শায়খ আবু কাতাদার সংক্ষিপ্ত জীবনী

শায়খ আবু কাতাদা ওমর মাহমুদ ওসমান হাফিযাহুল্লাহ একজন ফিলিস্তিনী বংশোদ্ভুত এক জর্ডান প্রবাসী আলেম। দাওয়াতি তৎপরতার কারণে পৃথিবীর অনেক দেশে তাঁকে শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলে তলব করা হয়েছে। পরবর্তীতে জর্দানের ছোট্ট রাষ্ট্রে তার বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ জারি করা হয়েছে। তিনি বৃটেনেও কারাভোগ করেছেন।

তাঁর বিরুদ্ধে আমরিকান প্রশাসনের অভিযোগ, তিনি সন্ত্রাসী সংগঠন আল কায়দার মুফতি পদে কাজ করেন। আরো বলা হয়েছে, শহিদ মুহাম্মাদ আতা ও তার সহযোদ্ধাগণ জার্মানের যেই এপার্টমেন্টে থাকতেন সেখানে করা তাঁর কিছু আলোচনার উপর ইতোমধ্যে অনুসন্ধান চালানো হয়েছে। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনিত এই অভিযোগের ব্যাপারে নিন্দা জানিয়ে বলেন, মুজাহিদিনদের সাথে তাঁর সম্পর্ক অন্য যে-কোন মুওয়াহ্‌হিদ ও মুমিনের সাথে সম্পর্ক রাখার মতই। ভিন্ন কোন কিছু এখানে নেই। প্রকৃত অর্থে মুসলমানদের মধ্যকার সম্পর্ক ও ঈমানী ভ্রাতৃত্ব যে কোন সংগঠনের চেয়েও মজবুত ও শক্তিশালী।

তিনি উসুলে ফিকহের উপর মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন।

যারাই শায়েখের লিখনী হাতে পাবে তারাই অনুভব করতে পারবে যে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে সালাফ-পূর্বসূরীদের মানহাজ সম্পর্কে কী অগাধ জ্ঞান দান করেছেন। তিনি প্রত্যেক যুগের মুজাদ্দিদ-সংস্কারকদের মতো সালাফের রীতি অনুসরণ করে উসুলুল ফিকহ এবং ঈমান ও আকিদাগত বিষয়ে মনোযোগ নিবদ্ধ করেন। এক্ষেত্র তিনি মুতাকাল্লিমদের পদ্ধতি পূর্ণ মাত্রায় বর্জন করেন যারা ইলমে দ্বীনকে শেষ করে দিয়েছে। তবে তাদের মানহাজের বিস্তারিত জ্ঞান যেমন তাঁর ছিল তেমনি তাদের খণ্ডন করার সর্বোত্তম পদ্ধতিও তিনি বেশ ভালভাবেই জানতেন। এই পৃথিবী ও পৃথিবীর মানব-জীবনের সমস্যা নিয়ে তাঁর রয়েছে বিশেষ দর্শন যা তাঁর চিন্তার ব্যাপকতা ও দূরদর্শিতার প্রতি ইঙ্গিত করে। শরিয়ত ও তাকদীরী বিষয়ের উপর গুরুত্বারোপ করার ফলেই তাঁর এ-সব যোগ্যতা অর্জিত হয়েছে। অথচ শরিয়ত ও তাকদিরের থেকে কোন আলেমই গাফেল থাকেন না। তারপরেও যিনি এগুলোকে সবসময় নিজের চোখের সামনে রাখেন এবং এটাই হয় তাঁর একমাত্র কর্ম ব্যস্ততা তার সামনে তখন খোলে দেয়া হয়  ইলম এবং জ্ঞানের দরজাসমূহ। তখন তার ভিন্ন একটা অবস্থান তৈরী হয়।

যেহেতু উসুলে ফিকহ -যা দর্শনগত মৌলিক একটি জ্ঞান- নিয়েই তাঁর যাবতীয় ব্যস্ততা তাই এর বদৌলতে এমন দর্শনগত যোগ্যতা তিনি লাভ করতে পেরেছেন যে, প্রতিপক্ষের বিভিন্ন জাওয়াব ও তর্ক-বিতর্কের বিষয় পড়ার সময় তার চক্ষু সেই দর্শনগত যোগ্যতাকে ভুল প্রমাণিত করতে পারে না। অনুরুপভাবে এই উসুলে ফিকহের প্রতি সর্বাত্মক গুরুত্ব দেয়ার কারণেই এমন গভীর দূরদৃষ্টি লাভ হয়েছে যার আলোকে তিনি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও দলগত আকিদা-বিশ্বাসের কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল তা নির্ণয় করতে পারেন। তাদের এই অবস্থার প্রকৃত কারণ ও রোগ উদঘাটন করতে সক্ষম হন। তাদের সম্পর্কে যতটুকু জানেন ততটুকুর উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন অবস্থা ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাদের প্রতেক সদস্য ও দলের কী হুকুম তাও বলে দিতে পারেন। তাঁর চিন্তার ব্যাপকতা এত বেশি যে, বর্তমানে বিদ্যমান যত ভ্রান্ত দল আছে সবগুলোকে অতীত ও বর্তমানকালের এ-জাতীয় অন্যান্য দলের সাথে তুলনা করে তিনি গবেষণা করেন। একটিকেও বাদ দেন নি।

সর্বোপরি তিনি তো একজন মানুষ। তাই অন্যান্যদের মত তাঁরও ভুল-ভ্রান্তি হতে পারে। কখনই তিনি সমালোচনার উর্ধ্বে নন। ইসলামী আন্দোলন যদি তাদের নেতা ও আলেমদেরকে সমালোচনার উর্ধ্বে রাখে এবং তাদেরকে এমন স্তরে রাখে যে, তাদের কোন কিছুই খণ্ডন করা যাবে না তাহলে তো তারা কখনোই আপন লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না এবং দায়িত্বশীল কোন জাতি গঠন করতে পারবে না। বরং এদের লালন পালন হবে সেই প্রকৃতিতে যেই প্রকৃতিতে লালিত পালিত হয়েছে প্রত্যেক গলাবাজের অনুসারী আবিদরা, যারা তাদের নেতার সম্মানে অতিরঞ্জন করে, তাকে তাই দেয় যেটার উপযুক্ত সে নয়। যেমন, শুধু এদের আস্থা অর্জনের জন্যে বিভিন্ন ব্যক্তিদেরকে হত্যা করা এবং এর দায়ভার নেয়া। বাস্তবতা এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ।

ইলমী কারনামা:

 

[১] তাঁর সর্বপ্রথম কিতাব হল, আর-রদ্দ আল-আসারি আল-মুফিদ আলাল বাইজুরি ফী শরহি জাওহারাতিত্ তাওহিদ। দ্বিতীয় মুদ্রণ।

[২] ইবনুল কায়্যিম রচিত তরিক আল-হিজরতাইন। শায়েখের তাহকিকে ছেপেছে দারু ইবনিল কাইয়্যিম, রিয়াদ। দ্বিতীয় মুদ্রণ।

[৩] হাফেজ হুকমী রচিত মাআরিজ আল-কবুল ফী শরহি সুল্লাম আল-উসুল। খণ্ড:৩। শায়েখের তাহকিক ও তাখরিজে কিতাবটি পাঁচবার মুদ্রিত হয়েছে। প্রথমে ছেপেছে দারু ইবনুল কাইয়্যিম এরপর দারু ইবনে হাজম।

[৪] তাজরিদ আল-আসমা আর-রুওয়াত আল্লাযিনা তাকল্লামা ফীহিম ইবনু হাজম জারহান ওয়া তাদিলান। কিতাবটি শায়েখ এবং আরো কয়েকজন মিলে লিখেছেন। কিতাবটি ছেপেছে জর্দানের দারুল মানার কুতুবখানা।

[৫] ইবনে কুতাইবা রচিত আল-এখতেলাফ ফিল-লফজ। শায়েখের তাহকিকে কিতাবটি ছেপেছে দারুর-রায়াহ।

[৬] ইবনুল কাইয়্যিম রচিত আল-গুরবা। শায়েখের তাহকিকে কিতাবটি ছেপেছে দারুল কুতুব আল-আছারিয়্যা।

[৭] নিজস্ব রচনা- আল-জিহাদ ওয়াল ইজতেহাদ: তাআম্মুলাত ফিল মানহাজ। কিতাবটি মূলত তাঁর একটি ধারাবাহিক প্রবন্ধ যা নাশরতুল আনসারবাইনা মানহাজাইন শিরোনামে প্রকাশ করেছে। কিতাবটি জর্দানের দারুল বায়ারিক থেকে ছেপেছে।

[৮] ইমাম আল-বারকাঈ রচিত কাসরুস-সনাম। কিতাবটি জর্দানের দারুল বায়ারিক থেকে শায়েখের তাহকিকে ছেপেছে।

[৯] নিজের রচিত মাআলিমুত্ তাইফাতিল মানসুরাহ। ডেনমার্কের দার্ আন-নুর আল-ইসলামি থেকে দুইবার ছেপেছে।

[১০] হুকমুল খুতাবা আল্লাযীনা দাখালূ ফী নুসরাতিত্ তাগুত। এই কিতাবটিতে মূলত সে-সব উলামায়ে সু-দের সম্পর্কে মালেকী মাজহাবের ইমামদের ফতোয়া আছে যারা আবিদিইয়্যীনদের সাহায্য করেছে। শায়েখের তাহকিক ও তালীকসহ কিতাবটি ডেনমার্কের দার্ আন-নুর আল-ইসলামি থেকে ছেপেছে।

[১১] নাজরাতুন জাদিদা।

[১২] জুনাতুল মুতাইয়্যিবীন।

এ-ছাড়াও শায়েখের আরো কিছু মূল্যবান গবেষণা আছে। যেই এগুলো পড়বে সেই তাঁর কদর বুঝতে পারবে।

প্রবন্ধ ও রচনার অঙ্গনেও তিনি দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি কিয়ামতের আলামত সম্পর্কে  কিছু প্রবন্ধ লিখেছেন। প্রবন্ধগুলো যদিও ছোট কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে একজন মুসলমানের শরয়ি দৃষ্টিভঙ্গি কী হওয়া উচিত তা সংক্ষিপ্তভাবে প্রবন্ধটিতে উঠে এসেছে। তিনি প্রায় দুশত প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁর এ-সব লেখা নাশরতুল আনসার, মাজাল্লাতু নিদাইল ইসলাম, মাজাল্লাতুল মিনহাজ ও মাজাল্লাতুল ফজর-সহ আরো কয়েকটি ইসলামি পত্রিকা ও প্রচারপত্রের মাধ্যমে প্রচার হয়েছে।

এ-সব লিখনীতে আরবি ভাষা ও সাহিত্যের প্রাঙ্গনে তাঁর দক্ষতা ও প্রাজ্ঞতার দিকটিও সমানভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর নিজের রচিত কিছু কবিতাও আছে।

তিনি  শিক্ষাদানের জন্য সরাসরি আলোচনার আয়োজন করতে ভুলে যান নি। তাই আমরা দেখতে পাই যে, তিনি অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ইলমী আলোচনার আয়োজন করেন। তার এই সমস্ত আলোচনা যারাই শুনেছেন তাদের সকলেই তাঁর ইলমের গভীরতার স্বীকৃতি দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ, এগুলোর রেকর্ড এখন  অনেক তালেবে ইলমের হাতে হাতে পাওয়া যায়।

তেমনি কিছু আলোচনার বিষয়বস্তু নিম্নে দেয়া হল:

[১] ইমাম যাহাবি কর্তৃক রচিত শরহুল মুকিজা

[২] আল-ঈমান। এখানে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের দৃষ্টিতে ঈমান কাকে বলে, সেই বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সাথে সাথে বিদআতপন্থীদের মতকেও খণ্ডন করেছেন।

[৩] শরহু আকিদাহ আত্তাহাবিয়্যাহ।

[৪] আল্লামা শাওকানী কর্তৃক রচিত শরহুদ-দারারী আল-মুযিয়্যাহ।

[৫] ইবনে রজব হাম্বলী কর্তৃক রচিত তাকরির আল-কাওয়ায়েদ ওয়া তাহরির আল-ফাওয়ায়েদ-এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ।

[৬] মুতাকদ্দিমীনের অনুসৃত পন্থায় উসুলে ফিকহ সম্পর্কে একটি মুকাদ্দামার ব্যাখ্যা করার জন্য আলোচনার আয়োজন করেন।

[৭] ইমাম শাফেয়ি কর্তৃক রচিত জামাউল ইলমের ব্যাখ্যা।

এখানে শায়েখের জীবনীর সামান্য অংশই তুলে ধরা হয়েছে। যদিও এইটুকু এই শায়েখের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয় কিন্তু এতে শায়েখের জীবনের মৌলিক দিকগুলো উঠে এসেছে।

পরিশেষে মহামহিম আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি শায়েখকে সকল মুসলমানের পক্ষ থেকে উত্তম বদলা দান করুন। তাঁর হায়াত বৃদ্ধি করে দিন। তাঁর ইলম ও আমলে বরকত দান করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *