‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ শুধু মুখে উচ্চারণই যথেষ্ট নয়

মূলঃ ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (রাহিমাহুল্লাহ)

পিডিএফ ডাউনলোড

[যারা মনে করে যে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ মুখে বলাই তাওহীদের জন্য যথেষ্ট, বাস্তবে তার বিপরীত কিছু করলেও ক্ষতি নেই, তাদের উক্তি ও যুক্তির খন্ডন]

মুশরিকদের মনে আর একটা সংশয় বদ্ধমূল হয়ে আছে। তাহল এই যে, তারা বলে থাকে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কালেমা পাঠ করা সত্ত্বেও হযরত উসামা (রাঃ) যাকে হত্যা করেছিলেন, নবী (ﷺ) সেই হত্যাকান্ডটাকে সমর্থন করেননি।

এইরূপ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর এই হাদীসটিও তারা পেশ করে থাকে যেখানে তিনি বলেছেনঃ “আমি লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি যে পর্যন্ত না তারা বলে (মুখে উচ্চারণ করে) ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’।”

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর উচ্চারণকারীদের হত্যা করা সম্বন্ধেও আরও অনেক হাদীস তারা তাদের মতের সমর্থনে পেশ করে থাকে।

এই মূর্খদের এসব প্রমান পেশ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, যারা মুখে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ উচ্চারণ করবে তাদেরকে কাফের বলা যাবে না এবং তারা যা ইচ্ছা তাই করুক, তাদেরকে হত্যা করাও চলবে না।

এই সব জাহেল মুশরিকদের বলে দিতে হবে যে, একথা সর্বজনবিদিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং তাদেরকে ইয়াহুদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন এবং তাদেরকে কয়েদ করেছেন যদিও তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলত।

আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবাগণ বানূ হানীফার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন যদিও তারা সাক্ষ্য দিয়েছিল যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল; তারা নামাযও পড়তো এবং ইসলামেরও দাবী করত।

ঐ একই অবস্থা তাদের সম্বন্ধেও প্রযোজ্য যাদেরকে হযরত আলী (রাঃ) আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়া ঐ সব জাহেলরা স্বীকার করে যে, যারা পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে তারা কাফের হয়ে যায় এবং হত্যারও যোগ্য হয়ে যায় তারা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা সত্ত্বেও।

অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের যে কোন একটিকে অস্বীকার করে, সে কাফের হয়ে যায় এবং সে হত্যার যোগ্য হয় যদিও সে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে।

তা হলে ইসলামের একটি অঙ্গ অস্বীকার করার কারণে যদি তার ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর উচ্চারণ তার কোন উপকারে না আসে, তবে রাসূলগণের দ্বীনের মূল ভিত্তি যে তাওহীদ এবং যা হচ্ছে ইসলামের মুখ্য বস্তু, যে ব্যক্তি সেই তাওহীদকেই অস্বীকার করল তাকে ঐ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর উচ্চারণ কেমন করে বাঁচাতে সক্ষম হবে? কিন্তু আল্লাহর দুশমনরা হাদীস সমূহের তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করে না।
হযরত ওসামা (রাঃ) হাদীসের তাৎপর্য হচ্ছে এই যে, তিনি একজন ইসলামের দাবীদারকে হত্যা করেছিলেন এই ধারণায় যে, সে তার জান ও মালের ভয়েই ইসলামের দাবী জানিয়েছিল।

কোন মানুষ যখন ইসলামের দাবী করবে তার থেকে ইসলাম বিরোধী কোন কাজ প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত সে তার জানমালের নিরাপত্তা লাভ করবে। এ সম্বন্ধে কুরআনের ঘোষণা এই যে,

“হে মু’মিন সমাজ! যখন তোমরা আল্লাহর রাহে বহির্গত হও, তখন (কাহাকেও হত্যা করার পূর্বে) সব বিষয় তদন্ত করে দেখিও।” (সূরা নিসা ৪: ৯৪)

অর্থাৎ তার সম্বন্ধে তথ্যাদি নিয়ে দৃঢ় ভাবে সুনিশ্চিত হইও। এই আয়াত পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, এরূপ ব্যাপারে হত্যা থেকে বিরত থেকে তদন্তের পর স্থির নিশ্চিত হওয়া অবশ্য কর্তব্য।
তদন্তের পর যদি তার ইসলাম বিরোধিতা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় তবে তাকে হত্যা করা যাবে। যেমন আল্লাহ বলেছেন, (ফাতাবাইয়্যানূ) অর্থাৎ তদন্ত করে দেখ।

তদন্ত করার পর দোষী সাব্যস্ত হলে হত্যা করতে হবে। যদি এই অবস্থাতে হত্যা না করা হয় তা হলেঃ ‘ফাতাবাইয়ানু’ তাসাব্বুত (অর্থ) অর্থাৎ স্থির নিশ্চিত হওয়ার কোন অর্থ হয়না।

এইভাবে অনুরূপ হাদীসগুলোর অর্থ বুঝে নিতে হবে। ঐগুলোর অর্থ হবে যা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। অর্থাৎ যে ব্যক্তির মধ্যে তাওহীদ ও ইসলাম প্রকাশ্যভাবে পাওয়া যাবে তাকে হত্যা করা থেকে বিরত থাকতে হবে- যে পর্যন্ত বিপরীত কোন কিছু প্রকাশিত না হবে।

এ কথার দলীল হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কৈফিয়তের ভাষায় ওসামা (রাঃ)-কে বলেছিলেনঃ “তুমি হত্যা করেছ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার পরও ?

এবং তিনি আরও বলেছিলেনঃ ‘আমি লোকদেরকে হত্যা করতে আদিষ্ট হয়েছি যে পর্যন্ত না তারা বলবেঃ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’।
সেই রাসূলই কিন্তু খারেজীদের সম্বন্ধে বলেছেনঃ
অর্থাৎ “যেখানেই তোমরা তাদের পাবে, হত্যা করবে, আমি যদি তাদের পেয়ে যাই তবে তাদেরকে হত্যা করব ‘আদ জাতির মত সার্বিক হত্যা।” (বুখারী ও মুসলিম)

যদিও তারা ছিল লোকদের মধ্যে অধিক ইবাদতগুযার, অধিক মাত্রায় ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং সুবাহানাল্লাহ উচ্চারণকারী।

খারেজীরা এমন বিনয়-নম্রতার সঙ্গে নামায আদায় করত যে, সাহাবাগণ পর্যন্ত নিজেদের নামাযকে তাদের নামাযের তুলানায় তুচ্ছ মনে করতেন। তারা কিন্তু ইলম শিক্ষা করেছিল সাহাবাগণের নিকট হতেই। কিন্তু এসব কোনই উপকারে আসল না তাদের ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা, তাদের অধিক পরিমাণ ইবাদত করা এবং তাদের ইসলামের দাবী করা, যখন তাদের থেকে শরী’আতের বিরোধী বিষয় প্রকাশিত হয়ে গেলে।

ঐ একই পর্যায়ের বিষয় হচ্ছে ইয়াহুদদের হত্যা এবং বানু হানীফার বিরুদ্ধে সাহাবাদের যুদ্ধ ও হত্যাকান্ড। ঐ একই কারণে নবী (ﷺ) বানী মুস্তালিক গোত্রের বিরুদ্ধে জিহাদ করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন যখন তাঁকে একজন লোক এসে খবর দিল যে, তারা যাকাত দিবেনা।
এই সংবাদ এবং অনুরূপ অবস্থায় তদন্তের পর স্থির নিশ্চিত হওয়ার জন্য আল্লাহ আয়াত নাযিল করলেনঃ
“হে মুমিন সমাজ! যখন কোন ফাসেক ব্যক্তি কোন গুরুতর সংবাদ নিয়ে তোমাদের নিকট আগমন করে, তখন তোমরা তার সত্যতা পরীক্ষা করে দেখবে।” (সূরা হুজরাত ৪৯: ৬)

জেনে রাখ, উপরোক্ত সংবাদদাতা তাদের সম্বন্ধে মিথ্যা সংবাদ দিয়েছিল।

এইরূপে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যে সমস্ত হাদীসকে তারা হুজ্জত রূপে পেশ করে থাকে তার প্রত্যেকটির তাৎপর্য্য তাই যা আমরা উল্লেখ করেছি।

শায়খ রাহিমাহুল্লাহ প্রণীয়ত “কাশফুশ শুবুহাত” গ্রন্থ থেকে গৃহীত।
অবশ্যপাঠ্য বইটি পড়ুনঃ https://tinyurl.com/darulirfan10

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *