুলুমের আসল চরিত্র প্রকাশ পায় না)।

আসল বিষয় হচ্ছে এগুলো (তাদের আইন) কি অর্থ ও প্রকৃত অবস্থা বহন করে সেটা, তাদের দেয়া এসবের (আইন কানুনের) নাম ও এর ব্যাপারে ধোঁকাবাজি (মানুষের কাছে ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা) ধর্তব্যের বিষয় নয়।
আর শাসক ও বিচারকের ব্যাপারে বলতে হলে, যদি তারা কোন একটি বিশেষ ব্যাপারে তাদের লালসা-বাসনার চরিতার্থ হয়ে হুকুম প্রদান করে, এবং সেটি (মানব রচিত) আইন, রীতি, প্রতিষ্ঠান, প্রথা অনুযায়ী না হয়, তবে তা ‘কুফর দুনা কুফর’ (ছোট কুফর), নিম্নোক্ত হাদীস অনুযায়ীঃ

الْقُضَاةُ ثَلاَثَةٌ قَاضِيَانِ فِي النَّارِ

“বিচারক তিন প্রকারেরঃ এদের দু’জন জাহান্নামে…” তারপর তিনি (সা) উল্লেখ করেন মূর্খ বিচারক এবং যে নিজের খেয়াল খুশির অনুসরণ করে বিচার করে, আর এটাই আমরা সাক্ষ্য দেই।

(আবু দাউদ, তিরমিযী)

 

ইবনে আব্দুল বার তাঁর ‘আত-তামহীদে’ এ ব্যাপারে ইজমার বর্ননা করেছেন যে, এগুলো হচ্ছে কবিরা গুনাহর উদাহরণ। আর এটা উমাইয়্যাহ ও আব্বাসীয়দের সময় হয়েছিলো।

 

প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশ : আর আমাদের উপর এসব শাসকদের ব্যাপারে হুকুম কি যেন এ ব্যাপারে আল্লাহর সামনে আমরা ক্ষমা পেতে পারি (সে অনুযায়ী কাজ করে), যদি উভয় প্রেক্ষিতেই হয়?

উত্তরঃ
তাদের মানব রচিত জুলুমের আদালত সমূহে না যাওয়া এবং ইব্রাহীম (আ) এঁর মিল্লাত (বিশুদ্ধ তাওহীদের পথ) আঁকড়ে থাকা।

إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَآءُ مِنكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّىٰ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ
” তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিলঃ তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার এবাদত কর, তার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের মানি না। তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে। ” (সূরা মুমতাহিনা – ৪)

আর এই আয়াত অনুযায়ী,

فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ
“অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয় এবং মুশরিকদের পরোয়া করবেন না।” (সূরা হিজর – ৯৪)

আল্লাহ বলেন,

اتَّبِعْ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ۖ لَا إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ

“আপনি পথ অনুসরণ করুন, যার আদেশ পালনকর্তার পক্ষ থেকে আসে। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই এবং মুশরিকদের তরফ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন।” (সূরা আন’আম – ১০৬)

আল্লাহ বলেন,

قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ لَا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ

“বলুন, হে কাফেরকূল, আমি এবাদত করিনা,তোমরা যার এবাদত কর।” (সূরা কাফিরুন ১-২)

 

আর এটা হওয়া উচিত ঘৃনা ও শত্রুতার মিশেলে এবং এতে কোন ঐক্যের সূর থাকবে না।

আল্লাহ বলেন,

لَّا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ

“যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয়।” (সূরা মুজাদালাহ – ২২)

আর সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, যদি হিজরতের পর ক্ষতির সম্ভাবনা অল্প থাকে।

আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنَافِقِينَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ وَمَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ

“হে নবী! কাফের ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জেহাদ করুন এবং তাদের প্রতি কঠোর হোন। তাদের ঠিকানা জাহান্নাম। সেটা কতই না নিকৃষ্ট স্থান।” (সূরা আত তাহরীম – ৯)

অথবা অস্ত্র ছাড়া জিহাদ করা (তাদের বিরোধীতার মাধ্যমে) এবং ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করা যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর সিদ্ধান্ত প্রেরণ করেন,

আল্লাহ বলেন,

فَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَجَاهِدْهُم بِهِ جِهَادًا كَبِيرًا

“অতএব আপনি কাফেরদের আনুগত্য করবেন না এবং তাদের সাথে এর (কুর’আন) সাহায্যে কঠোর সংগ্রাম করুন।” (সূরা ফোরকান – ৫২)

উত্তর প্রদানে: শাইখ আলি ইবনে খুদাইর আল খুদাইর [আল্লাহ তাঁর মুক্তি ত্বরান্বিত করুন]

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *