শায়খ নাসির আল-ফাহাদের জীবনি

শায়খ নাসির আল-ফাহাদের জীবনি। আল্লাহ সুবহানু ওয়া তা’আলা তার মুক্তি ত্বরান্বিত করুন

তার নাম, বংশপরিচয় ও বাসস্থানঃ

তার নাম নাসির ইবনে হামাদ ইবন হুমাইয়্যিন ইবনে হামাদ ইবন ফাহাদ। তিনি জন্মেছেন আল-আসা’ইদা আল-রাওয়াকিয়া গোত্রে। তার পূর্বপুরুষ ছিলেন বনি সাদ ইবনে বাকর, যারা শৈশবে রাসুল (সাঃ) কে লালন পালন করেছিলেন। বর্তমানে তারা উতাইবাহ নামে পরিচিত। তার মায়ের নাম নুরা আল গাজী। তিনি জন্মসূত্রে আল দাওয়াসীর গোত্রের। শায়খ নাসিরের পারিবারিক বাসস্থান ছিলো আল-সুয়াইরে যেটি “আল-যুলফি” নামক গ্রামে অবস্থিত।। শায়খ আল-আল্লামাহ মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহীমের(রাহিমাহুল্লাহ) সাথে কাজ করার জন্য শায়খ নাসিরের পিতা শেখ হামাদ ইবনে হুমাইয়্যিন রিয়াদে গিয়েছিলেন। তার সাথে তিনি ১৮ বছর অতিবাহিত করেন এবং রিয়াদেই মৃত্যুবরণ করেন।

জন্ম, জীবনের কিছু অংশ এবং শিক্ষাগত যোগ্যতাঃ

শায়খ নাসির ১৩৮৮ হিজরীর শাওয়াল মাসে রিয়াদে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই বেড়ে উঠেন। মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে তিনি আল-মালিক সাউদ ইউনিভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শুরু করেন। তিনি অতান্ত মেধাবি ছাত্র ছিলেন। ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের তৃতীয় বর্ষ চলাকালীন সময়ে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া ছেড়ে দিয়ে “দা ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অফ ইমাম মুহাম্মাদ ইবন সাউদ”-এ শরিয়া বিভাগে পড়াশোনা শুরু করেন ।

তিনি মাত্র তিন মাসে কুরআন হিফজ করেন। যে মুসহাফ থেকে তিনি হিফজ করছিলেন তার প্রথম পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছিলেনঃ

“সমস্ত অর্জন ও সাফল্য যা আমি অর্জন (কুরআন হিফজ) করেছি তা কেবল আল্লাহ সুবহানু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকেই। রবিবার বাদ আসর ২৯/১১/১৪২২ হিজরী এই মুসহাফ থেকে হিফজ সম্পন্ন করলাম যার শুরু ছিলো এই বছরেরই রমাদ্বান মাসের প্রথম দিকে। সকল প্রশংসা আল্লাহ সুবহানু ওয়া তা’আলার যার সাহায্যে সকল ভালো কাজ সম্পন্ন হয়।”

শারিয়াহ কলেজে তিনি যেসব মাশায়েখের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহন করেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলোঃ

শেখ আব্দুল আজিজ আল-রাজিহি, শেখ যায়িদ ইবনে ফাইয়্যাদ এবং শেখ আহমদ মা’বাদ আল-আযহারি।

হিজরী ১৪১২ সালে তাকে কলেজ থেকে “ইজাযাহ” দেয়া হয়। তিনি ছিলেন ছাত্রদের মধ্যে  মেধা তালিকার শীর্ষে। তাকে কলেজ থেকে শারীয়াহ  উসুল আদদ্বীনের উপর পড়ালেখা চালিয়ে যেতে অনুরোধ করা হয়। তিনি উচ্চতর পড়াশুনার জন্য Principles of the Religion; Department of Creed and Contemporary Sects” ((أصولَ الدينِ – قسمَ العقيدةِ والمذاهبِ المعاصرةِ কে বেছে নেন। উচ্চতর শিক্ষার পর তাকে থাইল্যান্ডে উস্তাদ হিসেবে তাকে নিয়োগ করা হয়। তিনি সেখানে এক জাহমির সাথে বাহাস করেন, জয়ী হন এবং শ্রোতাদের কাছে প্রশংসার পাত্র হয়ে উঠেন। তাকে মক্কার উম্মুল ক্বুরা ইউনিভার্সিটির আক্বিদা ডিপার্টমেন্টের ডীন নিযুক্ত করা হয়।

এসময় ‘ইলমের সন্ধানে তিনি ব্যস্ত সময় কাটান। বইপত্র জোগার, পড়াশুনা এবং গবেষণায় তার সময় কাটে। তিনি সব সময় পড়াশোনার নিয়ে ব্যাস্ত থাকতেন এবং এবং আমি তাকে ঘরে বই ছাড়া দেখি নি । তিনি গাড়িতে ওঠার সময় বই নিয়ে উঠতেন এবং ট্রাফিক জ্যামের সময় বই পড়তেন। আমি যদি বলি তিনি দিনে ১৫ ঘন্টা পড়াশুনায় কাটাতেন তাহলেও তার উপর ইনসাফ করা হবে না।

আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় তিনি ইলমে আরো অগ্রসর হলেন, এবং শারীয়ার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠলেন, যার মধ্যে রয়েছে আক্বিদা ও এর সাথে সংযুক্ত বিষয়াবলী, হাদীস, রিজালশাস্ত্র, চার মাযহাবের ফিকহ, ফিকহের উসুল এমং ফারাইদহ (উত্তরাধিকার)।

বিভিন্ন বষিয়ে ফতোয়া এবং নুসুস থেকে হুকুম নির্ণয়ের ক্ষেত্রে তিনি তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা ও গভীর  অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় দিতেন।

তিনি ইতিহাস এবং বিভিন্ন গোত্রের বংশধারা ও বংশপরিচয় বৃত্তান্তের ব্যাপারে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। শেখ ওয়ালিদ আস-সিনানি, যিনি এক্ষেত্রে তার জ্ঞানের কারণে ছিলেন অদ্বিতীয় ও বিখ্যাত, তাকে একবার এ বিষয়ে কিছু প্রশ্ন করে হলে তিনি বললেন, “আসাদিকে জিঞ্জেস করো।”(আসাদি বলতে আসা’ইদা গোত্র বোঝানো হয়েছে অর্থাৎ নাসির আল ফাহাদ)

ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সাউদ ইউনিভার্সিটির আক্বিদার কিছু প্রফেসর আমাকে জানিয়েছেন, “তোমার পিতা মাস্টার্সে আমাদের সহপাঠী ছিলেন। তিনি ছিলেন আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যাক্তি। মুখস্ত ও বোঝার ক্ষেত্রে সবার চেয়ে এগিয়ে। তার কঠোরতা ছাড়া তাকে নিয়ে সমালোচনা করার মতো কিছুই নেই”। আর একথা সত্য। যখন কারো সাথে বিতর্ক করেন তখন তিনি রেগে যান কিন্তু যখনই তার মেজাজ ঠান্ডা হয়, সাথে সাথে তিনি তার প্রতিপক্ষের কাছে মাফ চেয়ে নেন।

আমার কাছে এই খবর পোঁছায় যে, আক্বিদা ডিপার্টমেন্টের একজন ঊস্তাদ একদিন তার ছাত্রদের বলছিলেন, “এই ডিপার্টমেন্টে একজন মানুষ ছিলো যে অনেক ভুল ধারণা পোষণ করতো। কারো সাহস ছিল না তার মুখোমুখি হয়ে তার ভুল ধারণার মোকাবেলা করার, একমাত্র নাসির আল ফাহাদ ছাড়া।”

হিজরী ১৪১৫ সালে তাকে গ্রেফতার করা হলো। তাকে “আল-হা’ইয়ার” জেলখানায় বন্দী করা হয়। তিনি সাড়ে তিন বছর বন্দী ছিলেন। ১৪১৮ হিজরীতে তাকে ছাড়া হয়। ছাড়া পাওয়ার পর তিনি ইন্টারনেট জগতে সক্রিয় হন কিন্তু পরে সময়ের অভাবে তিনি তা থেকে সরে আসেন।

দিন দিন তার দরশনার্থীদের সংখ্যা থাকলো। কিন্তু তিনি সবাইকে সময় দিতে পারছিলেন না। তাই তিনি তার বাসায় শনি ও মঙ্গলবার মাগরিব ও ‘ইশার মাঝে একটি হালাকার (জমায়েত) আয়োজন করলেন। এই হালাকায় হাদীস ও রেওয়ায়েত নিয়ে আলোচনা হতো। দিন দিন এসব হালাকায় মানুষের অংশগ্রহণ এতোই বাড়তে লাগলো যে রুমের চারপাশ ভর্তি হয়ে যেত। এমনকি সরাসরি শায়খের সামনে রুমের মাঝখানেও সারি করে মানুষ বসতো, হাটাচলার কোন জায়গা থাকতো না।

যখন আল্লাহ সুবহানু ওয়া তা’আলা সকল মুসলিমকে আমেরিকার আফগানিস্তানের যুদ্ধের মাধ্যমে পরীক্ষা করলেন, শেখ নাসির মুমিনদেরকে তাদের ভাইদের সহায়তায় এগিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করলেন এবং কাফেরদের বন্ধু হিসেবে গ্রহন করার ব্যাপারে সতর্ক করে দিলেন। তিনি হক্বের উপর অটল থাকলেন এবং সৌদি তাগুত সরকার তার গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করলো। ১৪২৪ হিজরীতে তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন।

আর তখন থেকে আজ এই মূহুর্ত পর্যন্ত এখনো পর্যন্ত তিনি জেলখানায় বন্দী জীবনযাপন করছেন। এমনকি ৬ বছর আগ থেকে তাকে পরিবারের সাথে দেখা বা কথা বলতে দেয়া হচ্ছেনা।

আল্লাহ তা’আলা জেলখানায় শায়খের উপর তাঁর রহমত ঢেলে দিয়েছেন। এবং শায়ক্ষের জ্ঞান বহুগুণে বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। শেখ নাসির বন্দীদশায় ৯টি হাদীসগ্রন্থ (কুতুবে সিত্তাহসহ, মুসনাদ আহমাদ, মুয়াত্তা মালিক, সুনান আদ-দারিমি) সহ আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক বই ও মতন মুখস্থ করেছেন। তিনি শায়খ আল-ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহর “মাজমু আল ফাতওয়া” ছয়বার পড়েছেন এবং তিনি ৮৫টি রিসালাহ লিখেছেন । তিনি ইবনু তায়মিয়্যাহর “উসুল আল ফিকহ ও উসুল আল তাফসির”কে ৮০০ লাইনের কবিতা আকারে লিখেছেন।

সম্প্রতি জেলখানা থেকে ছাড়া পাওয়া এক ভাই বলেছেন, কিছু কারারক্ষী শায়খের ব্যাপারে বলতো,”এই একগুঁয়ে লোকটার(শায়খ নাসির) কী হয়েছে যে, সে মাত্র ৪ ঘন্টা ঘুমায় এবং বাকি সারাটা দিন হয় বই পড়ে না হয় সলাত আদায় করে!!”

শেখ নাসিরকে জেলখানায় অনেক পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তাকে অত্যাচার করা হয়েছে এবং তার মর্যাদাহানীর চেষ্টা করা হয়েছে। আল সালুলুলের কারাগারে শায়খ নাসিরের উপর চালানো অবর্নণীয় নির্যাতনের ব্যাপারে শায়খ আহমাদ মুসা জিব্রিলের হাফিযাহুল্লাহ এ বক্তব্যটি দেখতে পারেন – https://www.youtube.com/watch?v=MbBzOO5W3M4

কিন্তু এসব কিছু সত্ত্বেও আল্লাহ ইচ্ছায় তিনি ছিলেন অনড়, ধৈর্যশীল এবং আল্লাহর পুরস্কারের আশায় আশান্বিত। আল্লাহ তাকে দৃঢ়তা দান করুক এবং মুক্তির ব্যাবস্থা করে দিক।

 

শায়খের ব্যাপারে কিছু উক্তিঃ

শায়খ নাসিরের ব্যাপারে বিশিষ্ট জনের কিছু উক্তির একটি লিস্ট তৈরি করেছি, তার কিছু নিচে উল্লেখ করা হল –

শায়খ নাসিরের লিখিত বই “التبيانِ في كفرِ من أعانَ الأمريكانَ” অ্যামেরিকাকে সাহায্যকারী ব্যক্তির কুফরের বাস্তবতা – এর ব্যাপারে শায়খ আল-‘আল্লামাহ হামুদ বিন উক্বলা আশ-শু’য়াইবি(রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,

“শায়খ নাসির আল ফাহাদ, আল্লাহ তাকে সাফল্য দান করুক, তার অনেক বরকতপূর্ণ প্রচেস্টা রয়েছে। তিনি সত্যকে ও সত্যপন্থীদের বিজয় দানের জন্য লড়াই করে গেছেন এবং মানুষকে মিথ্যা এবং মিথ্যাবাদীদের থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। তিনি তার বিভিন্ন বিখ্যাত বই ও রচনায় মিথ্যার বিরোধিতা করেছেন। আমরা আল্লাহর কাছে তার উত্তম প্রতিদানের দোয়া করি যেন তিনি শায়খ নাসিরকে তার উপর অটল রাখে।”

কিছু ভাই আমাকে জানিয়েছেন যে, “যখনই ভাইরা শেখ হামুদের কাছে প্রশ্ন নিয়ে আসতো, তিনি বলতেন, শেখ নাসির কী এর উত্তর দিয়েছে?”

শায়খ আল মুহাদ্দিস আল-‘আল্লামা সুলাইমান আল-‘উলওয়ান ফাকাল্লাহু আসরাহ উক্ত বইটির (“التبيانِ في كفرِ من أعانَ الأمريكانَ”) ব্যাপারে বলেছেন – “আল্লাহ শায়খএক দৃঢ় রাখুন। তার কলম যা লিপিবদ্ধ করেছে তা কতোই না উত্তম! এ লেখা আহলে ইলম ও সত্যান্বেষীদের দ্বারা প্রশংসিত হবার যোগ্য। প্রকৃতপক্ষে  এই বইতে সালাফ ও ইমামদের আকিদা, ফিক্বহ এবং তাক্বওয়ার বাস্তবায়ন হয়েছে।”

তার ছেলে মালিক জানিয়েছেন যে শায়খ সুলাইমান আল-উলওয়ান শায়খ নাসিরের ব্যাপারে আরো বলেছেন –“এবং তিনি দক্ষ মুখস্থকারীদের মধ্যে অন্যতম, যার ইলমে বিবিধ শাখায় রয়েছে অগাধ জ্ঞান এবং তাকে জেলখানায় তীব্র অত্যাচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে।”

শায়খ আল-মুহাদ্দিস আবদুল্লাহ আল সা’দ, শায়খ নাস্যার আল ফাহাদের “তাদলিসের ব্যাপারে মুতাক্বাদ্দিমিনের পদ্ধতি” (منهجِ المتقدمينَ في التدليسِ) নামক বইয়ের প্রশংসায় বলেন,

“আমি এর আগে শায়খ নাসিরের লিখিত বিভিন রচনা পড়েছি এবং সবগুলোই উপকারী, দৃঢ়ভাবে কুরআন সুন্নাহর ভিত্তির উপর স্থাপিত, এবং সালাফ আস-সালেহিনের মানহাজ অনুসারে লিখিত। আমরা তার থেকে এমনটাই দেখি। আর শুধু মহিমান্বিত আল্লাহ তা ‘আলাই তার আসল যোগ্যতা জানেন।”

 

________

[১]তার ছেলে মুস’আব ইবনে নাসির আল ফাহাদ এর লেখা জীবনী থেকে অনুদিত

মঙ্গলবার ২৭/১/১৪৩৪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *