জিহাদ না করে যিকির?

“আবূদ দারদা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি তোমাদেরকে কি তোমাদের অধিক উত্তম কাজ প্রসঙ্গে জানাব না, যা তোমাদের মনিবের নিকট সবচেয়ে পবিত্র, তোমাদের সম্মানের দিক হতে সবচেয়ে উঁচু, স্বর্ণ ও রৌপ্য দান-খাইরাত করার চেয়েও বেশি ভাল এবং তোমাদের শক্রর মুকাবিলায় অবতীর্ণ হয়ে তাদেরকে তোমাদের সংহার করা ও তোমাদেরকে তাদের সংহার করার চাইতেও ভাল? তারা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ আল্লাহ তা’আলার যিকর।

মু’আয ইবনু জাবাল (রাযিঃ) বলেন, আল্লাহ তা’আলার শাস্তি হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য আল্লাহ তা’আলার যিকরের তুলনায় অগ্রগণ্য কোন জিনিস নেই।”

মূল হাদিসটি (সুনানে তিরমিযি: ৩৩৭৭) এই-

عن أبي الدرداء رضي الله عنه قال قال النبي صلى الله عليه و سلم: ألا أنبئكم بخير أعمالكم وأزكاها عند مليككم وأرفعها في درجاتكم وخير لكم من إنفاق الذهب والورق وخير لكم من أن تلقوا عدوكم فتضربوا أعناقهم ويضربوا أعناقكم ؟ قالوا بلى، قال: ذكر الله تعالى. فقال معاذ بن جبل رضي الله عنه: ما شيء أنجى من عذاب الله من ذكر الله

এই হাদিসের কারণে অনেক ভাই বিভ্রান্তিতে পড়ে যান কারণ এ হাদিসে যিকিরকে জিহাদের চেয়ে উত্তম বলা হয়েছে, অথচ জিহাদের ফজিলত সীমাহীন। এছাড়া হাদিসকে কেন্দ্র করে অনেকে জিহাদ তরকের বাহানা খুঁজতে পারে।

বিষয়টি এভাবে চিন্তা করা যেতে পারে।

ধরুন কারো সৌন্দর্যের প্রশংসায় বলা হল –

তার পুরো শরীরের মধ্যে ঠোট দুটি সবচেয়ে সুন্দর। সর্বাধিক চিত্তাকর্ষক, সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর। চোখের চেয়ে বেশী উন্মাদনা সৃষ্টিকারী, নাকের চেয়ে বেশী হৃদয়গ্রাহী, গালের চেয়ে বেশী উজ্জ্বল…

তাহলে কি এর অর্থ দাঁড়ায় সেগুলোর মোকাবেলায় এটি একা বেশী সুন্দর? নাকি সেগুলোর সাথে থেকে সুন্দর ?

এমনিভাবে আ’মালের সাথে যদি যিকির থাকে তাহলে সেটি আল্লাহর নৈকট্যের যেমন উসিলা হবে যিকির শূন্য আমাল তেমন হবেনা। যিকর শূন্য গাফেলতের নামাযের চেয়ে ইহসানের নামাযের মূল্য বেশী।

ইহছানের অর্থ কী …?

“আল্লাহ কে আমি দেখছি /আল্লাহ আমাকে দেখছেন, এই ধ্যান নিয়ে কাজ করা”। তাই নয় কি? আপনি যদি ইহসান আদায় করতে গিয়ে আল্লাহ আমাকে দেখছেন এই ধ্যান নিয়ে বসে থেকে নামাযের সময় পার করে দেন, আর দলীল পেশ করেন যে,

إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ

“নামাজ অশ্লীলতা ও অন্যায় থেকে নিষেধ করে আর আল্লাহর যিকির সবচেয়ে বড়।”

وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي

“আমার স্মরণের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় করো ”

যেমন পাকিস্তানের যিকরি গ্রুপ নামাজ বাদ দিয়ে ৫ ওয়াক্ত যিকির করে থাকে। তাহলে আপনিই বলুন! এই ইহসানি যিকির আর যিকির বিহীন নামাযের মধ্যে ‘কোনটি উত্তম’ তা নিয়ে কোন প্রশ্ন হতে পারে?!

একজন ‘ধ্যান’ করে কিন্তু নামাজ পড়েনা, অন্যজন ‘ধ্যান’ ছাড়া নামাজ পড়ে, কে উত্তম ?!

জিহাদ যখন ফরযে আইন (অথবা বর্তমানের খবর না থাকার কারণে হয়তো কেউ কেউ কিফায়া বলবেন; এখন কাফি পরিমানে) সেটি আদায় হওয়া ছাড়া কেউ যদি মন-যবান দ্বারা যিকিরে ধ্যানে মগ্ন হয়ে থাকেন আর জিহাদ তরকের ফিসকের সাথে থাকা হয়, তাহলে সে কি যিকির বিহীন মুজাহিদ থেকে উত্তম হয়ে যাবে? যিকির যেমন যবানের দ্বারা হয় তেমন অন্তর দ্বারাও হয়, আবার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দ্বারাও হয়। এসব ধাপের মধ্যে কিছু আছে ফরজ।

যেমন কিরাত পড়া(যবানের যিকর)।

নিয়্যত করা(অন্তরের যিকর)।

রুকুসিজদা করা(অংগ প্রত্যঙ্গের যিকর)।

কোন এক প্রকারের ফরজ দিয়ে অন্য প্রকারের ফরজ আদায় করার চিন্তা করা যায়না। কোন ভাবেই এক প্রকারের ফরজ এর মুকাবিলায় অন্য প্রকারের নফল মুস্তাহাবকে দাঁড় করানো যাবে না। এখন মাথা নুইয়ে রুকু করা আর কপাল ঠেকিয়ে সিজদা করা এটি ও যিকর আবার সিজদায় সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা পড়া এটিও যিকর। আবার অন্তরে সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লার অর্থ খেয়াল করে ধ্যান করা সেটিও যিকির। তবে মাথা নুইয়ে পিঠ দিয়ে রুকু করা এটি ফরজ আর তাসবীহ পড়া সুন্নত…।

কোনটি উত্তম বলুন?! যখন নামাজের উদ্দ্যেশ্যই হলো যিকির!

বলুন! নামাজের মধ্যে লম্বা কিয়াম উত্তম না লম্বা সিজদা উত্তম?

মুজতাহিদগণের সে ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে কিন্তু কেউ কি একটি ছেড়ে অপরটি লম্বা করার কথা বলেছেন?

যেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়ে দিচ্ছেনঃ

“হে নামাজী ! তোমার খুশু তোমাকে আল্লাহর যে সান্নিধ্যে পৌছাঁবে শুধু রুকু সে সান্নিধ্যে পৌছাবে না …”

“হে মুজাহিদ ! তোমার যিকির তোমার জন্য আল্লাহর যে নুসরত বয়ে আনবে তোমার আঘাতে সে কাজ হবেন…”

(আল্লাহু আলাম)

মোট কথা প্রত্যেক আমলের সাথেই যিকিরের সম্পর্ক আছে ,

إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ

এই আয়াতে বলা হয়েছেঃ

“আল্লাহর দিকে পবিত্র বাণী (যিকর) আরোহণ করে , আর সেটি আমলে সালিহকে উন্নত করে।”

আয়াতের আরেকটি স্বীকৃত তাফসীর হলঃ “আল্লাহর দিকে পবিত্র বাণী আরোহন করে এবং আমলে সালিহ তাকে উপরে উঠায় ।”

এখন আমল বাদ দিয়ে যিকর করলে এই যিকর কাকে উপরে উঠাবে? আর যিকর ছাড়া আমল উন্নত হবে কিভাবে? প্রত্যেক আমলকারী কে বলা হচ্ছে আমলের অহমিকায় না থেকে সেটিকে আল্লাহর স্মরণে ন্যাস্ত করতে।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিনিয়ত যিকিরের সাথে থাকতেন। সাহাবায়ে কিরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম এই হাদিস শুনে জিহাদ ছেড়ে যিকরে বসে যাননি , যেমনটি পাকিস্তানের যিকরি গ্রুপ শুরু করেছে। তারা নামাজের বিকল্প যিকরি গ্রুপ হয়েছে আর এখন কিছু লোক জিহাদের বিকল্প যিকরি হওয়ার তৎপরতায় লিপ্ত! গোমরাহি কিন্তু একই।! আল্লাহ তায়ালা সঠিক বুঝ নসীব করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *