কুফফারদের থেকে জ্ঞান আহরণ

হাসান আব্দুস সালাম

রাজনীতি, সমরকৌশল, কূটনীতি, অর্থনীতির মতো নানা বিষয়ে কাফেরদের বিভিন্ন তত্ত্ব এবং গবেষণা থেকে গ্রহণ করার এবং সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে শর্ত হল এমন কিছু গ্রহন করা যাবে না, যা শরীয়তের মানদণ্ডে হারাম অথবা শরীয়তের মূলনীতি এবং উদ্দেশ্যসমূহের সাথে সাংঘর্ষিক। এই শর্তসাপেক্ষে কাফেরদের গবেষণা থেকে পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন সাপেক্ষে গ্রহণ করা যাবে।

এ বিষয়টি মুজাহিদিন নেতৃবৃন্দ, সমরতত্ত্ববিদ এবং আমভাবে সাম্প্রতিক অতীতের হকপন্থী উলামায়ে কেরামের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট। এখানে এমন কিছু বক্তব্য উত্থাপন করছি।

শায়খ আবু বকর নাজি রহ. বলেন,

“শত্রু ও তার সহগামীদের নেতৃত্ব ও নীতি সম্পর্কে যথাসম্ভব বিস্তারিত ব্যাখ্যা থাকা দরকার, যাতে তাদের রাজনীতি একজন মুজাহিদ গভীরভাবে বুঝতে পারে, এবং এ ধারণা থেকে সরে আসতে পারে যে, শত্রু শুধু ইসলাম বিদ্বেষের কারণে বা ধর্মীয় কারণে সংঘাতে লিপ্ত হয়।
গভীর পর্যবেক্ষণের পর এটি পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, শত্রুর অনেক গ্রুপের কাছে ধর্মীয় দিকটি দ্বিতীয় পর্যায়ের বা একেবারেই গৌণ। একইভাবে সামরিক কাজের পাশাপাশি রাজনৈতিক কমিটিগুলোতে কাজের যোগ্য হওয়ার জন্য একজন মুজাহিদ ছাত্রকে অবশ্যই প্রচুর ইতিহাস পড়তে হবে; এবং তা যাচাই করার যোগ্যতা থাকতে হবে। এছাড়াও মনোবিদ্যার উপরও পড়াশুনা থাকতে হবে।

ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন,
“যুদ্ধ, ইসলাম ও মুসলিমদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ এবং শরীয়াহ রাজনীতির সাথে যুক্ত বিধান ও নিয়মসমূহ মানুষের মতামতের ভিত্তিতে নেওয়ার চাইতে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন এবং তার পরিচালিত সামরিক অভিযানগুলোতে থেকে নেওয়াটা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত ও উত্তম।
অন্যদের মতামত থেকে নেওয়াটা এক ধরণের, আর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন থেকে নেওয়াটা আরেক ধরণের। তাওফিক একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।”

এখানে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. স্পষ্ট করেছেন, শরীয়াহ রাজনীতির বিষয়গুলো সুন্নাহ থেকে নেওয়াটাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। লক্ষণীয় হল তিনি বলেননি যে, সুন্নাহ থেকে নেওয়া আবশ্যক। বিষয়টি যাতে কেউ ভুল না বুঝে সেজন্য আমরা ইবনুল কাইয়্যিমের অন্য একটি লেখার কিছু অংশ তুলে ধরবো যা ব্যাপারটিকে আরও স্পষ্ট করবে:

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন,

‘ইবনে আকীল বলেন, ‘রাজনীতি’ হচ্ছে এমন যে কোনো কাজ, যা দ্বারা মানুষ কল্যাণের নিকটবর্তী হয় এবং অকল্যাণ ও ক্ষতি থেকে দূরে থাকে, যদিও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাজটি করেননি বা সে বিষয়ে ওহী নাযিল হয়নি।
এখন আপনি যদি রাজনীতির এই সংজ্ঞা দ্বারা ওই সকল বিষয়াদিকে রাজনীতির অন্তর্ভূক্ত করেন যা শরীয়াহর সাথে সাংঘর্ষিক নয় তাহলে কথাটি সঠিক। কিন্তু আপনি যদি বলেন যে, শরীয়াহ যা সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে তার বাইরে কোন রাজনীতি নাই, তবে আপনি ভুল করেছেন এবং এটা হবে সাহাবীদেরকেও ভুল প্রতিপন্ন করা।
শরয়ী রাজনীতির (সিয়াসাতের) বিষয়গুলোতে আমীরের প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য অনেকে দলিল চান। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এর উদ্ধৃতি থেকে তাদের এধরনের চাহিদার ভুল স্পষ্ট হয়।”

(ইদারাতুত তাওয়াহহুশ, ৩য় অধ্যায়ের ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদ)

শায়খ আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি বলেন,

“পাশ্চাত্য সভ্যতা সংস্কৃতি থেকে সুফল ভোগের মূলনীতি কী, সেটাও বোঝা জরুরি । পাশ্চাত্য কাফির এবং অন্যান্য সভ্যতা থেকে সুফল ভোগের পদ্ধতির মাঝে রয়েছে-
শিল্প ও কারিগরি, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, গবেষণা, সামরিক এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞান; যেমন: গণিত, রসায়ন, পদার্থ, প্রকৌশল, জীব ও জ্যোতির্বিদ্যা থেকে উপকৃত হওয়া।
এগুলোর ক্ষেত্রে সুফল ভোগের ব্যাপারে মুসলিমদের প্রয়োজন জাহেলি চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ণ যাচাই-বাছাইয়ের পর তা গ্রহণ করা এবং সেগুলো ইসলামের পরিচ্ছন্ন ধাঁচে বাস্তবায়ন করা।
এগুলোর মধ্যে কিছু বিষয় ওয়াজিবের মর্যাদা রাখে। এই ক্ষেত্রে অবশ্যই তা গ্রহণ করা উচিত এবং এর দ্বারা উপকৃত হওয়া উচিত। পশ্চিমাদের কাছ থেকে তা শেখা মুসলিমদের জন্য ফরজও বটে।

এগুলোর দ্বারা ওইসব জ্ঞানবিজ্ঞান উদ্দেশ্য , যা বর্তমানে মুসলিম উম্মাহর খুবই প্রয়োজন। কিছু কিছু জিম্মাদারি কেবল এগুলো দ্বারাই পূরণ করা সম্ভব। যেমন— অস্ত্র তৈরি ও সামরিক কলাকৌশল।

এসব আমরা পশ্চিমাদের কাছ থেকে আয়ত্ত করা ছাড়া দাওয়াত ও জিহাদের দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে পারব না। এ ছাড়া যেসব জ্ঞানবিজ্ঞান মুবাহ, সেগুলোও মুসলিমদের অর্জন করা আবশ্যক। কেননা, তারাই এগুলোতে দক্ষ হয়ে বিশ্বের নেতৃত্বের আসন অলঙ্কৃত করবে।

একটি ইসলামি কল্যাণরাষ্ট্র তখনই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, যখন তারা মুবাহ বিষয় ও যাবতীয় উপায়-উপকরণ পূর্ণ যাচাই-বাছাই ও বিচক্ষণতার সাথে গ্রহণ করবে। যেসব উপায়-উপকরণ গ্রহণ করার ইসলাম অনুমতি দেয় না, তার সংখ্যা অপ্রতুল। সেগুলো পরিত্যাগ করা ভালো। কেননা উপায়-উপকরণ সংস্থান করা এবং সেগুলো কাজে লাগানো মুসলিমদের জন্য জরুরি। সেগুলো ব্যবহার করে কাফিরদের আগ্রাসন ও ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা সম্ভব।”
(আদ দাওলাতুল উসমানিয়্যাহ)

শায়খ মুহাম্মদ আমিন আল-শানকিতি রহ. পশ্চিমা সভ্যতার প্রতি মুসলিমদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন,

“সম্পূর্ণ বিষয়টির প্রতি গভীর অভিচিন্তন ইঙ্গিত দেয় যে, পাশ্চাত্য সভ্যতায় উপকারী এবং ক্ষতিকারক উপাদান রয়েছে। সেগুলো বস্তুগত দিক থেকে উপকারী। সমস্ত বৈষয়িক ক্ষেত্রে এর অগ্রগতি স্পষ্ট। মানুষের জন্য সেগুলো অনেক উপকার সাধন করেছে।”

উপকারী বিষয় থেকে উপকৃত হওয়ার কথা বলার পর তিনি আরও বলেছেন,

“রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবুল আরিকত দুয়ালির পথপ্রদর্শন দ্বারা উপকৃত হয়েছেন। হিজরতের সফরে তিনি তার বাতানো পথ অবলম্বন করেছিলেন। অথচ সে ছিল কাফির। এই প্রমাণ দ্বারা বোঝা যায়, পশ্চিমা সভ্যতার ব্যাপারে ইসলাম এবং মুসলিমদের স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, বস্তুগত বিষয়াবলি; যা তারা আবিষ্কার করেছে, তা অর্জনে মুসলিমদের সচেষ্ট থাকা। এবং সৃষ্টিকর্তার সাথে তাদের ধৃষ্টতা প্রদর্শনকারী বিষয়াবলি হতে দূরে থাকা। এভাবে তারা ইহকাল ও পরকালের আলোকোজ্জ্বল যাত্রী হতে পারবে।”

(আদওয়াউল বায়ান, ৪/৪১২)

সাইয়িদ কুতুব রহ. বলেছেন,
“রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আকিদা ও ইসলামি মানহাজের ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের সাথে যে পরিমাণ কঠোরতা করেছেন; ঠিক সেরকম স্বাধীনতা দিয়েছেন অভিজ্ঞতা অর্জন, জ্ঞানবিজ্ঞান অর্জন ও চিন্তার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে, যাতে এসব লোক কৃষি ও সামরিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের রায় ও অভিজ্ঞতা দ্বারা সুফল ভোগ করতে পারে। কেননা, এসব বিষয়ের সাথে আকিদার সম্পর্ক নেই। এগুলো দ্বারা সমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রাখা যায়।
বিশ্বাস ও বস্তুগত বিষয়াদির মাঝে পার্থক্য স্পষ্ট। জীবনের মানহাজ ও পন্থা এক জিনিস, বিশুদ্ধ পরীক্ষামূলক এবং প্রায়োগিক বিজ্ঞান অন্য জিনিস। আল্লাহর দেওয়া পদ্ধতি অনুযায়ী জীবন যাপন করার জন্য ইসলাম এসেছে। সেই ইসলাম মস্তিষ্ককে জ্ঞানের পথ ধরে শরীয়াহ অনুমোদিত সৃজনশীলতাকে কাজে লাগানোর অনুমতি দেয়।”
(ফি যিলালিল কুরআন, ৪/২০-২১)

এমন আরো অসংখ্য উদ্ধৃতি ও আলোচনা রয়েছে। তবে আমাদের আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক হিসাবে এসকল উদ্ধৃতি থেকে আমরা এটুকু নিশ্চিত হতে পারি যে, কাফেরদের বিভিন্ন তত্ত্ব ও গবেষণা থেকে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন বিষয় গ্রহণ করা যাবে, এবং অনেক ক্ষেত্রে নেয়া জরুরী।

(২)

বাস্তবতা হচ্ছে সপ্তদশ শতাব্দীর ওয়েস্টফিলিয়া চুক্তি এবং ব্রিটেনের ‘গ্লোরিয়াস’ বিপ্লব, অষ্টাদশ শতাব্দীর মার্কিন ও ফরাসী বিপ্লব, পাশাপাশি শিল্প বিপ্লব, ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ এবং উসমানী সাম্রাজ্যের দুর্বলতা ও পতনের ফলে, ইউরোপের জাতিরাষ্ট্রের ধারনা ব্যাপকভাবে বিশ্বের সর্বত্র প্রচলিত হয়ে যায়।

প্রথমে ইউরোপে এ ধারণা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, তারপর গত শতাব্দীতে মুসলিম বিশ্বে এই ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয়। তখন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত, সারা বিশ্ব জুড়ে, বিশেষ করে সমতল ভূমির রাষ্ট্রগুলোতে এই ব্যবস্থা এতো মজবুতভাবে জেকে বসেছে এবং এত বেশী প্রভাব ফেলেছে যে–এই রাষ্ট্রগুলোতে শাসনযন্ত্রের বিপরীতে বিপ্লবী কার্যক্রম পরিচালনার প্রক্রিয়া অল্প কয়েকটি ধারাতে অনেকটা সীমিত হয়ে গেছে।

আবার, স্নায়ুযুদ্ধের দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হওয়ার ফলে চলমান রাস্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক কার্যক্রম ও সংগঠনের রাজনৈতিক লাইনের বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা নেয়ার ক্ষেত্রে এসকল সেকুলার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো থেকে কিছু বিশ্লেষণ মুসলিমদের গ্রহন করার প্রয়োজন হয়েছে।
যেমন:

• পিরামিড ধাঁচের ‘হায়ারার্কিকাল’ গোপন সংগঠনের ধারণার বড় একটি অংশ এসেছে ভ্লাদিমির লেনিনের কর্মপন্থা থেকে।

• হিকমাতুল্লাহ নোদীর ‘নিসাবে হারব’ মাওবাদী ধারার গেরিলা যুদ্ধের পরিবর্তিত রূপ।

• এছাড়াও, শায়খ আবু উবাইদা আল কুরাইশীর “বৈপ্লবিক যুদ্ধসমূহ”-এ মাও সে তুং-এর এবং আরও একাধিক প্রবন্ধে প্রুশিয়ান জেনারেল ক্লাউসভিতস এর চিন্তাধারার বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। অন্যদিকে গ্লোবাল জিহাদের ধারণার পিছনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ‘চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধ’/Fourth generation warfare – এর ধারণা তিনি নিয়েছেন মার্কিন বিভিন্ন সামরিক বিশ্লেষকের গবেষনা থেকে,

• আবার শায়খ আবু মুসআব আস সুরি লিডারলেস জিহাদের ধারণা এনেছেন মার্কিন ফার রাইট/উগ্র ডানপন্থী আন্দোলনের তাত্ত্বিকদের থেকে।

কাজেই বিদ্রোহ, বিপ্লব এবং গোপন সংগঠনের কর্মপদ্ধতির মতো বিষয়গুলোতে সেকুলার বিভিন্ন ঘরানা থেকে প্রয়োজন মতো বিভিন্ন উপাদান গ্রহণ করার বিষয়টি জিহাদি আন্দোলনের ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত।

(Visited 118 times, 1 visits today)