তাগুতের কুফর সম্পর্কে সন্দেহ ও সংশয়?

তাগুতদের মধ্যে যারা নিজেদেরকে মুসলিম বলে পরিচয় দিয়ে থাকে তাদের কুফরের ব্যাপারে অনেকের অধ্যে সন্দেহ ও সংশয় কাজ করে। এ কারনেই তাগুতদের অবস্থা সাধারণ জনগোষ্ঠীর কাছে অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে। বিশেষত এ কারনে যে, তারা ইসলামের বহু বিষয় যেমন: হজ্জ , সালাত, মসজিদ নির্মাণ, কুরআন তিলাওয়াত, সাদাকাহ বিতরণ ইত্যাদি বিষয়গুলো আদায় করে থাকে।

 

যারা তাদের কাফের ঘোষণা করে না তারা তিন শ্রেণীর হয়ে থাকে :

১। যারা তাগুতদেরকে সাহায্য সহযোগিতা করে। তাগুতের আইনের আনুগত্য করে, আল্লাহর আইনকে অবহেলা করে, তারা আল্লাহ ও তার নুরকে নিভিয়ে দিতে চেষ্টা করে এবং এই দ্বীনের রক্ষাকারী আল্লাহ্‌র আউলীয়াদের সাথে লড়াই করে। এরা তাগুতের গোলাম এবং তাগুতের মুখপাত্র, যারা কিনা মানুষকে তাগুতের ইবাদতের দিকে আহ্বান করে। এরা হল সেকুলারিষ্ট ও গণতন্ত্রীরা এবং তাদের আখিরাতে কোন অংশ নেই। এই শ্রেণীর লোকের কুফরের ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

 

২। যারা এই তাগুতদের স্বাভাবিক অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞ। এই তাগুতেরা কোন কোন কুফরে পতিত হয়েছে এবং সেগুলোর শর্ত সম্পর্কে এ শ্রেণীর মানুষ অজ্ঞ। তবে এই বিষয়ে আল্লাহ তাআলা যা বলেছেন সেটা তারা বিশ্বাস করে। এদের সঠিক আক্বিদা আছে এবং তারা গুনাহগার নয়, বরং তাদের এই অবস্থা হল মূলত অজ্ঞতা। এই বিষয়ে একটি উদাহরণ হলো: এক ব্যাক্তি বিশ্বাস করে যে, কোন ব্যক্তি গায়েবের জ্ঞান রাখার দাবি করলে ঐ ব্যক্তি কাফির। কিন্তু সে জানেনা যে অমুক অমুক ব্যক্তি গায়েব জ্ঞান রাখার দাবি করেছে। এই ব্যক্তিদের কুফরের ব্যাপারে সে অজ্ঞ।

এটা তার ক্ষতি করবেনা বা তার ঈমানকে প্রভাবিত করবে না।

 

৩। যারা তাগুতের কার্যক্রম সম্পর্কে জানে এবং তারা যেসব ঈমান ভঙ্গকারী বিষয় ও কুফরীতে পতিত হয়েছে সেটাও জানে, কিন্তু তারা তাকফির করা থেকে বেচে থাকে। এই শ্রেণীতে দুই ধরনের লোক পাওয়া যায় :

 

ক) তারা বিশ্বাস করে যে এই তাগুতেরা কুফর করেছে, এবং বিশ্বাস করে যে তারা ভুল পথে আছে এবং তারা এটাকে ঘৃণা করে। কিন্তু প্রকাশ্যে তাকফির করে না।

এই প্রকারের মাঝে নিম্নোক্ত লোকেরা রয়েছে :

  • যারা দুর্বল ও যাদের কোন সুরক্ষা বা উপায় নেই। আল্লাহর সামনে তাদের ওজর আছে ইনশাআল্লাহ, যতদিন তাদের দুর্বলতা থাকবে। তাদের অবস্থা এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত:

 

وَلَوْلَا رِجَالٌ مُّؤْمِنُونَ وَنِسَاءٌ مُّؤْمِنَاتٌ لَّمْ تَعْلَمُوهُمْ أَن تَطَئُوهُمْ فَتُصِيبَكُم مِّنْهُم مَّعَرَّةٌ بِغَيْرِ عِلْمٍ

“যদি মক্কায় কিছুসংখ্যক ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী না থাকত, যাদেরকে তোমরা জানতে না। অর্থাৎ তাদের পিষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা না থাকত, অতঃপর তাদের কারণে তোমরা অজ্ঞাতসারে ক্ষতিগ্রস্ত হতে, তবে সব কিছু চুকিয়ে দেয়া হত” (সুরা ফাতহ:২৫)

 

  • যারা এই তাগুতদের কুফর করার ব্যাপারটি বিশ্বাস করে এবং তাদের কুফর চিনতে পারে কিন্তু তাদের উপর তাকফির করে না। যদিও তারা দুর্বল না এবং তাদের সুরক্ষা রয়েছে। এরা হল প্রতারনাকারী এবং এরা এই আয়াতের অধীনে পড়ে –

 

وَدُّوا لَوْ تُدْهِنُ فَيُدْهِنُونَ [٦٨:٩]

“তারা চায় যদি আপনি নমনীয় হন,তবে তারাও নমনীয় হবে”। [সুরা আল-কালাম, ৯]

 

তাদের ব্যাপারে হুকুম হল গুনাহগারদের অনুরূপ এবং তাদের অবস্থা, প্রেক্ষাপট ও এমন কাজের কারণ অনুযায়ী তাদের গুনাহর মাত্রা নির্ধারিত হবে। শায়খ সুলাইমান ইবনু আব্দুল্লাহ আহলুশ শায়খ বলেন –

 

“যদি সে তাদের কুফরকে স্বীকার করে কিন্তু তাকফির করার মাধ্যমে তাদের বিরোধিতা না করে, তাহলে সে হল প্রতারণাকারী এবং সে আল্লাহ্‌র এই আয়াতের অধীনে পড়বে, “তারা চায় যদি আপনি নমনীয় হন,তবে তারাও নমনীয় হবে” এমন লোকের ব্যাপারে হুকুম হবে গুনাহগারদের অনুরূপ।

 

  • যারা বলে “অন্যান্যরা (তাগুতেরা) কুফরে পতিত হয়েছে। কিন্তু এই ব্যক্তি কুফর করেছে এটা আমি বলবো না, যদিও তারা কুফরের দিক থেকে সমান।” এভাবে এমন ব্যক্তিরা সম্পূর্ণভাবে তাগুতদের ওপর তাকফির থেকে বিরত থাকে। নিঃসন্দেহে এধরনের লোকদের ইসলামের উপর নজর দেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে, কারণ কুফর ও ইসলামের মাঝামাঝি আর কিছু নেই। ইসলাম যা কিছুকে কুফর বলেছে অথবা কুফফার বলেছে, সে কাফির এবং এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই, কোন তাউয়ীলের সুযোগ নেই। বস্তুত এই শ্রেণী আল্লাহ্‌র হুকুম তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবার পর সেটাকে প্রত্যাখ্যান করেছে।শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল ওয়াহাব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,

 

“কুফর বিত তাগুতের অর্থ হল, আল্লাহ ব্যাতীত যা কিছুর ইবাদত করা হয় – যেমন জিন, মানুষ, গাছ, পাথর ইত্যাদি – তুমি তাদের মিথ্যা হবার উপর বিশ্বাস রাখবে। তুমি এর কুফরের ব্যাপারে সাক্ষ্য দেবে এবং সাক্ষ্য দেবে যে এদের পথ হল বাতিল পথ এবং যে কেউ এ পথের অনুসরণ, তুমি তাকে ঘৃণা করবে, চাই  সে তোমার বাবা হোক কিংবা ভাই। যারা বলে আমি কেবল আল্লাহ্‌রই ইবাদত করবো কিন্তু যাদের আল্লাহ্‌র অংশীদার সাব্যস্ত করা হয় তাদের বিরোধিতা করবো না, তারা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর উপর মিথ্যার করেছে। এবং তারা না আল্লাহ্‌র উপর বিশ্বাস রাখে আর না তাগুতকে অবিশ্বাস করে।”

 

খ) যারা তাগুতদের অবস্থা সম্পর্কে জানে এবং তারা যে ঈমান ভঙ্গকারী বিষয় ও কুফরে পতিত হয়েছে তার ব্যাপারে জানে, তাদের বাতিল হওয়া সম্পর্কে ওয়াকিবহাল এবং মনে মনে তাদের ঘৃণা করে। কিন্তু তারা বলে যে, কাজটি কুফর কিন্তু ব্যক্তির উপর ততোক্ষণ তাকফির করা হবে না যতোক্ষন না হুজ্জাহ কায়েম হচ্ছে এবং তাকফিরের শর্তসমূহ পূর্ণ হচ্ছে এবং প্রতিবন্ধকগুলো অপসারিত হচ্ছে। অথবা তারা তাকফিরের ব্যাপারে সংশয়বোধ করে কারণ তারা এমন লোকদের মাধ্যমে বিভ্রান্ত হয়েছে যারা ইলমের দাবি করে, অথবা এই কারণে যে তারা কোন নির্দিষ্ট শায়খ বা তাদের নজরে সম্মানিত কোন ব্যক্তির তাকলিদ করে, অথবা এই কারণে যে তারা মনে করে এই ব্যাপারে কোন তাউয়ীল আছে, অথবা এই কারণে যে তারা আলিমদের বক্তব্য ভুলভাবে বুঝেছে ও ব্যাখ্যা করেছে যা তাদেরকে ঐসব তাগুতদের তাকফিরের ব্যাপারে বিরত করেছে যারা নিজেদের মুসলিম দাবি করে।

এমন ব্যক্তিদের শুরুতেই তাকফির করা হবে না, এবং হুজ্জাহ প্রতিষ্ঠা করার আগে ও তাদের সকল সন্দেহ দূর করার আগে  এমন ব্যক্তিদের তাকফির করার অনুমোদন নেই। এ ব্যাপারে ইজমা আছে।

 

শাইখ আহমাদ ইবনে হামুদ আল খালিদি এর [اإليضاح والتبيين في حكم من شك أو توقف في كفر بعض الطواغيت”] কিতাব থেকে নেওয়া।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *