ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ? – ৪

ভূমিকা ও প্রথম পর্ব  | দ্বিতীয় পর্ব  | তৃতীয় পর্ব

মরহুম শায়খ পৃষ্ঠা ৯ এর শেষে উল্লেখ করেছেন

“যুদ্ধের ক্ষেত্রেও উভয়পক্ষ প্রতিপক্ষের সৈন্য ও নাগরিকদের মধ্যে ভীতিসঞ্চারে সচেষ্ট থাকে। তবে সন্ত্রাসের সাথে যুদ্ধের মৌলিক পার্থক্য হলো, সাধারণ যুদ্ধ ও গেরিলা যুদ্ধ উভয় ক্ষেত্রেরই যোদ্ধারা মূলত যোদ্ধা বা যুদ্ধবিষয়ক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে সচেষ্ট থাকে এবং সামরিক বিজয়ই লক্ষ্য থাকে।

পক্ষান্তরে সন্ত্রাসের ক্ষেত্রের সামরিক বিজয় উদ্দেশ্য থাকে না। এক্ষেত্রে মূল উদ্দেশ্যেই হলো সামরিক-অসামরিক নির্বিচারে সকল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা।”

বরাবরের মতই মরহুম শায়খ পূর্বের লাইনের সাথে পরের লাইনের সামঞ্জস্য দেখাতে পারেন নি। অধমের কাছে বোধগম্য নয়, শায়খ শুরুতে বললেন সন্ত্রাসী/সন্ত্রাস কাদের/কাকে বলা হয় তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

কিন্তু এই প্যারাতে দেখা যাচ্ছে যে, শায়খ খুজে পেয়েছেন। কিভাবে, কোথা থেকে উল্লেখিত তাও পরিষ্কার করা হয়নি। কিন্তু শায়খ এখানে একটি সংজ্ঞায়ন করেছেন, যদিও এটার কোনো সুত্র উনি উল্লেখ করেন নি।

স্পষ্টতই কুর’আন-সুন্নাহ’র আলোকে এই সংজ্ঞাটি সনদের ক্ষেত্রে সদা সতর্ক শায়খ দেন নি। তাই এই সংজ্ঞাটি উনি কোথা থেকে পেলেন তা স্পষ্ট নয়।

সুবহান’আল্লাহ! আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনার প্রয়োজন আছে। কেননা ১/২ লাইনের মারপ্যচেই পাঠককে বিভ্রান্ত করা হয়। বিশেষ করে যে বই ভ্রান্তির উপর লিখিত, সে বইয়ের প্রতিটি লাইন কখনোই প্রমাণিত করা সম্ভব না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আমি পাঠকদের মনোযোগের সাথে বিশ্লেষণের আহ্বান জানাব তা হচ্ছে, আল্লাহ্‌ তা’আলার রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি শুধুমাত্র রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেছেন?

রাষ্ট্রের ধারণাই তো তৎকালীন সময়ে এত ব্যাপকভাবে ছিল না।

বনি কুরাইজার বিরুদ্ধে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর আচরণ অবশ্যই হাদ্দ কিংবা ক্কিসাস নয়। কেননা তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যাক্তি এবং নারী ছাড়া বাকী সবাই অবশ্যই যুদ্ধে শরিক হয়নি। এবং তাদেরকে যুদ্ধ চলাকালীনও হত্যা করা হয়নি।

শায়খের সংজ্ঞানুযায়ী একে কোনোভাবেই যুদ্ধ বলা যায় না।

শায়খ প্রদত্ত সংজ্ঞানুযায়ী একে যদি কিছু বলতে হয় তবে ‘সন্ত্রাস’ই বলতে হয়। লা হাওলা ওয়ালা ক্কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। আল্লাহ্‌ তা’আলা শায়খকে ক্ষমা করে দিন। আমীন।

এছাড়াও আরও তিনটি বিষয় আলোচনা করা হলো –

১/ স্ববিরোধী বক্তব্যঃ
শায়খ লিখেছেন, যুদ্ধের ক্ষেত্রেও উভয়পক্ষ প্রতিপক্ষের সৈন্য ও নাগরিকদের মধ্যে ভীতিসঞ্চারে সচেষ্ট থাকে।

আবার নিচে লিখেছেন, পক্ষান্তরে সন্ত্রাসের ক্ষেত্রের সামরিক বিজয় উদ্দেশ্য থাকে না। এক্ষেত্রে মূল উদ্দেশ্যেই হলো সামরিক-অসামরিক নির্বিচারে সকল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা।

সৈন্য ও নাগরিক দ্বারা কী উদ্দেশ্য? স্বাভাবিকভাবেই এটা বুঝে আসে যে, সৈন্য হচ্ছে সামরিক ব্যক্তিত্ব এবং নাগরিক হচ্ছে বেসামরিক ব্যক্তিত্ব। এছাড়াও, শায়খ এখানে “এবং” অব্যয় ব্যবহার করেছেন যা দ্বারা স্পষ্টতই বুঝে আসে যে, যুদ্ধে বেসামরিকদের আক্রমনও করা হয় ভীতিসঞ্চারের উদ্দেশ্যে।

পরবর্তী বক্তব্যের সাথে তাই সংঘর্ষ হচ্ছে। কেননা সন্ত্রাসের উদ্দেশ্যও সামরিক-বেসামরিকদের মাঝে ভীতিসঞ্চার করা।

বাকী থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার বিষয়টি। এমন কোনো ব্যক্তি দুনিয়ার বুকে রয়েছে কি, যে বলবে যুদ্ধের উদ্দেশ্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা নয়?

মূলতঃ এই স্পষ্টতই স্ববিরোধী বক্তব্য থেকে বুঝে আসে যে, মরহুম শায়খ শুধুমাত্র কলম চালিয়েছেন এবং উনার গুনমুগ্ধ ভক্তরা শুধু পড়েই গিয়েছেন। যাচাই-বাছাই কিংবা সত্যানুসন্ধানের মেজাজ লেখক-পাঠক উভয়ের মাঝেই ছিল অনুপস্থিত।

২/ সন্ত্রাসের অসম্পূর্ণ সংজ্ঞাঃ

যে ব্যক্তি টাকার বিনিময়ে খুন করে তাকে কি আমরা সন্ত্রাসী বলি না?

ছিনতাইকারী/চাঁদাবাজদের কে কি সন্ত্রাসী বলা হয় না?

যদি এদের সন্ত্রাসী বলা হয়, তাহলে পাঠকের কাছে প্রশ্ন থাকে – টাকার বিনিময়ে খুন করা কিংবা ছিনতাই করার মাঝে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কিভাবে হাসিল হয় !?!

অর্থাৎ, সংজ্ঞাটি অসম্পূর্ণ। বেখেয়াল ব্যক্তি কিংবা শায়খের গুনমুগ্ধ পাঠকমাত্রই বিষয়টি এড়িয়ে যাবেন।

কিন্তু এমন প্রশ্ন তো আসাটা একেবারেই স্বাভাবিক ছিল যে, কেন শায়খ কুর’আন-সুন্নাহ’র চিরন্তন মানদন্ডকে বাদ দিয়ে জোর করে এমন একটি সংজ্ঞা দাড় করাতে চাইলেন যে সংজ্ঞায় কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত মুসলিমদের সন্ত্রাসীরূপে চিত্রায়িত করা যায়?

৩/ একচোখা বিশ্লেষণঃ

শায়খ বলেছেন, “সাধারণ যুদ্ধ ও গেরিলা যুদ্ধ উভয় ক্ষেত্রেরই যোদ্ধারা মূলত যোদ্ধা বা যুদ্ধবিষয়ক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে সচেষ্ট থাকে এবং সামরিক বিজয়ই লক্ষ্য থাকে।“ যে বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য তা হচ্ছে, যে কোনো দল কিংবা সামরিক শক্তি অবশ্যই প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার চেষ্টায় থাকে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

তানজিম আল-কায়দা থেকে শুরু করে গোটা দুনিয়াতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোট-মাঝারি-বড় সকল দলেরই উদ্দেশ্য থাকে সামরিক বিজয়। শায়খ যদি বলেন যে, এদের সামরিক বিজয় অর্জন করা লক্ষ্য নয় তবে, আফগানিস্তান-সিরিয়া-সোমালিয়া-মালি-ইয়েমেনেসহ অন্যান্য জিহাদি মারেকাগুলোর দিকে পাঠকদের সজাগ দৃষ্টিপাত করার আহ্বান জানাচ্ছি, যা শায়খের উক্ত বক্তব্যের অসারতা স্পষ্ট করে তুলবে।

সন্ত্রাসের সংজ্ঞায়নে শায়খ বলেছেন, এক্ষেত্রে মূল উদ্দেশ্যেই হলো সামরিক-অসামরিক নির্বিচারে সকল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা।

আমি পাঠকদের অনুরোধ করব, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস অধ্যায়ন করতে। কেননা এদুটো শুধু যুদ্ধ হিসেবেই স্বীকৃত নয়, বরং বিশ্বযুদ্ধ হিসেবে স্বীকৃত। দুটি যুদ্ধেই গণহারে নিহত হয়েছে কয়েক লক্ষ বেসামরিক ব্যক্তি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শুধু বেসামরিক ইহুদিই হত্যা করা হয়েছে ছয় মিলিয়ন। নিঃসন্দেহে বিশ্বযুদ্ধগুলোতে সামরিক ব্যক্তির চেয়ে অনেকগুন বেশী বেসামরিক ব্যক্তি আক্রমণের শিকার হয়েছে। জাপানে আণবিক বোমার মাধ্যমে আমেরিকা হত্যা করেছে কয়েক লক্ষ জাপানি। যাদের প্রায় সবাইই ছিল বেসামরিক।

এছাড়াও নানকিং ও জাপানি গ্রামগুলোতে মিত্রবাহিনীর গনধর্ষণের কথা তো রয়েই গেলো। এখন, প্রশ্ন থেকে যায় – ইতিহাসের বইগুলোতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কী হিসেবে উল্লেখিত? সন্ত্রাস নাকি যুদ্ধ?

অবশ্যই এখানে নির্বিচার হত্যার পক্ষে সাফাই গাওয়া হচ্ছে না। মূলতঃ সন্ত্রাস ও যুদ্ধের সংজ্ঞায়নে মরহুম শায়খের বিশ্লেষণের ফাঁক তুলে ধরাই উদ্দেশ্য।

উপরন্তু দেখুন,
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শান্তিকামী আমেরিকা এবং তার মিত্ররা মাত্র কয়কে বছরে ৪০ লক্ষ মুসলিম হত্যা করেছে। এবং এখনো চলছ। একেও বলা হচ্ছে যুদ্ধ। সন্ত্রাস বলা হচ্ছে না।

এর আগে নব্বইয়ের দশকে আমেরিকা কর্তৃক ইরাকের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে অনাহারে মারা যায় প্রায় ১০ লক্ষ মুসলিম শিশু ‘সন্ত্রাসী। কিন্তু একেও তো বলা হয় উপসাগরীয় যুদ্ধ। সন্ত্রাস তো বলা হচ্ছে না।

সিরিয়াতে রাশিয়া, তুরস্ক, আমেরিকা গণহারে এয়ার রেইডের মাধ্যমে সহস্রাধিক নারী-শিশু হত্যা করছে।

ইয়েমেনে আরব আমিরাত, সৌদি আরব হত্যা করেছে কয়েক হাজার আহলুস সুন্নাহ’র মুসলমান। ইয়েমেনে একদিনেই এক বিয়েবাড়িতে সৌদি জঙ্গি বিমানের আক্রমণে শহিদ হয় ১৫০’র মত মুসলমান !! 

প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে, কেন এটা ‘ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ’ হয় না!??!

দেখুন, পশ্চিমাদের সন্ত্রাস/সন্ত্রাসীর সংজ্ঞায়ন দ্বারা মরহুম শায়খ প্রভাবিত হয়েছেন কি না? (যদিও, কয়েক লাইন পরেই উনি অবশ্য সরাসরি পশ্চিমা সংজ্ঞা উদ্ধৃতি করে তার স্বপক্ষে বক্তব্য পেশ করেছেন।)

উনি পূর্বে লম্বা আলোচনা করে দেখালেন সন্ত্রাসের যথাযথ সংজ্ঞায়ন সম্ভব নয়, অথচ পশ্চিমারা মুসলিম রক্তপ্রবাহের গ্রহণযোগ্যতা আদায়ে সন্ত্রাসের যেভাবে সংজ্ঞা দিয়ে থাকে দুঃখজনকভাবে তিনিও একই সংজ্ঞা দিয়ে দিলেন… উদ্দেশ্য আশা করি পাঠকের কাছে স্পষ্ট।

মরহুম শায়খের এই সংজ্ঞায়নের উপরই বইয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছে। অথচ উনার সংজ্ঞায়নের বিশ্লেষণ হয়েছে কাফিরদের সন্ত্রাস হাল্কাভাবে নেয়া ও মুসলমানদের সন্ত্রাসী প্রমাণ করার একচোখা নীতির উপর।

ওয়ালা হাওলা ওয়ালা ক্কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

One thought on “ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ? – ৪

  1. Pingback: ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ – ৬ | নবধারা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *