শাসকদের ব্যাপারে সাবধান – সুফিয়ান সাওরী রহ. এর উপদেশমালা ও শিক্ষা

সুফিয়ান সাওরী[ii] রহ. আব্বাদ ইবন আব্বাদ আল খাওয়াস আল-আরসুফি[iii] কে একটি চিঠিতে বলেছিলেন-

“তুমি এমন এক সময়ে বসবাস করছ যে সময়ে বসবাস করা থেকে নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাহাবাগণ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) পানাহ চাইতেন। অবশ্যই দ্বীন এর যেকোনো ব্যাপারে তারা আমাদের চাইতে ভাল বুঝতেন। দ্বীন এর ব্যাপারে অন্যান্যদের মতামতের চাইতে তাদের মতামত আমাদের কাছে অগ্রগণ্য। ভাববার বিষয় হল সাহাবাগণ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) যে সময়টাকে অপছন্দ করতেন সে সময়ে আমরা যারা অবস্থান করছি তাদের কী অবস্থা? যেখানে আমাদের সাহাবাদের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তুলনায় জ্ঞান কম, ধৈর্য কম, ভাল কাজে সাহায্যকারী কম, মানুষের মধ্যে মহামারীর মত দুর্নীতির বিস্তার সর্বোপরি একটি ভয়াবহ দূষণযুক্ত পৃথিবীতে আমাদের বসবাস করতে হচ্ছে। তোমার প্রতি নসীহা হচ্ছে দ্বীনের সঠিক ও মূল রাস্তাটি খুঁজে নাও এবং একে আঁকড়ে ধরে রাখ।[iv]

তোমার প্রতি আমার উপদেশ থাকবে গুরাবা হয়ে থাকো যেহেতু সময়টায় গুরাবা হয়ে থাকার।[v]

একাকী থাকো এবং মানুষজনের সাথে কম মেশার চেষ্টা করো। পূর্ববর্তী সময়ে লোকেরা একজন আরেকজন দ্বারা উপকৃত হতেন। কিন্তু বর্তমানে উপকারের চাইতে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই আমাদের মতে লোকজনকে পরিত্যাগ করার মধ্যেই তোমার ঈমানের নিরাপত্তা নিহিত[vi]

শাসকদের ব্যাপারে সাবধান থেকো। যে কোন উদ্দেশ্যেই তাদের কাছে যাওয়া ও তাদের সংশ্রব এর ব্যাপারে সাবধান থেকো। তাদের দ্বারা প্রতারিত হওয়ার ক্ষেত্রে সাবধান। শয়তানের খুব সূক্ষ্ম চাল হল সে মানুষের অন্তরে এই চিন্তা ঢুকিয়ে দেয় যে “আমিতো শুধু মাত্র অসহায় লোকদের সাহায্য করার জন্য বা কারো উপর আরোপ করা জুলুমের ভার লাঘব করার জন্য শাসকদের সাথে আছি বা তাদের কাছে আসা যাওয়া করি। এই ধোঁকায় অনেকেই পড়ে আছে যারা এই যুক্তিকে শাসকের কাছে প্রিয় পাত্র হওয়ার জন্য অজুহাত হিসেবে কাজে লাগায়[vii]

এটা বলা হয়ে থাকে যে- “জাহিল আবিদ ও উলামায়ে সু এর ফিতনা এর ব্যাপারে সাবধান থেকো। কারণ এই দু’দলের ফিতনা এমন ধরণের যা সকলকেই সহজেই গোমরাহীতে ফেলে দেয়”।

যদি তোমার কাছে কোন প্রশ্ন আসে ও এর জন্য কোন ফতোয়ার প্রয়োজন হয় তাহলে এটি করতে যেয়ে এর সুবিধাটুকু গ্রহণ করো। কিন্তু সাবধান এর জন্য প্রতিযোগিতায় নেমে যেয়ো না। ঐ সকল লোকদের মত হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক হও যারা তাদের ফতোয়াগুলো মানা হলে খুশি হয়, যারা তাদের কথাগুলো প্রচার হলে বা অনেক মানুষ  শুনলে আত্মতুষ্টিতে ভোগে। যখন এর উলটোটা ঘটে তখন তার প্রভাব এই সকল আত্মতুষ্টিতে ভোগা লোকজনের মধ্যে দেখা যায়।[viii]

নেতৃত্বের প্রতি আকাঙ্ক্ষার ব্যাপারে সতর্ক হও। যদিও যে কোনো মানুষের কাছে নেতৃত্ব স্বর্ণ-রুপার চাইতেও বেশি পছন্দের তবু এটি কঠিন ও অস্পষ্টতায় ভরপুর। এবং বিজ্ঞ উলামাগণ ছাড়া এটি অধিকাংশ মানুষই বুঝতে পারেনা।[ix] তাই নিজের নফসের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখ ও সহীহ নিয়তে কাজ করতে থাকো। মনে রেখ মানুষের জীবনে এমন কিছু ব্যাপার আসে যার চাইতে মৃত্যু তার কাছে অনেক বেশি পছন্দের মনে হয়।

ওয়াসসালাম।[x]

মন্তব্য

[i] সায়েখ সালিম আল-হিলালি এর “ওয়াসাউস-সালাফ” নামক বই থেকে উপরোক্ত ওসিয়াত এর ব্যাখ্যা নেয়া হয়েছে।

[ii] তার পুরো নাম আবু আবদুল্লাহ সুফিয়ান ইবন সাইদ ইবন মাসরুক আস সাওরি (৯৭-১৬১ হিজরি)।

তার সাওরি খেতাবটি এসেছে ইবন আবদ মানাত থেকে। হামদান এর সাওরি থেকে নয়। তার স্মরণশক্তি ছিল অসাধারণ। তাকে বলা যায় জ্ঞানের এক বিশাল আধার। পূর্ববর্তী উলামাগণের মধ্যে তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার জীবনী সুবিদিত এবং জারহ ও তা’দীল (বর্ণনাকারীগণের ন্যায়পরায়ণতা বা দোষত্রুটি সংক্রান্ত ইলম), ইতিহাস এবং ফিকহ গ্রন্থে ভরপুর।

সুফিয়ান সাওরি রহমাতুল্লাহে আলাইহি এর ব্যাপারে কিছু তথ্য নিচে দেওয়া হল যেগুলো যাহাবী রহমাতুল্লাহে আলাইহি এর “সিয়ারু আ’লামিন-নুবালা” ও আল-হাফিজ ইবন হাজার আল-আসকালানী রহ. এর “তাহযীবুত তাহযীব” থেকে নেওয়া হয়েছে।

তার উস্তাদদের মধ্যে রয়েছেন-“আবু ইসহাক আস-শা’বী, আল-আ’মাশ, সুলায়মান আত-তাইমী, ইব্রাহিম ইবনে মাইসারাহ, ইবন আওন, যাইদ ইবনে আসলাম, আমর ইবনে দিনার, ইবনে আজলান, ইবনুল মুনকাদির, আবু-যুবায়ের, ইয়াহইয়া ইবন সাইদ আল আনসারী প্রমুখ।

তার ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন :  শু’বাহ, আল- আওযায়ী, মালিক, আব্দুর রাহমান ইবনে মাহদি, ইয়াহইয়া ইবনে সাইদ আল কাত্তান, ইবনুল মুবারাক, হাফস ইবন গিয়াস, আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহব, আব্দুর রাযযাক, ফুযাইল ইবন ইয়ায, ওয়ালিদ ইবনে মুসলিম, ওয়াকি’ ইবনুল জাররাহ, ইয়াযিদ ইবনে হারুন, আবু নুয়াইম, এবং আলী ইবনুল জাদ- যিনি সুফিয়ান সাওরি থেকে সর্বশেষ নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী ছিলেন।

শু’বাহ, ইবনে উয়াইনাহ, আবু আসিম। ইবনে মায়ীন ও অন্যান্য আরও অনেকে বলেছেন-“হাদীস বিশারদগণের মধ্যে প্রধানতম হচ্ছেন সুফিয়ান সাওরী।

ইবনুল মুবারাক বলেন যে : আমি এক হাজার একশো শাইখের নাম লিখতে পারব কিন্তু সুফিয়ান তাদের মধ্যে সর্বোত্তম। একলোক জিজ্ঞাসা করেছিলেন -“হে আবু আবদুল্লাহ, আপনি তো সাইদ ইবনে জুবায়ের সহ অন্যান্যদের দেখেছেন” সাইদ ইবন জুবায়ের উত্তরে বলেন- “সেটা ছিল পূর্ব সময়কার ব্যাপার। আমি একথা বলিনি যে আমি সুফিয়ান এর চাইতে উত্তম আর কাউকে দেখিনি।

“ইবন মাহদী বলেছেন- “ওয়াহহাব  ‘মালিক’ এর চাইতে ‘সুফিয়ান’ এর স্মরণশক্তিকে  প্রাধান্য দিতেন”।

আদ-দুওয়ারি বলেছেন-“ আমি ইয়াহইয়া ইবন মাইন কে দেখেছি যে তিনি তার সময়কালে ফিকহ, হাদিস, যুহদ সহ যেকোনো বিষয়ে অন্য যে কারো চেয়ে সুফিয়ানকেই প্রাধান্য দিতেন।

আহমাদ বিন হাম্বাল রহ. বলেন- “আমার অন্তরে যে সকল শাইখদের জন্য ভালবাসা আছে সুফিয়ান এক্ষেত্রে  অগ্রগামী”

আন-নাসাই বলেছেন-“ তাকে নির্ভরযোগ্য বলার চাইতেও তিনি অনেক বড়। আমি আশা করি তিনি সে সকল ইমামদের একজন যাদেরকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বিশ্বাসীদের জন্য ইমাম হিসাবে প্রেরণ করেছেন।

ইবনু আবী যিহব বলেন –“আমল, আখলাক, জ্ঞান ও দ্বীন এর সঠিক বুঝের ক্ষেত্রে তাবেয়ীগণের সবচাইতে কাছাকাছি হিসেবে আমি সুফিয়ান কে পেয়েছি। তাবেয়ীগণের কাছাকাছি হওয়ার ক্ষেত্রে তার চাইতে উত্তম কাউকে পাইনি।

ইবন হিব্বান বলেছেন- “ফিকহ, জিহাদ ও ন্যায়পরায়ণতায় তিনি ছিলেন অগ্রগামীদের একজন”

ইবন উয়াইনাহ বলেছেন- “হালাল-হারাম সম্পর্কে সুফিয়ান সাওরির চেয়ে অভিজ্ঞ আর কাউকে আমি দেখিনি।

ইসহাক ইবন রাহাওয়াইহ বলেন – “আমি আব্দুর রাহমান ইবন মাহদি কে সুফিয়ান, শু’বাহ, মালিক ও ইবনুল মুবারাক এর নাম উল্লেখ করার পর বলতে শুনেছি -এদের মধ্যে সুফিয়ানই সবচাইতে জ্ঞানী।

মুহাম্মাদ ইবন যুনবুর বলেন -“আমি ফুযাইল কে বলতে শুনেছি- আল্লাহর শপথ,  সুফিয়ান আবু হানিফার চাইতেও জ্ঞানী ছিলেন।

বিশর আল হাফি বলেন -“সাওরি আমাদের কাছে জনসাধারণের ইমাম”।

কাবীসাহ বলেন – “আমি সুফিয়ান সাওরির সাথে বসেছি অথচ মৃত্যুর কথা স্মরণ হয়নি এমনটা কখনো ঘটেনি।  তার মত এত বেশি মৃত্যুকে স্মরণ করতে আর কাউকে দেখিনি।

সুফিয়ান সাওরিকে বলা হয়েছিলো “আপনি আর কত বছর হাদীস নিয়ে গবেষণা করতে চান? উত্তরে তিনি বলেছিলেন- হাদীস নিয়ে গবেষণা করার চাইতে উত্তম আর কি আছে? হাদীসের জ্ঞান পৃথিবীর সকল জ্ঞানের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম।

আব্দুর রাহমান ইবনে মাহদি বলেন – “আল্লাহ রাসুল (সাঃ) থেকে আমি যত হাদীস পেয়েছি প্রত্যেকটি হাদীসে  আমি অন্তত একবার হলেও আমল করেছি। সম্পাদকের সংযোজন এখানেই শেষ হল।

তার জীবন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে তাহযীবুল কামাল (১১/৫৪), আত-তাবাকাতুল কুবরা (৬/৩৭১), তারিখ বাগদাদ ( ৯/১৫১), সিয়ারু আলামিন নুবালা (৭/২২৯) এই বইগুলোতে । আবু নুয়াইম ইসফাহানী ‘হিলয়াতুল আওলিয়া’ বইতে তার পরিপুর্ণ ও বিস্তারিত জীবনী লিখেছেন। এই বই এর মত আর কোন বই পাওয়া যায় না।

 

৩) তার নাম আবু উতবাহ আব্বাদ ইবন আব্বাদ ইবন খাওয়াস আল-আরসুফি আস-শামি। শামের একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। (এখানে শাম বলতে সিরিয়া, জর্ডান ও ফিলিস্তীনকে বোঝানো হয়েছে)। ইয়াহইয়া ইবনে মাইন, ইয়াকুব ইবনে সুফিয়ান আল ফাসায়ি ও অন্যান্যরা তাকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন। তার জীবন সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যাবে তারীখ দারিমি (নং ৪৯৫),  আল ফাসায়ির লিখিত আল-মা’রিফাহ ওয়াত-তারিখ (২/৪৩) এবং হিলায়াতুল আওলিয়া বইতে।

 

৪) রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনী ও পথ চলা থেকে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে প্রত্যেকের মাঝে ইত্তিবা (রাসুলুল্লাহ ও সাহাবায়ে কেরামের পথ অনুসরণ) থাকা জরুরী। যে পথে রাসুল ও তার সাহাবাগণ চলেছেন সে পথকে আঁকড়ে ধরে রাখতে হবে। ইবন মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে সাহীহ সনদে বর্ণিত আছে যে-“ সুন্নাহ অনুসরণ কর ও বিদআতের উদ্ভাবন কর না, এটিই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে।

উপরোক্ত হাদীসটি ওয়াকি’ তার আয-যুহদে (৩১৫ নং), আহমাদ তার আয-যুহদে (পৃষ্ঠা ২০২), আদ-দারিমি তার সুনান এর ভুমিকায় (১/৬৯) সহ আরও অনেকে উল্লেখ করেছেন। এই হাদীসটির বেশ কয়েকটি সনদ হওয়ায় এর সনদ অনেক শক্তিশালী হয়েছ। এছাড়া আহমাদ ও আত-তাবারানি তাদের আল-কাবির ও সাহিহ গ্রন্থে এটার পাশে অনেক অনুলিখন লিখার কারণে এর সনদ আরও শক্তিশালী হয়েছে।

৫) যারা লোক চক্ষুর অন্তরালে থাকে, নিজেদেরকে খুব বেশি মানুষের সামনে প্রকাশিত করে না বা মেশে না তাদেরকে ‘খামিল’ বলা হয়। এটি উত্তম আখলাক ও তাকওয়ার একটি লক্ষণ, কেননা যারা ঈমানের হেফাজতের কথা চিন্তা করে তারা কখনোই “রিয়া” প্রদর্শনের আশংকা থেকে গাফেল হয়ে যায় না। তাই তারা খুব সতর্কতার সাথে চেষ্টা করে মানুষ যেন তাদের ভালো কাজগুলোর কথা জানতে না পারে। তারা নিজেরাও তাদের ভালো কাজগুলোর কথা ভুলে যেতে বা খুব বেশি গুরুত্বের সাথে মনে রাখা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করে। তারা সাধারণ মানুষ যেভাবে নিজেদের পাপের কথা লুকিয়ে রাখে তার চাইতেও বেশি সতর্কতার সাথে তারা তাদের ভাল কাজগুলোর কথা গোপন রাখে। তারা আশা করে ভালো কাজের ক্ষেত্রে এই আন্তরিকতার জন্য আল্লাহ্‌ কেয়ামতের মাঠে তাদেরকে উত্তম পুরষ্কার দান করবেন। এই লোক চক্ষুর অন্তরালে থাকা লোকগুলো প্রশংসিত হতে চান না, হওয়ার চেষ্টাও করেন না এবং যদি পরিস্থিতি এমন হয় যে তার যে কোন একটি কাজ তাকে প্রশংসিত করার দিকে নিয়ে যাবে আল্লাহ্‌ চাইলে সে কাজ থেকে তারা সরে যান। তারা লোকজনের কাছে প্রকাশিত হতে চান না।

ইমাম মুসলিম তার সাহিহ গ্রন্থে (১৮/১০) ও আল বাগভী ‘শারহুস সুন্নাহ’ (১৫/২১-২২) তে এই হাদীসটি উল্লেখ করেছেন-“আমির ইবন সা’দ ইবনে আবী ওয়াককাস বর্ণনা করেন- একদিন সা’দ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) মরুভুমিতে তার মেষ ও উটগুলোকে দেখাশোনা করছিলেন, এ সময় তার ছেলে উমর তার কাছে আসলেন। সা’দ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তার ছেলেকে দেখতে পেয়ে বললেন-“আমি এই আরোহণকারীর শয়তানী থেকে আল্লাহ্‌র কাছে পানাহ  চাই”। উমর তার পিতার কাছে এসে বলল; বাবা, আপনি কি মরুভূমিতে ঘুরে ঘুরে মেষ ও উট চরানো আরব হিসেবেই সন্তুষ্ট হয়ে গেলেন যখন লোকজন আলোচনা করছে যে মদিনার পরবর্তী শাসক কে হবে?”। সা’দ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) উমার এর বুকে হালকা করে আঘাত করে বললেন- চুপ কর! “আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি- “নিশ্চয় আল্লাহ্‌ ধর্মভীরু, নিজের অবস্থার উপর সন্তুষ্ট ও লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা বান্দাদের ভালবাসেন”।

তাই সুফিয়ান সাওরী রহ. “সময়টা লোকচক্ষুর অন্তরালে গুরাবা হয়ে থাকার সময়” বলতে বুঝাতে চেয়েছেন এটা এমন একটা সময় যখন লোকজনকে তাদের ভাল কাজগুলোকে লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখতে হবে। তার মানে এই নয় যে অজ্ঞাত হিসাবে লোকচক্ষুর অন্তরালে গুরাবা হয়ে থাকতে যেয়ে সে সব কাজ কর্ম ছেড়ে দিয়ে অলস অকর্মণ্য হয়ে যাবে। এর স্বপক্ষে ২ টি প্রমাণ রয়েছে।

প্রথমত, নবীজি (সাঃ) বলেছেন-“আল্লাহ্‌ তা’আলার কাছে শক্তিশালী ঈমানদার দুর্বল ঈমানদার থেকে বেশি পছন্দের”

দ্বিতীয়ত, এটি একটি প্রতিষ্ঠিত ও বহুল বর্ণিত হাদিস যে নবীজি (সাঃ) সবসময় আল্লাহ্‌ তা আলার কাছে কুঁড়েমি ও অলসতা থেকে পানাহ চাইতেন।

 

৬ ) উযলাহ শব্দের অর্থ একাকী থাকা। এখানে উযলাহ শব্দ দিয়ে লোকজনের সাথে কম মেশার কথা বুঝানো  হয়েছে যদিও এখনো লোকজনের কাছ থেকে পারস্পরিক কিছু উপকার নেয়ার রাস্তা রয়েছে। তাই তিনি এ কথা বুঝাতে চাননি যে সকল কে পরিত্যাগ করে থাকতে হবে কারণ একজন দায়ী যদি লোকজনকে আল্লাহ্‌ এর পথে নাই ডাকেন তাহলে অজ্ঞ-বিধর্মী এরা কিভাবে আল্লাহ্‌র কথা জানবে? সংশয়ে আক্রান্ত ব্যক্তি কিভাবে সঠিক পথের খোঁজ পাবে? যে আল্লাহকে না মেনে নিজের উপর নিজেই জুলুম করছে সে কিভাবে মুক্তির পথ পাবে? আর এব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে যিনি ধৈর্যের সাথে এই সকল লোকজনের সাথে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌ তা’আলার জন্য মেশেন, তাদেরকে আল্লাহ্‌ চেনা, সংশয় দূর করা, জুলুম থেকে উত্তরণের পথ দেখান। তাদের জন্য পরকালে আল্লাহ্‌ তা’আলার কাছে অনেক পুরষ্কার রয়েছে।

 

৭) ইবনুল জাওযী (মৃত্যু; ৫৯৭ হিজরি) (রহিমাহুল্লাহ) তার ‘তালবীস ইবলিস’ বইতে (পৃষ্ঠা ১২১-১২২) বলেছেন-“উলামাগণ যখন শাসকদের সাথে মেশা শুরু করেন ইবলিস তখন তাদেরকে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করে। এই ধোঁকার ফলে আলেমগণ শাসকদের তোষামোদ করা শুরু করেন এবং সুযোগ থাকা স্বত্বেও তাদেরকে অন্যায় কাজে বাধা প্রদান থেকে বিরত থাকেন। তারা শাসকদের সে সকল ক্ষেত্রেও ছাড় দেয়া শুরু করেন যেখানে ইসলাম কোন ছাড় দেয়না এর ফলে তারা দুনিয়াবি কিছু স্বার্থ হাসিল করতে পারেন। আর এভেবেই অন্যায় ও দুর্নীতির রাস্তা তারা খুলে দেন।

 

প্রথমত, শাসকরা বলে থাকে- আমি যদি সঠিক না হতাম তাহলে এই সকল আলেমরা অবশ্যই আমাকে বাধা প্রধান করতেন। আর যেহেতু তারা আমার দেয়া সম্পদ-হাদিয়া গ্রহণ করছেন সেহেতু অবশ্যই আমার সম্পদ-হাদিয়া হালাল।

 

দ্বিতীয়ত, সাধারণ জনগণ বলে থাকে- এই শাসকের শাসন ব্যবস্থা, তার সম্পত্তি, তার কাজ কর্ম সবকিছুই ঠিক আছে। যদি ঠিক না থাকতো তাহলে অবশ্যই উলামাগণ তার সম্পর্কে সমালোচনা করতেন।

 

তৃতীয়ত, আলেমগণ বলে থাকেন-  যেহেতু তারা তাদের দ্বীনকে কলুষিত করেছেন  তাই শয়তান ইবলিস তাদের দ্বারা শাসকের উক্তির স্বপক্ষে যুক্তি প্রদান করায়। তারা বলে থাকেন আমরা শাসক ও সাধারণ মুসলিমদের মাঝে মধ্যস্থতা করার জন্য শাসকদের কাছে গিয়ে থাকি। তবে তাদের এই মিথ্যা ধোঁকা প্রকাশিত হয়ে যায় যখন অন্য কেউ শাসক ও মুসলিমদের মাঝে মধ্যস্থতা করার জন্য এগিয়ে আসে। তারা এই নতুন আগুন্তুককে নিয়ে খুশি হয় না। তারা শাসকের কাছে নতুন আগুন্তুককে নিয়ে আজে বাজে কথা বলে থাকে কারণ তারা শাসকদের একমাত্র মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকতে চায়।

 

তাই শাসকদের সাথে থাকা ঈমানদারদের জন্য খুব বিপদজনক। যখন আলেম উলামারা শাসকদের দরবারে যান তখন হয়ত সঠিক নিয়তেই যান, কিন্তু যখন শাসক তাদেরকে সম্মান করা শুরু করেন ও তাদের উপর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া শুরু করেন তখন তাদের মধ্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা চলে আসে। এরফলে তারা শাসকদের তোষামোদি করা শুরু করেন ও তাদেরকে তাদের অন্যায় কাজে বাধা প্রদান করা থেকে বিরত থাকেন। আর এভাবেই তাদের নিয়তের মধ্যে পরিবর্তন দেখা দেয়। সুফিয়ান সাওরি বলতেন- “শাসকরা আমাকে অপমান করবে বা ছোট করে দেখবে এটাতে আমি ভয় পাই না। আমি ভয় পাই যে তারা আমাকে সম্মান করবে যার ফলে আমার অন্তর তাদের দিকে ঝুকে পড়বে।

 

হাফিজ ইবন রজব হাম্বালি (মৃত্যু ৭৯৫ হিজরি) তার শারহুল হাদীস মা’যিবান (পৃষ্ঠা ৫৩) তে বলেন” অনেক সালাফগণ আলেম উলামাদের শাসকদের দরবারে সৎ কাজের আদেশ অসৎ কাজে নিষেধ করার উদ্দেশ্যে যেতেও নিষেধ করে থাকেন। এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে যারা তারা হলেন

উমার ইবন আব্দুল আযিয, ইবনুল মুবারাক, সুফিয়ান সাওরি প্রমুখ। ইবনুল মুবারাক বলেছেন – “আমাদের সাথে যারা তারা এমন নয় যে তারা শাসকদের সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করার উদ্দেশ্যে তাদের দরবারে প্রবেশ করেন। বরং তারা তো এমন; শাসকদের দরবারের বাইরে থেকে তাদেরকে সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করেন। এই পদ্ধতিতে কাজ করার কারণ একটাই যে, কেউ যখন শাসকদের দরবারে প্রবেশ করে তখন তার ধোকায় পরার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। একজন আলেম যখন শাসকদের দরবার থেকে দূরে থাকবেন তখন তার ধোঁকায় পড়ার সম্ভাবনা কম থাকে। এক্ষেত্রে তিনি সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ পূর্বক সে বিষয়ের উপর অটল থাকতে পারেন। কিন্তু যখন তিনি শাসকদের দরবারে তাদের মুখোমুখি হন তখন তার অন্তর শাসকদের দিকে ঝুকে পড়ে। কেননা সম্মানিত হওয়া ও সম্মান পাওয়ার ইচ্ছা মানুষের জন্মগত ভাবেই অন্তরে লুকিয়ে থাকে। এর ফলে তিনি তাদের তোষামোদ করা শুরু করেন ও তাদের প্রতি কোমল হওয়া শুরু করেন, তার অন্তর শাসকদের দিকে ঝুকে পরে, তিনি শাসকদের ভালবাসতে শুরু করেন। শাসক যদি আলেম-উলামাগণকে শ্রদ্ধা ও ভালবাসার সাথে গ্রহণ করে, আলেমগণও শাসকদের ভালবাসার সাথে গ্রহণ করা শুরু করেন। এমন ঘটনাই ঘটেছিল আব্দুল্লাহ ইবন তাউস ও তার সময়কালের একজন শাসকের মধ্যে। ফলে তাউস ছেলেকে বকা দেন ও বিতাড়িত করেন। আর সুফিয়ান সাওরি আব্বাদ ইবন আব্বাদ কে “শাসকদের ব্যাপারে সাবধান-” বলে একটি  চিঠি লিখেন।

 

আন্দালুসের আলেম ইবনু আব্দিল বার (মৃত্যু ৪৬৩ হিজরি) তার ‘জামিউ বায়ানিল ইলম’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ১/১৮৫-১৮৬) অধ্যায়টি এটা বলে শেষ করেছেন যে, সালাফরা শাসকদের দরবারে যাওয়াকে ঘৃণা করতেন।

 

এই অধ্যায়ের বিষয়বস্তু হল অত্যাচারী, দুর্নীতিপরায়ণ শাসকদের সাথে আলেমদের আচরণ কেমন হবে। যাইহোক শাসক যদি মহৎ ও ন্যায়পরায়ণ হয় তাহলে তার দরবারে যাওয়া, তার সাথে দেখা করা, তাকে ভালো ও উত্তম কাজে সাহায্য করা নিঃসন্দেহে অনেক সওয়াব পাওয়ার মত কাজ। এর উদাহরণ আমরা দেখতে পাই উমার ইবনে আব্দুল আযীয এর জীবনিতে। তার দরবারে সেসময়কার শ্রেষ্ঠ আলেমরা যেমন উরওয়াহ ইবনে যুবায়ের ও ইবনে শিহাব আয-যুহরি এর মত উলামারা ছিলেন।

 

উমার ইবন আব্দুল আযিয এরপর ইবনে শিহাব আব্দুল মালিকের দরবারে আসা যাওয়া করতেন। ইবনে শিহাবের পর তার ছেলেও আব্দুল মালিকের দরবারে আসা যাওয়া করেছেন। এ ছাড়াও আরও অন্যান্য যে সকল আলেম উলামাগণের শাসকদের দরবারে আসা যাওয়া ছিল তারা হলেন আশ-শা’বী কাবীসাহ, ইবনে যু’আইব, ইবনে হায়াত আল কিন্দি, আবুল মিকদাম (যিনি অনেক বড় মাপের আলেম ছিলেন), আল হাসান, আবুয যিনাদ, মালিক ইবন আনাস, আল আওযাই, আশ-শাফিই এবং আরও অনেকেই। যদি আলেম উলামাগণ শাসকদের দরবারে প্রয়োজন অনুযায়ী যান ও তাদেরকে বিভিন্ন কাজে তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সাহায্যে সৎ উপদেশ দেন তাহলে অবশ্যই তা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার উপর আল্লাহ তা আলার সন্তুষ্টির কারণ। কিন্তু শাসকদের দরবারগুলো ফেতনা ও পরীক্ষার যায়গা তাই নিজেদের ঈমানের নিরাপত্তার স্বার্থে এগুলো এড়িয়ে চলাই উত্তম।

 

অবশ্যই তাঁরা সত্য বলছেন, হক কাজটি করেছেন ও হিকমাতের সাথে সঠিক উপদেশ দিয়েছেন।

আল্লাহ এর রাসুলের নিচের কথাটি শোনার পর তারা যা করেছেন, বলেছেন এ ছাড়া আর কী-ইবা বলতে বা করতে পারেন। আল্লাহ এর রাসুল (সাঃ) বলেছেন “শাসকদের কাছে যারা আসে তাদেরকেই পরীক্ষার সম্মুখীন করা হয়।” হাদিসটি আবু দাউদ (নং ২৮৫৯), তিরমিজি (নং ২২৫৬), নাসায়ী (৭/১৯৫-১৯৬), আহমাদ (১/৩৫৭) এবং অন্যান্য আরও অনেকেই আবু মুসা আশ’আরী রাঃ থেকে বর্ণনা করেন।

৮) এটি হল রিয়া। সাধারনভাবে যেটাকে লোক দেখানোর বা লোকের প্রশংসা পাওয়ার জন্য ইবাদাত করাকে বুঝায়। আমি  রিয়ার কারণ, এটি কিভাবে হয়, এর প্রকারভেদ, এবং এটি থেকে মুক্তির উপায় আমার “আর-রিয়া” নামক বইতে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি।

 

৯) ইবন আব্দুল-বার তার “জামিউ বায়ানিল-ইলম “ বইতে (১/১৪৩-১৪৪) লিখছেন-

নেতৃত্বের প্রতি ভালবাসা বিষের মত যা জীবনকে ধ্বংস করে দেয়,

এবং এর প্রেমিককে যুদ্ধের প্রতি আকর্ষিত করে,

এটি সম্পর্কের বন্ধন ও জিহ্বার বাধ ভেঙ্গে দেয়,

ফলে চরিত্র ও দ্বীন দু’টিই ধ্বংস হয়ে যায়।

জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ছাড়া যে নেতৃত্ব পেয়ে যায়

সত্যানুরাগীদের শত্রু ছাড়া সে আর কিছু নয়,

মানুষকে ধাবিত করে তারচেয়েও নিকৃষ্ট দিকে

এরদ্বারা নবীজির শত্রুদের সাথে প্রতিযোগিতা করে।

 

লেখক এখানে যা বলতে ও বুঝাতে চেয়েছেন তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোন তালিবুল ইলম এ ব্যাপারে বিস্তর পড়াশোনা করে তাহলে অবশ্যই সে লাভবান হবে।

 

১০) আবু নুয়াইম তার ‘আল-হিলইয়াহ’ তে (৬/৩৭৬-৩৭৭) ,  ইবন রজব তার ‘শারহুল হাদিস মা’যীবান’ (পৃষ্ঠা ৫৩-৫৪) তে  এবং আয-যাহাবি তার ‘সিয়ারু আ’লামিন নুবালা’ বইতে সুফিয়ান সাওরির জীবনী অধ্যায়ে এই উক্তির কথা বর্ণনা করেছেন। এটি আলেম উলামাদের অনেক পছন্দের ও বহুল আলোচিত একটি উক্তি।

হাফিজ আল মিযযী (রহিমাহুল্লাহ) তার ‘তাহযীবুল কামাল’ বইতে (পৃষ্ঠা ১৪/১৪৩) আব্বাদ ইবন আব্বাদ এর জীবনীতে লিখেছেন- “তিনি ছিলেন শাম ও এখানকার ঈমানদারদের মধ্যে উত্তমদের মধ্যে অন্যতম। এবং সুফিয়ান সাওরি তাকে তার সেই বিখ্যাত অসিয়তনামাটি লিখেছিলেন যেখানে জ্ঞান, শিষ্টাচার, উদ্বৃতি ও উপদেশের সমন্বয় ছিল”।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *