লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ!

শায়খ হারিস আন নাজ্জারি রহঃ

 পিডিএফ ডাউনলোড করুন

ওয়ার্ড ডাউনলোড করুন

তাওহীদের কালিমা

 

শাইখ হারেস আন নাযযারী রহ.

পরিবেশনায়

সূচিপত্র

কালিমাতুত তাওহিদের ফজীলত……………………………………………. ১

কালিমাতুত তাওহীদ হলো ‘আল ক্বাওলুছ্ ছাবিত’ (শাশ্বত বাণী)……………. ১

কালিমাতুত তাওহীদ হলো দাওয়াতুল হক্ব (সত্যের আহ্বান)…………………. ১

কালিমাতুত তাওহীদ হলো ‘কালিমাতুত তাক্বওয়া’ (তাক্বওয়ার বাণী)………… ২

কালিমাতুত তাওহীদের কারণেই গুণাহসমূহ মাফ করে ………………………. ২

কালিমাতুত তাওহীদ রক্তের হেফাজতকারী……………………………………২

কালিমাতুত তাওহীদ হলো জান্নাতের চাবী…………………………………….৩

কালিমাতুত তাওহীদ হলো চিরস্থায়ী জাহান্নাম থেকে নিরাপত্তা দানকারী………. ৩

কালিমাতুত তাওহীদ সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমল…………………………………….৪

কোন আমলই কালিমাতুত তাওহীদের সমতুল্য নয়……………………………৪

কালিমাতুত তাওহীদ সর্বশ্রেষ্ঠ যিকির …………………………………………৫

কালিমাতুত তাওহীদের শর্তসমূহ………………………………………………৬

আখিরাতে জাহান্নামের চিরস্থায়ী আযাব থেকে বাঁচার জন্য শর্তসমূহ………….. ৭

১ম শর্তঃ العلم (আল ইল্ম)…………………………………………………..৭

২য় শর্তঃ اليقين (আল ইয়াক্বীন)……………………………………………..৭

তৃতীয় শর্তঃ القبول (আল কবুল)…………………………………………….৮

৪র্থ শর্তঃ الإنقياد (আল ইনক্বিয়াদ)………………………………………….৮

৫ম শর্তঃ الصدق (আস সিদ্ক্ব)……………………………………………………………………….৯

৬ষ্ঠ শর্তঃ الإخلاص (আল ইখলাস)……………………………………………………………………..৯

৭ম শর্তঃ المحبه (আল মুহাব্বাহ)………………………………………………………………….১০

কালিমাতুত তাওহীদের অর্থ ও রোকনসমূহ………………………………….১০

কালিমাতুত তাওহীদের প্রথম রোকন ‘কুফুর বিত ত্বাগুত’ ………………… ১১

ত্বাগুতের প্রকারভেদ……………………………………………………… ১২

كفر بالطاغوت  ত্বাগুতকে অস্বীকার করার পদ্ধতি ………………………………………………….. ১৩

১. তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ ………………………………………………………………………….. ১৫

২. তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ…………………………………………………. ১৬

৩. তাওহীদুল আসমা’ ওয়াস সিফাত……………………………………….১৭

কালীমাতুত তাওহীদের বিশ্বাসগত নাওয়াকিয…………………………….. ১৯

কালিমাতুত তাওহীদের উক্তিগত নাওয়াকিয……………………………….২৩

কালিমাতুত তাওহীদের কর্মগত নাওয়াকিয …………………………………২৬

 

ভূমিকা

بِسِم الله الرحمن الرحيم

الحمد لله رب العالمين والصالة السلام علي رسول الله محمد و علي آله و سلم تسليما كثيرا

একত্ত্ববাদের বাণী (لا اله الا الله) লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু হলো কালিমাতুত তাওহীদ, কালিমাতুল ইখলাস, এটাই হলো কালিমাতুত ত্বাকওয়া (ত্বাকওয়ার বাণী) এবং এটাই হলো জান্নাতের চাবি। এ কালিমা হলো রক্ষাকারী কালিমা (আল কালিমাতুল আসিমা)। এর মাধ্যমে জান, মাল, এবং ইজ্জত-আব্রু সংরক্ষিত হয়।

একইভাবে এই কালিমায় অস্বীকৃতি জ্ঞাপনের কারণেই অবিশ্বাসীরা তাদের রক্ত, সম্পদ ইত্যাদির নিরাপত্তা হারায়। জিহাদের মাধ্যমেই তাদের রক্ত ঝরানো হয়, সম্পদ বৈধ করে নেয়া হয় এবং তাদের ইজ্জত-আব্রু অরক্ষিত হয়।

কালিমাতুত তাওহীদের দ্বারাই তাওহীদ তথা মহান আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কিতাল ও লড়াই সংঘটিত হয়। কালিমাতুত তাওহীদের পথেই শহীদরা সম্পদ ও রক্তের বিনিময়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার নৈকট্য লাভ করে যাচ্ছেন। আলাহ তা‘আলা রাসূলগণকে এই কালিমা দিয়েই প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

وَمَآ أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِىٓ إِلَيْهِ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱعْبُدُونِ

অর্থ: আপনার পূর্বে আমি যে সকল রাসূলকে প্রেরণ করেছি তাদের সকলকে এই ওহী দিয়েই পাঠিয়েছি যে, “আমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। সুতরাং তোমরা আমার ইবাদত করো।” (সূরা আম্বিয়া, আয়াত ২৫)

ফলে মুমিনরা ইবাদত ও অনুগত্যের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তার মর্যাদার গৃহের দিকে অগ্রসর হয়। আর কাফিররা নাপাকি ও আল্লাহর ক্রোধে পতিত হয়। তাদের ঠিকানা নিকৃষ্ট জাহান্নাম। মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّهُمْ كَانُوٓا۟ إِذَا قِيلَ لَهُمْ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّهُ يَسْتَكْبِرُونَ

অর্থ: যখন তাদেরকে বলা হয়, “আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেইতখন তারা অহংকার করে।” (সূরা সাফফাত, আয়াত ৩৫)

এই মহান কালিমার কিছু শর্ত রয়েছে যেগুলো ব্যতীত শাহাদাতাইন কবুল করা হয়না, রয়েছে কিছু রোকন যেগুলো ব্যতীত তা সাব্যস্ত হয় না এবং রয়েছে কিছু নাওয়াকেয (ভঙ্গকারী বিষয়াদি) যেগুলো পরিত্যাগ করা ব্যতীত ঈমান শুদ্ধ হয় না। এই পুস্তিকায় ক্ষেত্রবিশেষে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণসহ সংক্ষেপে অধিকাংশ বিধান উল্লেখ করা হয়েছে।

আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা, যেন তিনি এর মাধ্যমে লেখক ও পাঠক উভয়কে উপকৃত করেন। এও প্রত্যাশা করছি যেন তিনি আমাদের ইসলামের ওপর জীবিত রাখেন, ঈমানের ওপর মৃত্যু দান করেন এবং দোজাহানে আমাদের সম্মানিত করেন। আমীন।

 শাইখ হারিস ইবনে গাযী আন নাযযারী

 জাযিরাতুল আরব, ১৪৩২ হিজরী।

কালিমাতুত তাওহীদের ফজীলত

কুরআন সুন্নাহ্য় কালিমাতুত তাওহীদ (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ) এর অনেক ফজীলত বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে কিছু উল্লেখ করা হলো, কালিমাতুত তাওহীদ হলো ‘আল কালিমাতুত ত্বায়্যিবাহ’ (পবিত্র বাণী) আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

أَلَمْ تَرَ كَيْفَ ضَرَبَ ٱللَّهُ مَثَلًا كَلِمَةً طَيِّبَةً كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ أَصْلُهَا ثَابِتٌ وَفَرْعُهَا فِى ٱلسَّمَآءِ * تُؤْتِىٓ أُكُلَهَا كُلَّ حِينٍۭ بِإِذْنِ رَبِّهَاۗ وَيَضْرِبُ ٱللَّهُ ٱلْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ

অর্থ: তুমি কি দেখনি, আল্লাহ তাআলা কিভাবে কালিমাতুত ত্বায়্যিবাহ অর্থাৎ সৎ বাণী (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) কে একটি পবিত্র গাছের সাথে তুলনা করেছেন; যার মূল সুদৃঢ় এবং যার শাখা প্রশাখা আসমানে বিস্তৃত। সর্বদা যা তার রবের আদেশে ফল দান করে। আর আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত পেশ করেন যেনো তারা উপদেশ গ্রহণ করে।” (সূরা ইব্রাহিম, আয়াত ২৪-২৫)

ইবনে রজব হাম্বলী রহ. উপরোক্ত এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন,

المراد بالكلمة كلمة التوحيد.

অর্থ: “এখানে কালিমা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কালিমাতুত তাওহীদ।” (জামিউল উলূমি ওয়াল হিকাম, ১ম খন্ড, ১৫১ পৃষ্ঠা।)

কালিমাতুত তাওহীদ হলো আল ক্বাওলুছ্ ছাবিত’ (শাশ্বত বাণী)

মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

يُثَبِّتُ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ بِٱلْقَوْلِ ٱلثَّابِتِ فِى ٱلْحَيَوٰةِ ٱلدُّنْيَا وَفِى ٱلْءَاخِرَةِۖ وَيُضِلُّ ٱللَّهُ ٱلظَّٰلِمِينَۚ وَيَفْعَلُ ٱللَّهُ مَا يَشَآءُ

অর্থ: মহান আল্লাহ মুমিনদেরকে কওলুছ্ ছাবিত’ (তথা শাশ্বত ও সুপ্রতিষ্ঠিত বাণী)র মাধ্যমে দুনিয়ার জীবনে এবং আখিরাতে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন এবং জালিমদের গোমরাহীতে রাখবেন। আর আল্লাহ তাআলা যা ইচ্ছা তাই করতে সক্ষম।” (সূরা ইব্রাহীম, আয়াত ২৭)

ইমাম বাগভী রহ. বলেন, هي قول لا اله الله অর্থাৎ ‘আল ক্বাওলুছ ছাবিত বা শাশ্বত বাণী হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।” (মাআলিমুত তানযীল, ৪, ৩৪৯)

কালিমাতুত তাওহীদ হলো দাওয়াতুল হক্ব (সত্যের আহ্বান)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

لَہٗ  دَعۡوَۃُ   الۡحَقِّ ؕ وَ الَّذِیۡنَ  یَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِہٖ لَا یَسۡتَجِیۡبُوۡنَ لَہُمۡ بِشَیۡءٍ  اِلَّا کَبَاسِطِ کَفَّیۡہِ  اِلَی الۡمَآءِ لِیَبۡلُغَ فَاہُ وَ مَا ہُوَ بِبَالِغِہٖ ؕ وَ مَا دُعَآءُ الۡکٰفِرِیۡنَ  اِلَّا  فِیۡ  ضَلٰلٍ ﴿۱۴

অর্থ: দাওয়াতুল হক বা সত্যের আহ্বান আল্লাহরই। আর যারা তাঁকে ছাড়া অন্যদের ডাকে, তারা তাদের আহ্বানে কোনোই সাড়া প্রদান করে না।(সূরা রা, আয়াত ১৪)

আল্লামা শাওকানী রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন,

قيل لمراد بدعوة الحق ها هنا كلمة التوحيد.

অর্থ: বলা হয়ে থাকে, এখানে দাওয়াতুল হক্ব দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, কালিমাতুত তাওহীদ।” (ফাতহুল ক্বাদীর, ৩য় খন্ড, ১০৪ পৃষ্ঠা।)

কালিমাতুত তাওহীদ হলো কালিমাতুত তাক্বওয়া’ (তাক্বওয়ার বাণী)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন,

إِذْ جَعَلَ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ فِى قُلُوبِهِمُ ٱلْحَمِيَّةَ حَمِيَّةَ ٱلْجَٰهِلِيَّةِ فَأَنزَلَ ٱللَّهُ سَكِينَتَهُۥ عَلَىٰ رَسُولِهِۦ وَعَلَى ٱلْمُؤْمِنِينَ وَأَلْزَمَهُمْ كَلِمَةَ ٱلتَّقْوَىٰ وَكَانُوٓا۟ أَحَقَّ بِهَا وَأَهْلَهَاۚ وَكَانَ ٱللَّهُ بِكُلِّ شَىْءٍ عَلِيمًا

অর্থ: অতঃপর আল্লাহ তাঁর রাসূলের উপর ও মুমিনদের উপর স্বীয় প্রশান্তি তথা সাকীনাহনাযিল করলেন এবং তাঁদের জন্য কালিমাতুত তাক্বওয়াবা তাকওয়ার বাণী অপরিহার্য করে দিলেন। আর তাঁরাই ছিল এর সর্বাধিক উপযুক্ত ও যোগ্য অধিকারী। আর আল্লাহ সব বিষয়ে সম্যক অবগত।” (সূরা ফাতহ, আয়াত ২৬)

আল্লামা শাওকানী রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন,

وىي ال إلو إهلل ك ا قال ال مهور.

অর্থ: “কালিমাতুত তাওহীদ হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।”  (ফাতহুল কাদীর ৫ম খন্ড, ৭৮ পৃষ্ঠা।)

কালিমাতুত তাওহীদের কারণেই গুণাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়

عن عبادة رضي الله عنه، عن النبي صلى الله عليه وسلم ، قال: « من شهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له ، وأن محمدا عبده ورسوله ، وأن عيسى عبد الله ورسوله ، وكلمته ألقاها إلى مريم وروح منه ، والجنة حق ، والنار حق ، أدخله الله الجنة على ما كان من العمل» ( وفي رواية من أبواب الجنة الثمانية أيها شاء .

অর্থ: হযরত উবাদাহ ইবনে সামিত রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দিবে যে আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, তাঁর কোন শরীক নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল, আর ঈসা (আলাইহিস সালাম) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল এবং তাঁর কালিমা যা তিনি মারয়াম (আলাইহিস সালাম) কে দান করেছেন এবং তাঁর রুহ। জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন -তাঁর আমল যাই হোক না কেন। অপর রেওয়াতে রয়েছে- জান্নাতের আটটি দরজার যে দরজা দিয়ে সে প্রবেশ করতে ইচ্ছে করুক না কেন।” (বুখারী ৩১৮০)

কালিমাতুত তাওহীদ রক্তের হেফাজতকারী

أن أبا هريرة رضي الله عنه ، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: “أمرت أن أقاتل الناس حتى يقولوا: لا إله إلا الله ، فمن قال: لا إله إلا الله ، فقد عصم مني نفسه وماله ، إلا بحقه وحسابه على الله .

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমাকে আদেশ করা হয়েছে লোকদের সাথে যুদ্ধ করতে, যতক্ষণ না তারা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ স্বীকার করে নেয়। সুতরাং যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহস্বীকার করে নিলো, সে তাঁর নিজের জান ও মালকে হিফাজত করে নিলো -তবে ন্যায়সঙ্গত কারণের কথা ভিন্ন। আর তাঁর হিসাব আল্লাহর দায়িত্বে।(সহীহ বুখারী শরীফ, হাদীস নং ৩৭২৭, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩২)

কালিমাতুত তাওহীদ হলো জান্নাতের চাবী

عن عثمان ، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «من مات وهو يعلم أنه لا إله إلا الله ، دخل الجنة»

অর্থ: উসমান ইবনে আফফান রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি এ কথা জানা অবস্থায় মারা গেলো যে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৮)

عن معاذ بن جبل ، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «من كان آخر كلامه لا إله إلا الله دخل الجنة.

অর্থ: মুয়ায ইবনে জাবাল রাযি. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যার সর্বশেষ বাণী হবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহসে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (আবূদাউদ, হাদীস নং ২৭০৯। মুস্তাদরাক লিল হাকিম ১ম খন্ড, ৫০৩ পৃষ্ঠা। তিনি হাদীসটিকে সহীহবলেছেন। ইমাম যাহাবী এটাকে সমর্থন করেছেন)

 

কালিমাতুত তাওহীদ হলো চিরস্থায়ী জাহান্নাম থেকে নিরাপত্তা দান কর

عن أنس بن مالك ، قال : كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يغير إذا طلع الفجر ، وكان يستمع الأذان ، فإن سمع أذانا أمسك وإلا أغار فسمع رجلا يقول : الله أكبر الله أكبر ، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : « على الفطرة » ثم قال : أشهد أن لا إله إلا الله أشهد أن لا إله إلا الله ، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : « خرجت من النار ، فنظروا فإذا هو راعي مغزی.

আনাস ইবনে মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা সুবহে সাদিকের সময় জিহাদের অভিযান পরিচালনা করতেন। তিনি আযান শ্রবণ করতেন। আযান শুনলে তিনি আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকতেন। নতুবা আক্রমণ করতেন। একবার তিনি এক ব্যক্তিকে আযান দিতে শুনলেন আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবারতখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে ফিতরত অর্থাৎ দ্বীনের ওপর রয়েছে। অতঃপর সে বললো, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তখন রাসূলুল্লাহ

সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি জাহান্নাম থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত হয়ে গেলে। অতঃপর সাহাবায়ে কিরাম রাযি. তাঁর দিকে তাকালে তারা বুঝতে পারলেন যে সে (ميجا) মিযা এলাকার রাখাল।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৭৫)

عن أبي إسحاق ، عن الأغر أبي مسلم ، أنه شهد على أبي هريرة ، وأبي سعيد ، أنهما شهدا على رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : ” إذا قال العيد : لا إله إلا الله ، والله أكبر ، قال يقول الله عز وجل : صدق عبدي ، لا إله إلا أنا وأنا أكير ، وإذا قال العبد : لا إله إلا الله وحده ، قال : صدق عبدي ، لا إله إلا أنا وخدي ، وإذا قال : لا إله إلا الله لا شريك له ، قال : صدق عبدي ، لا إله إلا أنا ولا شريك لي ، وإذا قال : لا إله إلا الله . له الملك وله الحمد ، قال : صدق عبدي ، لا إله إلا أنا، لي الملك .. ولي الحمد ، وإذا قال : لا إله إلا الله ، ولا حول ولا قوة إلا بالله ، قال : صدق عبدي لا إله إلا أنا ، ولا حول ولا قوة إلا بي ” قال أبو إسحاق : ثم قال الأعر شيئا لم أفهمه ، قال : فقلت لأبي جعفر : ما قال ؟ فقال : « من رزقهن عند موته لم تمسه النار»

অর্থ: আবু ইসহাক আগার ইবনে আবু মুসলিম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি আবূ হুরায়রা রাযি. এবং আবু সাঈদ খুদরী রাযি. এর পক্ষ থেকে এবং তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে সাক্ষ্য প্রদান করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বান্দা যখন বলে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবর অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং আল্লাহ সবচেয়ে বড়। তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, আমার বান্দা সত্য বলেছে। আমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, আমিই একমাত্র ইলাহ। আর বান্দা যখন বলে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু লা শারিকা লাহু অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তাঁর কোন শরীক নেই। তখন আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা সত্য বলেছে, আমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই আমার কোন শরীক নেই। এরপর বান্দা যখন বলে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, রাজত্ব (সার্বভৌমত্ব) এবং প্রশংসা কেবল তাঁরই তখন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আমার বান্দা সত্য বলেছে, আমি ছাড়া কোন মাবুদ নেই রাজত্ব (সার্বভৌমত্ব) এবং প্রশংসা আমারই। বান্দা যখন বলে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, গুণাহ থেকে বিরত থাকা এবং নেক কাজ করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আমার বান্দা সত্য বলেছে আমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। গুণাহ থেকে বিরত থাকা এবং নেক কাজ করার ক্ষমতা আমার পক্ষ থেকেই আসে। আবু ইসহাক বলেন, “এরপর আগার এমন কিছু বললেন, যা আমি বুঝতে পারিনি। আমি আবু জাফরকে জিজ্ঞাস করলাম তিনি কি বললেন? আবু জাফর বললেন মৃত্যুর সময় যাকে এগুলো দান করা হবে তাঁকে জাহান্নামের আগুণ স্পর্শ করবে না।” (তিরমিযি, হাদীস নং ৩৩৫২। ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩৭৮৪। ইবনে হিব্বান, হাদীস নং ৮৫১। আস সিলসিলতুস সহীহা ৩য় খন্ড, ৩৭৯ পৃষ্ঠা।)

কালিমাতুত তাওহীদ সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমল

عن أبي ذر ، قال : قلت : يا شول الله ، أوصني . قال : ” إذا عملت شيئه فأتبعها حسنة تمحها ” . قال : قلت : يا رسول الله ، أمن الحسنات لا إله إلا الله ؟ قال : ” هي أ فضل الحسنات

অর্থ: আবুযর গিফারী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে উপদেশ দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যখনই তুমি কোনো বদ আমল করবে, তখনি একটি নেক আমল করো। তাহলে তা তোমার বদ আমলকে মুছে দিবে।

আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল! সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ কি নেক আমলের অন্তর্ভুক্ত?”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমল। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২১৪৮৭) শুয়াইব আরনাঊত বলেন। “হাদীসটি হাসান।

কোন আমলই কালিমাতুত তাওহীদের সমতুল্য নয়

عن عبد الله بن عمرو بن العاص ، يقول : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ” إن الله سيخلص رجلا من أمتي على رءوس الخلائق يوم القيامة فينشر عليه تسعة وتسعين سجلا كل سجل مثل مد البصر ، ثم يقول : أتنكر من هذا شيئا ؟ أظلمك كتبتي الحافظون ؟ فيقول : لا يا رب ، فيقول : أفلك عذر ؟ فيقول : لا يا رب ، فيقول : بلى إن لك عندنا خسته ، فإنه لا ظلم عليك اليوم ، فتخرج بطاقة فيها : أشهد أن لا إله إلا الله وأشهد أن محمدا عبده ورسوله ، فيقول : اخضر وزنك ، فيقول : يا رب ما هذه البطاقة مع هذه السجلات ،

অর্থ: আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রাযি. বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন সৃষ্টি জগতের সামনে ৯৯ টি (গুণাহ ভর্তি) দফতর পেশ করবেন। প্রতিটি দফতর দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে। এরপর বলবেন, তুমি কি এসবের কোনটাকে অস্বীকার কর? আমার নিয়োজিত লেখক ফেরেশতাগণ কি তোমার প্রতি জুলুম করেছে? তখন সেই ব্যক্তি বলবে, না হে আমার রব!

আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তোমার কি কোন ওযর আছে? সে বলবে, না হে আমার রব! তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, “অবশ্যই আমার কাছে তোমার একটি নেক আমল রয়েছে। আর নিশ্চয়ই আজ তোমার প্রতি জুলুম করা হবে না। এরপর একটি ছোট্ট কাগজ বের করা হবে যাতে লেখা থাকবে “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, “আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। আমি এও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।”

এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তোমার এ আমলের ওযন দেখো। তখন সে বলবে, হে আমার রব! এতসব দফতরের সামনে এই সামান্য কাগজ কিইবা কাজে আসবে?! এরপর তাকে বলা হবে “তোমার প্রতি জুলুম করা হবে না” অতঃপর দফতরগুলো এক পাল্লায় রাখা হবে এবং কাগজটি এক পাল্লায় রাখা হবে, ফলে দফতরগুলোর পাল্লা হালকা হয়ে যাবে এবং কাগজের পাল্লাটি ভারী হয়ে যাবে। আল্লাহর নামের সমতুল্য কোন কিছুই হতে পারে না।” (মুসনাদে আহমদ ৬৬৯৯, তিরমিযী ২৫৬৩, ইবনে মাজাহ ৪২৯০, মুস্তাদরাক লিল হাকিম, হাকিম রহ. হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন। ইমাম যাহাবী রহ. তাঁর মতের সমর্থন করেছেন)

عن عبد الله بن عمرو ، قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ، إن نبي الله نوحا صلى الله عليه وسلم لم حضرته الوفاة قال لابنه : إلي قاص عليك الوصية : آمرك باثنتين ، وأنهاك عن اثنتين ، أمرك بلا إله إلا الله ، فإن السموات السبع ، والأرضين السبع ، لو وضعت في كفة ، ووضعت لا إله إلا الله في كفة ، رجحت بهن لا إله إلا الله ، ولو أن السموات السبع والأرضين السبع ، کن حلقة مبهمة ، قصتمه لا إله إلا الله ،

অর্থ: আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযি. বলেন, যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর নবী নূহ (আলাইহিস সালাম) যখন মৃত্যু মুখে উপনীত হলেন তখন তাঁর ছেলেকে লক্ষ্য করে বললেন, আমি তোমাকে উপদেশ দিয়ে যাচ্ছি, আমি তোমাকে দুটি কাজের আদেশ দিচ্ছি এবং দুটি কাজ থেকে নিষেধ করছি। আমি তোমাকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর আদেশ করছি। কেননা যদি সাত আসমান ও সাত জমিন এক পাল্লায় রাখা হয় এবং লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এক পাল্লায় রাখা হয় তাহলে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর পাল্লাই বেশি ভারী হবে। আর যদি সাত আসমান ও সাত জমিন সুদৃঢ় আংটার ন্যায়ও হয়ে যেতো তাহলে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এগুলোকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতো। (আহমদ, হাদীস নং ৬৫৮৩। হাদিসটি সহীহ )

কালিমাতুত তাওহীদ সর্বশ্রেষ্ঠ যিকির

عن جابر بن عبد الله ، يقول : سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : « أفضل الذكر لا إله إلا الله ، وأفضل الدعاء الحمد لله »

অর্থ: জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, “সর্বশ্রেষ্ঠ যিকির ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ দু’আ“আলহামদুলিল্লাহ”। (তিরমিযি, হাদীস নং ৩৩০৫। ইবনে মাজা, হাদীস নং ৩৭৯১, ইবনে হিব্বান, হাদীস নং ৭৪৬)

কালিমাতুত তাওহীদের শর্তসমূহ

কালিমাতুত তাওহীদ সাব্যস্ত হওয়ার জন্য কিছু শর্ত অপরিহার্য।

এই শর্তগুলো আবার দুই প্রকার-

১. পার্থিব জীবনের নিরাপত্তাজনিত শর্তসমূহ।

২. পরকালে চিরস্থায়ী জাহান্নাম থেকে মুক্তির শর্তসমূহ।

প্রথম প্রকারঃ পার্থিব জীবনে নিরাপত্তার জন্য মাত্র দুটি শর্ত

প্রথম শর্ত: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ জবানে উচ্চারণ করা এবং এর স্বীকৃতি প্রদান করা। তবে অক্ষম যেমন বোবা ব্যক্তির জন্য নয়।

عن ابن عمر ، أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : « أمر أن أقاتل الناس حتى يشهدوا أن لا إله إلا الله ، وأن محمدا رسول الله ، ويقيموا الصلاة ، ويؤتوا الزكاة ، فإذا فعلوا ذلك عصموا مني دماءهم وأموالهم إلا بحق الإسلام ، وحسابهم على الله »

অর্থ: হযরত ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাকে আদেশ করা হয়েছে আমি যেন লোকদের বিরুদ্ধে ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ করি যতক্ষণ না তারা এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল এবং নামায কায়েম করে ও যাকাত আদায় করে। সুতরাং যখন তারা এগুলো পালন করবে তারা আমার থেকে তাদের জানমাল হেফাজত করে নিবে, তবে ন্যায় সঙ্গতভাবে। আর তাদের হিসাব আল্লাহর কাছে।” (বুখারী)

ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রহ. বলেছেন “যে ব্যক্তি শাহাদাতাইন পাঠ করবে না, সে মুসলমানদের সর্বসম্মতিক্রমে কাফির। সে উম্মাহর সালাফে সালেহীন, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন এবং অধিকাংশ আলেমের মতে বাহ্যিক এবং আভ্যন্তরীণভাবে কাফের।” (মাজমুউল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া ৭৮৭/৬০৯)

একমাত্র নামাজই শাহাদাতাইনের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে

ইমাম কুরতুবী রহ. বলেছেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ “ব্যতীত অন্য কোন কথা ও কাজের দ্বারা ঈমান সাব্যস্ত হয় না। তবে একমাত্র নামাজের ব্যাপারটি ভিন্ন (অর্থাৎ এর দ্বারা একজন ব্যক্তি মুমিন সাব্যস্ত হয় -অনুবাদক)।

ইসহাক ইবনে রাহুইয়া[1] বা রাহওয়াইহ রহ. বলেন, নামাজের ক্ষেত্রে উলামায়ে কিরাম এমন বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন যা অন্য কোন বিধানের ক্ষেত্রে করেন নি।

কেননা তারা সকলেই বলেছেন, যে ব্যক্তির কুফরী প্রসিদ্ধ, অতঃপর মুসলামানরা তাকে সময়মত সালাত আদায় করতে দেখলো, এমনকি সে অনেক নামাজ আদায় করলো অথচ তারা জানেনা যে, সে জবানে স্বীকৃতি দিয়েছে কি না, তাহলে তাঁর ব্যাপারে মুমিন হওয়ার ফয়সালা দেয়া হবে। কিন্তু রোজা, যাকাত ইত্যাদির ক্ষেত্রে তারা এমনটি ফায়সালা দেন নি।

দ্বিতীয় শর্তঃ নাওয়াকিযুত তাওহীদ অর্থাৎ তাওহীদ বিনষ্টকারী কোন কিছু না থাকা। যে ব্যক্তি কালিমাতুত তাওহীদ স্বীকার করে নিবে এরপর ঈমান ভঙ্গকারী কোন কাজ করবে তাঁর আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং ঈমান থেকে খারিজ হয়ে যাবে। আর সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

مَن كَفَرَ بِٱللَّهِ مِنۢ بَعْدِ إِيمَٰنِهِۦٓ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُۥ مُطْمَئِنٌّۢ بِٱلْإِيمَٰنِ وَلَٰكِن مَّن شَرَحَ بِٱلْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِّنَ ٱللَّهِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ . ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمُ ٱسْتَحَبُّوا۟ ٱلْحَيَوٰةَ ٱلدُّنْيَا عَلَى ٱلْءَاخِرَةِ وَأَنَّ ٱللَّهَ لَا يَهْدِى ٱلْقَوْمَ ٱلْكَٰفِرِينَ . أُو۟لَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ طَبَعَ ٱللَّهُ عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ وَسَمْعِهِمْ وَأَبْصَٰرِهِمْۖ وَأُو۟لَٰٓئِكَ هُمُ ٱلْغَٰفِلُونَ . لَا جَرَمَ أَنَّهُمْ فِى ٱلْءَاخِرَةِ هُمُ ٱلْخَٰسِرُونَ

অর্থ: কেউ ঈমান আনার পর আল্লাহর সাথে কুফুরী করলে এবং কুফুরীর জন্য হৃদয় উন্মুক্ত রাখলে তাঁর ওপর আপতিত হবে আল্লাহর ক্রোধ এবং তাঁর জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। তবে এটা তাঁর জন্য নয় যাকে কুফুরীর জন্য বাধ্য করা হয় কিন্তু তাঁর চিত্ত ঈমানে অবিচলিত থাকে। এটা এজন্য যে তারা (কাফিররা) দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের ওপর প্রাধান্য দেয়। আর আল্লাহ তাআলা কাফেরদেরকে হেদায়েত দেন না। তারা তো ঐ সমস্ত লোক আল্লাহ তাআলা যাদের অন্তর, কর্ণ ও চক্ষুতে মোহর মেরে দিয়েছেন। আর এরাই তো গাফেল। নিশ্চয়ই এরা আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” (সূরা নাহল, আয়াত ১০৬-১০৯)

দ্বিতীয় প্রকারঃ আখিরাতে জাহান্নামের চিরস্থায়ী আযাব থেকে বাঁচার জন্য শর্তসমূহ

এক্ষেত্রে অনেকগুলো শর্ত রয়েছে। সংক্ষেপে ও বিশ্লেষণগতভাবে এর সংখ্যার ক্ষেত্রে মতভেদ রয়েছে, কোনো কোনো আলেম বলেন, ৭ টি শর্ত আর কেউ কেউ এর চেয়ে বেশি বলেন। মোটামুটিভাবে শর্তগুলো নিম্নরূপঃ-

১ম শর্তঃ العلم (আল ইল্ম)

অর্থাৎ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর অর্থ জানা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন

فَٱعْلَمْ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّهُ

অর্থ: জেনে রাখো! যে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই।(সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত ১৯)

عن عثمان ، قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : « من مات وهو يعلم أنه لا إله إلا الله ، دخل الجنة »

অর্থ: হযরত উসমান রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি এ কথা জানা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে যে “আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত কোন ইলাহ নেই সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (মুসলিম, ১ম খন্ড, ৫৫ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ২৬)

২য় শর্তঃ اليقين (আল ইয়াক্বীন)

অর্থাৎ শাহাদাতাইনের “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর স্বীকৃতীদানকারী এর ভাব ও মর্মের প্রতি সুনিশ্চিত বিশ্বাস রাখবে। যদি এর ভাব ও মর্মের প্রতি সামান্যতম সন্দেহ পোষণ করে তবে কোনো লাভ হবে না ।

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

إِنَّمَا ٱلْمُؤْمِنُونَ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا۟ وَجَٰهَدُوا۟ بِأَمْوَٰلِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِۚ أُو۟لَٰٓئِكَ هُمُ ٱلصَّٰدِقُونَ

অর্থ: প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ মুমিন তো কেবল তারাই, যাঁরা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে এবং তারপর তাঁদের অন্তর এতে আর কোনো সন্দেহ প্রকাশ করে নি।” (সূরা হুজুরাত, আয়াত ১৫)

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসের মাঝে ইরশাদ হয়েছে

عن أبي هريرة ، قال : كنا مع النبي صلى الله عليه وسلم في مسير ، قال : فنفدت أزواد القوم ، قال : حتى هم بنحر بعض حمائلهم ، قال : فقال عمر : يا رسول الله ، لو جمعت ما بقي من أزواد القوم ، فدعوت الله علها . قال : ففعل ، قال : فجاء ذو البره ببره ، وذو التمر بتمره ، قال : وقال مجاهد : وذو النواة بنواة ، قلت : وما كانوا يصنعون بالوى ؟ قال : كانوا يمصونه ويشربون عليه الماء ، قال : فدعا علها قال حتى القوم أزودتهم ، قال : فقال عند ذلك : « أشهد أن لا إله إلا الله ، وأني رسول الله ، لا يلقى الله بهما عبد غير شا فيهما ، إلا دخل الجنة «

অর্থ: হযরত আবু হুরাইরা রাযি. বলেন, “আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে এক সফরে ছিলাম। পথিমধ্যে লোকজনের পাথেয় শেষ হয়ে গেলো, এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কিছু উট জবাই করতে চাইলেন। তখন উমর রাযি. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ‘আপনি যদি লোকদের অবশিষ্ট পাথেয় একত্রিত করতে বলতেন এবং আল্লাহর কাছে দুয়া করতেন! অতঃপর এমনটিই হলো। যার কাছে গম ছিল সে গম নিয়ে আসলো, যার কাছে খেজুর ছিল সে খেজুর নিয়ে আসলো, এমনকি যার কাছে খেজুরের বিচি ছিল সে বিচি নিয়ে আসলো। আবু সালেহ বলেন, আমি আবু হুরাইরাকে জিজ্ঞেস করলাম, বিচি দিয়ে তারা কি করেছিল? আবু হুরাইরা রাযি. বললেন, প্রথমে সেগুলো তারা চুষতেন অতঃপর পানি পান করতেন তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুয়া করলেন। ফলে লোকেরা পাথেয় ভরে নিলো। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বূদ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল” যে ব্যক্তি কোন সংশয় ছাড়া এই কালিমা নিয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (মুসলিম ১ম খন্ড ৫৫ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ২৭)

তৃতীয় শর্তঃ القبول (আল কবুল)

অর্থাৎ এই কালিমার মর্ম তথা এক আল্লাহর ইবাদতকে কবুল করা এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত বর্জন করা। সুতরাং যে এই কালিমা পাঠ করবে কিন্তু এক আল্লাহর ইবাদতকে কবুল করবে না, সে ঐ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

إِنَّهُمْ كَانُوٓا۟ إِذَا قِيلَ لَهُمْ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّهُ يَسْتَكْبِرُونَ . وَيَقُولُونَ أَئِنَّا لَتَارِكُوٓا۟ ءَالِهَتِنَا لِشَاعِرٍ مَّجْنُونٍۭ

অর্থ: যখন তাদেরকে বলা হতো লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহআল্লাহ ছাড়া কোন মাবূদ নেই, তখন তারা অহংকার করতো আর বলত আমরা কি তাহলে এক পাগল কবির কথায় আমাদের উপাস্যদের পরিত্যাগ করবো?” (সূরা সাফফাত, আয়াত ৩৫-৩৬)

৪র্থ শর্তঃ اإلنقياد (আল ইনক্বিয়াদ)

অর্থাৎ কালিমাতুত তাওহীদের সামনে আত্মসমর্পণ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন

وَمَن يُسْلِمْ وَجْهَهُۥٓ إِلَى ٱللَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَقَدِ ٱسْتَمْسَكَ بِٱلْعُرْوَةِ ٱلْوُثْقَىٰۗ وَإِلَى ٱللَّهِ عَٰقِبَةُ ٱلْأُمُورِ

অর্থ: “যে ব্যক্তি সৎকর্মপরায়ণ হয়ে স্বীয় মুখমন্ডলকে আল্লাহ অভিমূখী করে, সে এক মজবুত হাতল ধারণ করে, সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর দিকে।” (সূরা লুকমান: ২২)

কবুল ও আত্মসমর্পণের মাঝে পার্থক্য এই যে, কবুল হলো অন্তরের কর্ম এবং আত্মসমর্পণ হলো অঙ্গ-প্রতঙ্গের কর্ম। প্রথমটি হলো অভ্যন্তরীন ব্যাপার আর দ্বিতীয়টি হলো বাহ্যিক।

৫ম শর্তঃ الصدق (আস সিদ্ক্ব)

অর্থাৎ সত্যবাদিতা। আর সত্যবাদিতা হলো, সত্য মন নিয়ে এ কালিমার স্বীকৃতি প্রদান করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

إِذَا جَآءَكَ ٱلْمُنَٰفِقُونَ قَالُوا۟ نَشْهَدُ إِنَّكَ لَرَسُولُ ٱللَّهِۗ وَٱللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّكَ لَرَسُولُهُۥ وَٱللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّ ٱلْمُنَٰفِقِينَ لَكَٰذِبُونَ

অর্থ: যখন মুনাফিকরা আপনার নিকট আসে তখন তারা বলে আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তো জানেনই যে আপনি তাঁর রাসূল। তবে আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, অবশ্যই মুনাফিকরা মিথ্যাবাদী।

(সূরা মুনাফিকুন, আয়াত ১)

عن أنس بن مالك أن النبي صلى الله عليه وسلم ، ومعاد رديفه على الرحل ، قال : « يا معاذ بن جبل » ، قال : لبيك يا رسول الله وسعديك ، قال : « يا معاذ » ، قال : لبيك يا رسول الله وسعديك ثلاثا ، قال : « ما من أحد يشهد أن لا إله إلا الله وأن محمدا رسول الله ، صدقا من قلبه ، إلا حرمه الله على النار » ، قال يا رسول الله : أفلا أخبر به الناس فيستبشروا ؟ قال : « إذا يتكلوا » وأخبر بها معاذ عند موته تأثما

অর্থ: “হযরত আনাস ইবনে মালিক রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো এক সফরে ছিলেন এবং হযরত মুয়ায রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পিছনে বসা ছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে মুয়ায! মুয়ায রাযি. বললেন, লাব্বাইক হে আল্লাহর রাসূল! সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে মুয়ায! মুয়ায রাযি. বললেন, লাব্বাইক হে আল্লাহর রাসূল! সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুণরায় বললেন হে মুয়ায! মুয়ায রাযি. বললেন, লাব্বাইক হে আল্লাহর রাসূল! সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, যে ব্যক্তি সত্য দিলে একথার সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ তাঁর জন্য জাহান্নামকে হারাম করে দিবেন। মুয়ায রাযি. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি একথা লোকদের জানিয়ে দিব না? তাহলে তারা সুসংবাদ প্রাপ্ত হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না। কেননা আমি আশংকা করি যে লোকেরা হয়তো এ কারণে আমল ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে অলস হয়ে বসে থাকবে। এরপর হযরত মুয়ায রাযি. মৃত্যুর সময় গুণাহের ভয়ে হাদিসটি বর্ণনা করেন।” (বুখারী ১ম খন্ড, ৫৯পৃষ্ঠা, হাদীস নং ১২৮)

৬ষ্ঠ শর্তঃ اإلخالص (আল ইখলাস)

ইখলাস হলো শিরকের যাবতীয় দাগ থেকে আমলকে পরিশুদ্ধ করা। আর তা এভাবে হবে যে এর স্বীকৃতি দানের মাধ্যমে বান্দা দুনিয়ার কোন উদ্দেশ্য পূরণের ইচ্ছা পোষণ করবে না।

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন

ثُمَّ خَلَقْنَا ٱلنُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا ٱلْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا ٱلْمُضْغَةَ عِظَٰمًا فَكَسَوْنَا ٱلْعِظَٰمَ لَحْمًا ثُمَّ أَنشَأْنَٰهُ خَلْقًا ءَاخَرَۚ فَتَبَارَكَ ٱللَّهُ أَحْسَنُ ٱلْخَٰلِقِينَ

অর্থ: আল্লাহকে ডাকো -তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে। যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে।” (সূরা মুমিন, আয়াত ১৪)

عن عتبان بن مالك أن رسول الله صلى الله عليه و سلم قال إن الله حرم على النار من قال : لا إله إلا الله ، يبتغي بذلك وجه الله

অর্থ: ইতবান ইবনে মালিক রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা ঐ ব্যক্তির ওপর জাহান্নামকে হারাম করে দিয়েছেন যে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” স্বীকার করে নিয়েছে।” (বুখারি ১/১৬৪ হাদীস নং ৪১৫, মুসলিম ১/৪৫৫ হাদীস নং ৩৩)

৭ম শর্তঃ المحبه (আল মুহাব্বাহ)

এই কালিমা এর মর্ম এবং এ কালিমা অবলম্বনকারীদের প্রতি মহব্বত পোষণ করা। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন

وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ ٱللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ ٱللَّهِۖ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ أَشَدُّ حُبًّا لِّلَّهِۗ وَلَوْ يَرَى ٱلَّذِينَ ظَلَمُوٓا۟ إِذْ يَرَوْنَ ٱلْعَذَابَ أَنَّ ٱلْقُوَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا وَأَنَّ ٱللَّهَ شَدِيدُ ٱلْعَذَابِ

অর্থ: লোকদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও আছে যারা আল্লাহকে ছাড়া অপর কাউকে মহান আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে নিয়েছে এবং তাদেরকে আল্লাহর ন্যায় ভালোবাসে। আর মুমিনরা তো আল্লাহকে সবচাইতে বেশি ভালোবাসে।

(সূরা বাক্বারা, আয়াত ১৬৫)

عن أنس بن مالك رضي الله عنه ، عن النبي صلى الله عليه وسلم قال : ” ثلاث من كن فيه وجد حلاوة الإيمان : أن يكون الله ورسوله أحب إليه مما سواهما ، وأن يحب المرء لا يحبه إلا الله ، وأن يكره أن يعود في الكفر كما يكره أن يقذف في النار .

অর্থ: আনাস রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনটি গুণ এমন রয়েছে যে, কোনো ব্যক্তির মাঝে যদি সেই গুণ গুলো বিদ্যমান থাকে তাহলে অবশ্যই সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করবে। (আর সেই তিনটি গুণ হলো এই-) তাঁর নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ সব কিছুর চেয়ে প্রিয় হওয়া, কাউকে ভালোবাসলে আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা এবং সে কুফরীতে ফিরে যাওয়াকে এমন কঠিনভাবে অপছন্দ ও ঘৃণা করবে যেমনটি অপছন্দ করে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে।” (বুখারী ১ম খন্ড, ১৩ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ১৬। মুসলিম ১ম খন্ড, ৬৬ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ৪৩)

কালিমাতুত তাওহীদের অর্থ ও রোকনসমূহ

لا إله إلا الله

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর অর্থ: لا معبود بحق الا الله অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন প্রকৃত মা’বুদ নেই।   محمد رسول الله “মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” এর সাক্ষ্য দেওয়ার অর্থ হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রিসালাত স্বীকার করে নেওয়া, তাঁর আদিষ্ট বিষয়ে তাঁর আনুগত্য করা, তাঁর প্রদানকৃত সংবাদ সত্যায়ন করা, তাঁর নিষিদ্ধ বিষয় থেকে দূরে থাকা এবং তাঁর নির্দেশিত পন্থায়ই আল্লাহর  ইবাদত করা।

কালিমাতুত তাওহীদের রোকন দুটি

১. نفي না বাচক বা বর্জন অর্থাৎ لا اله কোন ইলাহ নেই।

২. إثبات হ্যাঁ বাচক বা গ্রহণ الا الله একমাত্র আল্লাহ ছাড়া।

আর এটাই হলো  كفر بالطاغوت (ত্বাগুতকে অস্বীকার করা) এবং ايمان بالله  (আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা) আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন

لَآ إِكْرَاهَ فِى ٱلدِّينِۖ قَد تَّبَيَّنَ ٱلرُّشْدُ مِنَ ٱلْغَىِّۚ فَمَن يَكْفُرْ بِٱلطَّٰغُوتِ وَيُؤْمِنۢ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱسْتَمْسَكَ بِٱلْعُرْوَةِ ٱلْوُثْقَىٰ لَا ٱنفِصَامَ لَهَاۗ وَٱللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ

অর্থ: দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে কোন জোর জবরদস্তি নেই। সত্য পথ ভ্রান্ত পথ হতে সুস্পষ্ট হয়েছে। সুতরাং যে ত্বাগুতকে অস্বীকার করলো এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলো সেই তো মজবুত হাতল আঁকড়ে ধরলো -যা ছিন্ন হবার নয়।” (সূরা বাকারা, আয়াত ২৫৬)

এ হিসাবে কালিমাতুত তাওহীদের রোকন দুটি

১. كفر بالطاغوت (ত্বাগুতকে অস্বীকার করা) لا اله কোন ইলাহ নেই।

২. ايمان بالله (আল্লাহর প্রতি ঈমান) الا الله একমাত্র আল্লাহ ছাড়া।

কালিমাতুত তাওহীদের প্রথম রোকন ‘কুফুর বিত ত্বাগুত’ ত্বাগুতের সংজ্ঞা

ত্বাগুতের আভিধানিক অর্থ: সীমালঙ্ঘনকারী। “নাফরমানীর ক্ষেত্রে প্রত্যেক সীমালঙ্ঘনকারীই ত্বাগুত।” (লিসানুল আরব ৭ম খন্ড, ১৫ পৃষ্ঠা।)

পারিভাষিক অর্থ:

ইমাম ইবনুল ক্বায়্যিম রহ. বলেন

, الطاغوت كل ما تجاوز به العبد حده : من معبود أو متبوع أو مطاع ، فطاغوت كل قوم : من يتحاكمون إليه غير الله ورسوله ، أو يعبدونه من دون الله ، أو يتبعونه على غير بصيرة من الله ، أو يطيعونه فيما لا يعلمون أنه طاعة لله ، فهذه طواغيت العالم إذا تأملتها وتأملت أحوال الناس معها ، رأيت أكثرهم أعرض عن عبادة الله تعالى إلى عبادة الطاغوت ، وعن طاعة رسول الله صلي الله عليه وسلم إلى طاعة الطاغوت ومتابعته

অর্থ: “যার কারণে বান্দা আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করে তারা প্রত্যেকেই ত্বাগুত। চাই সে মাবুদ হোক বা মাতবু’ (অনুসরণীয় কেউ) হোক, কিংবা মুত্বা’ (আনুগত্য করা হয় এমন) হোক। সুতরাং প্রত্যেক ক্বাওমের ত্বাগুত হলো, আল্লাহ ও রাসূল ব্যতীত জনগণ যার কাছে বিচার ও ফায়সালা কামনা করে। অথবা আল্লাহ ব্যতীত যার ইবাদত করে, অথবা আল্লাহর কাছ থেকে কোন প্রমাণ ছাড়াই যার অনুসরণ করে কিংবা আল্লাহর আনুগত্য না জেনে যার আনুগত্য করে। এরা হলো বিশ্বের ত্বাগুত গোষ্ঠি। যদি এদের ব্যাপারে এবং এদের সাথে মানুষের অবস্থা ও অবস্থান নিয়ে চিন্তা করে দেখা হয়, তাহলে দেখতে পাবেন অধিকাংশ মানুষই আল্লাহর ইবাদত থেকে ফিরে ত্বাগুতের ইবাদতে লিপ্ত, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছে বিচার ফায়সালা কামনা করার পরিবর্তে ত্বাগুতের কাছে বিচার ফায়সালা কামনা করে এবং আল্লাহর আনুগত্য ও রাসূলের অনুসরণের পরিবর্তে ত্বাগুতের আনুগত্য ও অনুসরণ করে।” (ইলামুল মুআক্কিয়ীন ১ম খন্ড, ৫০)

ত্বাগুতের প্রকারভেদ:

ত্বাগুতের অনেক প্রকার রয়েছে। আমি এখানে ৫ প্রকারের কথা উল্লেখ করছি।

১. الشيطان طاغوت শয়তান ত্বাগুত

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

أَلَمْ أَعْهَدْ إِلَيْكُمْ يَٰبَنِىٓ ءَادَمَ أَن لَّا تَعْبُدُوا۟ ٱلشَّيْطَٰنَۖ إِنَّهُۥ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

অর্থ: হে বনী আদম, আমি কি তোমাদের থেকে এই অঙ্গীকার নেইনি যে, তোমরা শয়তানের দাসত্ব করবে না? কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। আর আমারই ইবাদত করো। এটাই সরল পথ।” (সূরা ইয়াসীন, আয়াত ৬০-৬১)

আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা আরো বলেন,

إِن يَدْعُونَ مِن دُونِهِۦٓ إِلَّآ إِنَٰثًا وَإِن يَدْعُونَ إِلَّا شَيْطَٰنًا مَّرِيدًا

অর্থ: আল্লাহর পরিবর্তে তারা কতগুলো মূর্তির পূজা করে এবং তারা কেবল অবাধ্য শয়তানেরই পূজা করে।” (সূরা নিসা, আয়াত ১১৭)

২. الهوى طاغوت প্রবৃত্তি ও কামনা বাসনা ত্বাগুত

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন,

أَرَءَيْتَ مَنِ ٱتَّخَذَ إِلَٰهَهُۥ هَوَىٰهُ أَفَأَنتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا

অর্থ: তুমি কি তাকে দেখো নি? যে তার কামনা বাসনাকে ইলাহ রূপে গ্রহণ করেছে? তবুও কি তুমি তাঁর কর্মবিধায়ক হবে?” (সূরা ফুরকান, আয়াত ৪৩)

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র আরো বলেন,

أَفَرَءَيْتَ مَنِ ٱتَّخَذَ إِلَٰهَهُۥ هَوَىٰهُ وَأَضَلَّهُ ٱللَّهُ عَلَىٰ عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَىٰ سَمْعِهِۦ وَقَلْبِهِۦ وَجَعَلَ عَلَىٰ بَصَرِهِۦ غِشَٰوَةً فَمَن يَهْدِيهِ مِنۢ بَعْدِ ٱللَّهِۚ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ

অর্থ: তুমি কি লক্ষ্য করেছো তাকে, যে তার খেয়াল খুশিকে নিজ ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে। আল্লাহ জেনে শুনেই তাকে বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন এবং তার কর্ণ এবং হৃদয়ে মোহর মেরে দিয়েছেন। আর তার চক্ষুর ওপর রেখেছেন আবরণ। অতএব, আল্লাহর পর কে তাকে পথ নির্দেশ করবে? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না।” (সূরা জাছিয়াহ, আয়াত ২৩)

৩.  الحاكم المبدل لشرع الله طاغوت আল্লাহর আইন পরিবর্তনকারী শাসক ত্বাগুত আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُو۟لَٰٓئِكَ هُمُ ٱلْكَٰفِرُونَ

অর্থ: যারা আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করে না তারাই কাফির।” (সূরা মায়িদা, আয়াত ৪৪)

 ৪. المجالس النيابه طاغوت পার্লামেন্ট বা সংসদ ত্বাগুত কেননা সংসদ হলো এমন আইন প্রণয়ন কমিটি, যার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে আইন প্রণয়নে শরীক সাব্যস্ত করা হয়।

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

أَمْ لَهُمْ شُرَكَٰٓؤُا۟ شَرَعُوا۟ لَهُم مِّنَ ٱلدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَنۢ بِهِ ٱللَّهُۚ وَلَوْلَا كَلِمَةُ ٱلْفَصْلِ لَقُضِىَ بَيْنَهُمْۗ وَإِنَّ ٱلظَّٰلِمِينَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ

অর্থ: তাদের কি এমন কিছুদেবতা রয়েছে যারা তাদের জন্য দ্বীনের এমন সব বিধান ক্সতরী করে যার অনুমতি আল্লাহ দেননি। ফায়সালার ঘোষণা না থাকলে তাদের বিষয়ে তো সিদ্ধান্ত হয়েই যেতো। নিশ্চয়ই সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য রয়েছে মর্মান্তিক শাস্তি।” (সূরা শুরা, আয়াত ২১)

৫. الأمم المتحدة طاغوت জাতিসংঘ ত্বাগুত

এটা এ জন্য যে জাতিসংঙ্ঘের চুক্তিসমূহ কুফরকে আবশ্যককারী এবং কুফুরের সাথে সন্ধি। কুফরকে আবশ্যককারী জাতিসংঘের চুক্তিসমূহের একটি হলো তার সদস্য রাষ্ট্রসমূহকে আন্তর্জাতিক আদালত (international Cour) এর বিচার ফায়সালা কামনা করতে বাধ্য করা অর্থাৎ ত্বাগুতের কাছে বিচার ফায়সালা কামনা করতে বাধ্য করা) জাতিসংঘ ত্বাগুত হওয়ার জন্য এতুটুকুই যথেষ্ঠ।

জাতিসংঘের চুক্তিসমূহের মধ্যে রয়েছে–

ধারা (৯৩): জাতিসংঘের প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রকে তাদের সদস্য পদের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক আদালতের গঠনতন্ত্রের অংশ বলে গণ্য করা হবে ।

ধারা (৯৪): জাতিসংঘের প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রকে এই প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে, যে কোন বিষয় যদি আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের জন্য ধর্ণা দেয় তবেই তা এর অংশ বা অঙ্গ বলে গণ্য হবে।

 كفر بالطاغوت ত্বাগুতকে অস্বীকার করার পদ্ধতি কুফর বিত ত্বাগুত অন্তর, জবান এবং অঙ্গ প্রতঙ্গের মাধ্যমে হবে।

(ক) অন্তরের মাধ্যমে কুফুর বিত ত্বাগুতঃ

এটা হবে ত্বাগুতের উপাসনার অসারতার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এবং ত্বাগুতের সাথে শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণের মাধ্যমে। অন্তরের মাধ্যমে কুফর বিত ত্বাগুত কোন অবস্থাতেই রহিত হয় না বরং এক্ষেত্রে হওয়ার কথা কল্পনাতেই আসতে পারে না।

(খ) যবানের মাধ্যমে কুফর বিত ত্বাগুতঃ

এর পূর্ণতা প্রকাশ পাবে যবানে ত্বাগুতকে অস্বীকারের কথা প্রকাশ করা ত্বাগুতকে কাফের বলা এবং ত্বাগুত, তাগুতের দ্বীন ও তার অনুসারীদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং তাদের কুফুরি বর্ণনা করার মাধ্যমে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِىٓ إِبْرَٰهِيمَ وَٱلَّذِينَ مَعَهُۥٓ إِذْ قَالُوا۟ لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَءَٰٓؤُا۟ مِنكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ ٱلْعَدَٰوَةُ وَٱلْبَغْضَآءُ أَبَدًا حَتَّىٰ تُؤْمِنُوا۟ بِٱللَّهِ وَحْدَهُۥٓ إِلَّا قَوْلَ إِبْرَٰهِيمَ لِأَبِيهِ لَأَسْتَغْفِرَنَّ لَكَ وَمَآ أَمْلِكُ لَكَ مِنَ ٱللَّهِ مِن شَىْءٍۖ رَّبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ ٱلْمَصِيرُ

অর্থ: তোমাদের জন্য ইব্রাহীম আ. ও তাঁর অনুসারীদের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ, তারা তাদের স¤প্রদায়কে বলেছিলো, তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করো তাদের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের অস্বীকার করি। তোমাদের ও আমাদের মাঝে সৃষ্টি হলো শত্রæতা ও বিদ্বেষ চিরকালের জন্য, যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর ওপর ঈমান আনো। তবে ব্যতিক্রম তাঁর পিতার প্রতি ইব্রাহিমের উক্তি আমি নিশ্চয়ই আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবো, তবে আপনার ব্যাপারে আল্লাহর নিকট আমি কোন অধিকার রাখি না। (ইব্রাহিম ও তাঁর অনুসারীগণ বলেছিলেন) হে আমাদের রব! আমরা তো তোমারই ওপর নির্ভর করেছি, তোমারই অভিমুখী হয়েছি এবং আমাদের প্রত্যাবর্তন তো তোমারই দিকে।” (সূরা মুমতাহিনা, আয়াত ৪)

জবানের মাধ্যমে কুফুর বিত ত্বাগুতের ক্ষেত্রে ফরয হলো শাহাদাতাইনে অন্তর্ভুক্ত ত্বাগুতগোষ্ঠীকে অস্বীকার করা। আর প্রতিটি ত্বাগুতকে পৃথকভাবে অস্বীকার করা ক্ষেত্রে বিশেষে ওয়াজিব এবং ক্ষেত্র বিশেষে ভিন্নও হতে পারে।

(গ) অঙ্গ প্রতঙ্গের মাধ্যমে কুফুর বিত ত্বাগুত:

এটি পূর্ণতায় পৌঁছবে ত্বাগুত থেকে পৃথক হওয়া, দূরে সরে যাওয়া এবং ত্বাগুত ও ত্বাগুতের অনুসারী ও সেনাবাহিনীর সাথে জিহাদের মাধ্যমে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَٱلَّذِينَ ٱجْتَنَبُوا۟ ٱلطَّٰغُوتَ أَن يَعْبُدُوهَا وَأَنَابُوٓا۟ إِلَى ٱللَّهِ لَهُمُ ٱلْبُشْرَىٰۚ فَبَشِّرْ عِبَادِ

অর্থ: যারা ত্বাগুতের পূজা হতে দূরে থাকে এবং আল্লাহ অভিমুখী হয়, তাদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ। অতএব সুসংবাদ দাও আমার বান্দাদেরকে।(সূরা যুমার, আয়াত ১৭)

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَإِن نَّكَثُوٓا۟ أَيْمَٰنَهُم مِّنۢ بَعْدِ عَهْدِهِمْ وَطَعَنُوا۟ فِى دِينِكُمْ فَقَٰتِلُوٓا۟ أَئِمَّةَ ٱلْكُفْرِۙ إِنَّهُمْ لَآ أَيْمَٰنَ لَهُمْ لَعَلَّهُمْ يَنتَهُونَ

অর্থ: কাফেরদের নেতৃস্থানীয় নেতাদের সাথে যুদ্ধ করো। তারা তো এমন লোক, যাদের প্রতিশ্রুতি প্রতিশ্রুতিই নয়। সম্ভবত তারা নিরস্ত হতে পারে।

(সূরা তাওবা, আয়াত ১২)

শায়খ সুলাইমান ইবনে সাহমান রহ. বলেন,

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِى كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ ٱعْبُدُوا۟ ٱللَّهَ وَٱجْتَنِبُوا۟ ٱلطَّٰغُوتَۖ

অর্থ: আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আমি প্রত্যেক জাতির নিকট রাসূল প্রেরণ করেছি এ মর্মে নির্দেশ দেওয়ার জন্য যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং ত্বাগুতকে বর্জন করো” (সূরা নাহল, আয়াত ৩৬)

আল্লাহ তা‘আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, সকল নবীকে ত্বাগুত বর্জনের দাওয়াত দেওয়ার জন্যই পাঠানো হয়েছে। সুতরাং যে ত্বাগুতকে বর্জন করলো না সে সকল নবীর বিরোধীতা করলো।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَٱلَّذِينَ ٱجْتَنَبُوا۟ ٱلطَّٰغُوتَ أَن يَعْبُدُوهَا وَأَنَابُوٓا۟ إِلَى ٱللَّهِ لَهُمُ ٱلْبُشْرَىٰۚ فَبَشِّرْ عِبَادِ

অর্থ: যারা ত্বাগুতের পূজা হতে দূরে থাকে এবং আল্লাহর অভিমুখী হয় তাদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ।” (সূরা যুমার, আয়াত ১৭)

এ সকল আয়াতে ত্বাগুতকে বর্জন করা ওয়াজিব হওয়ার দলীল বিভিন্নভাবে বিদ্যমান রয়েছে।

ত্বাগুতকে বর্জন করার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, অন্তর দিয়ে ত্বাগুতের সাথে শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণ করা, যবানে ত্বাগুতের নিন্দা করা ও এর কদর্যতা বর্ণনা করা এবং সামর্থ থাকলে ত্বাগুতকে অপসারণ করা এবং এর থেকে দূরে থাকা। সুতরাং যে ত্বাগুতকে বর্জনের দাবী করবে অথচ এই কাজগুলি করবেনা সে সত্যবাদী ও সত্যনিষ্ঠ নয়। (আদ্দুরারুস সানিয়্যাহ ১০ম খন্ড, ৫০২-৫০৩ পৃষ্ঠা।)

সুতরাং বর্তমান যুগের ত্বাগুত গোষ্ঠী হলো শাসকগোষ্ঠী, সংবিধান এবং শাসনব্যবস্থা। অতএব কুফুর বিত ত্বাগুত পূর্ণতায় পৌঁছাবে এগুলোর অসারতায় বিশ্বাস স্থাপন, এগুলোর সাথে বিদ্বেষ রাখা ও ঘোষণা করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী এদের বিরুদ্ধে জান-মাল দিয়ে জিহাদ করার মাধ্যমে।

কালিমাতুত তাওহীদের দ্বিতীয় রোকনঃ ঈমান বিল্লাহ কালিমাতুত তাওহীদের দ্বিতীয় রোকন  ايمان بالله অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি ঈমান। “ايمان بالله” এর কয়েকটি রোকন আছে, সংক্ষেপে ও বিস্তৃতি করণের অবস্থাভেদে এর সংখ্যার বিভিন্নতা রয়েছে। কতক আলেম বলেছেন এর রোকন দুটি-

১.  توحيد المعرف والإثبات (পরিচয়গত ও অস্তিত্বগত তাওহীদ)

২. توحيد القصد والطل (নিয়ত ও প্রার্থনা সংক্রান্ত তাওহীদ)

আর কতক আলেম বলেছেন এর রোকন ৩ টি

১. توحيد الربوبي  তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ।

২. توحيد الألوهيه  তাওহিদুল উলুহিয়্যাহ।

৩.  توحيد الاسماء والصفات তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত।

কোন কোন আলেমদের মতে ৪ টি রোকন

১. الايمان بوجود الله ঈমান বিউজূদিল্লাহ (আল্লাহর অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাস)

২. الايمان بربوبي الله ঈমান বিরুবূবিয়্যাতিল্লাহ (আল্লাহর রুবূবিয়্যাতের প্রতি বিশ্বাস)

৩. الايمان الألوهية الله ঈমান বিউলূহিয়্যাতিল্লাহ

(আল্লাহর উলূহিয়্যাতের প্রতি বিশ্বাস )

৪. الايمان بأسماء الله والصفاته  ঈমান বিআসমাইল্লাহ ও সিফাতিহী (আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর প্রতি বিশ্বাস)

“ঈমান বিল্লাহ” এর আরকানসমূহের শিরোনামের ব্যাপারে আলেমদের মাঝে কোন মতভেদ নেই। মতভেদ শুধু সংক্ষিপ্ত করা এবং বিশ্লেষণের প্রতি লক্ষ্য রাখার প্রতি।

যারা চার রোকনের প্রবক্তা তারা توحيد المعرفة والإثبات “তাওহীদুল মা’রিফাহ ওয়াল ইছবাতকে” আল ঈমান বিউজূদিল্লাহ, আল ঈমান বিরুবূবিয়্যাতিল্লাহ এবং আল ঈমান বিআসমায়িল্লাহি ওয়া সিফাতিহী” এই তিন প্রকারে বিশ্লেষণ করেছেন এবং তাওহীদুল ক্বসদ ওয়াত ত্বলাব” এর নাম রেখেছেন “আল ঈমান বিউলূহিয়্যাহ।

১. তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ:

আল্লাহর সৃষ্টি, রাজত্ব ও পরিচালনা ইত্যাদি গুণাবলী যেগুলো একমাত্র আল্লাহরই সেগুলো তাঁর জন্যই সাব্যস্ত করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

ٱللَّهُ خَٰلِقُ كُلِّ شَىْءٍۖ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍ وَكِيلٌ

অর্থ: আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সবকিছুর কর্মবিধায়ক।

(সূরা যুমার, আয়াত ৬২)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

قُلِ ٱللَّهُمَّ مَٰلِكَ ٱلْمُلْكِ تُؤْتِى ٱلْمُلْكَ مَن تَشَآءُ وَتَنزِعُ ٱلْمُلْكَ مِمَّن تَشَآءُ وَتُعِزُّ مَن تَشَآءُ وَتُذِلُّ مَن تَشَآءُۖ بِيَدِكَ ٱلْخَيْرُۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ .  تُولِجُ ٱلَّيْلَ فِى ٱلنَّهَارِ وَتُولِجُ ٱلنَّهَارَ فِى ٱلَّيْلِۖ وَتُخْرِجُ ٱلْحَىَّ مِنَ ٱلْمَيِّتِ وَتُخْرِجُ ٱلْمَيِّتَ مِنَ ٱلْحَىِّۖ وَتَرْزُقُ مَن تَشَآءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ

অর্থ: বলো, হে রাজাধিরাজ আল্লাহ! আপনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান করেন এবং যার নিকট হতে ইচ্ছা ক্ষমতা ছিনিয়ে নেন। যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন, কল্যাণ তো আপনারই হাতে। নিশ্চয়ই আপনি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান।

আপনি রাতকে দিনের মধ্যে প্রবেশ করান এবং দিনকে রাতের মধ্যে প্রবেশ করান। আর মৃত থেকে জীবিতকে বের করেন এবং জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন। আর যাকে চান বিনা হিসাবে রিযিক দান করেন(সূরা আলে ইমরান, আয়াত ২৬-২৭)

আল্লাহ তা‘আলা আরো ইরশাদ করেন,

إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِى خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضَ فِى سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ ٱسْتَوَىٰ عَلَى ٱلْعَرْشِۖ يُدَبِّرُ ٱلْأَمْرَۖ مَا مِن شَفِيعٍ إِلَّا مِنۢ بَعْدِ إِذْنِهِۦۚ ذَٰلِكُمُ ٱللَّهُ رَبُّكُمْ فَٱعْبُدُوهُۚ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ

অর্থ: তোমাদের রব আল্লাহ, যিনি আসমান যমীন সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে। তারপর আরশে ইস্তিওয়াগ্রহণ করেছেন। যাবতীয় বিষয় তিনিই পরিচালনা করেন। তাঁর অনুমতি লাভ না করে সুপারিশ করবে এমন সাধ্য কার? তিনিই আল্লাহ; তোমাদের রব। সুতরাং তাঁর ইবাদত করো। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করবে না।” (সূরা ইউনুস, আয়াত ৩)

আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা আরো ইরশাদ করেন

اللَّهُ الَّذِي رَفَعَ السَّمَاوَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ كُلٌّ يَجْرِي لِأَجَلٍ مُسَمًّى يُدَبِّرُ الْأَمْرَ يُفَصِّلُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ بِلِقَاءِ رَبِّكُمْ تُوقِنُونَ

অর্থ: আল্লাহ তাআলাই আকাশমন্ডলীকে স্থাপন করেছেন স্তম্ভ ব্যতীত, তোমরা তো তা দেখতেই পাচ্ছ। এরপর তিনি আরশে ইস্তিওয়াগ্রহণ করেছেন এবং চন্দ্র সূর্যকে নিয়মাধীন করলেন যে, প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত আবর্তন করতে থাকবে। তিনি সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন এবং নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেন যেন তোমরা তোমাদের রবের সাক্ষাতের ব্যাপারে নিশ্চিত বিশ্বাস করতে পারো।

(সূরা রাদ, আয়াত ২)

২. তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ :

বান্দার কর্মের মাধ্যমে আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকৃতি দেয়া। সুতরাং ইবাদত একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্যই হবে। আর ইবাদত হলো আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের মাধ্যমে যতো কিছুর নির্দেশ করেছেন তা পালনের মাধ্যমে তাঁর আনুগত্য করা।

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. ইবাদতের সংজ্ঞায় বলেছেন, “আল্লাহ তা‘আলার পছন্দনীয় সকল অভ্যন্তরীন ও বাহ্যিক কথা ও কাজের সমষ্টির নাম হলো ইবাদত।” (মাজমাউল ফাতাওয়া ১০ম খন্ড, ১৪৭ পৃষ্ঠা।) তাওহীদুল উলূহিয়্যাহকে “তাওহীদুল ইবাদাহ”ও বলা হয়। কেননা (مألوه) মা’লুহ) এর অর্থ হলো। দমা’বু (معبود) তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ ই হলো সেই তাওহীদ, যার দিকে রাসূলগণ আহ্বান করেছেন এবং কিতাবসমূহ নাযিল হয়েছে।

এটা “তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ”কেও শামিল করে। আর তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ হলো একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা, যার কোন শরীক নেই। এই তাওহীদের হাকিকত হলো একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা এবং ইবাদতের ক্ষেত্রে কথায় বা কাজে

তাঁর কোন সৃষ্টিকে শরীক না করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

وَ اعۡبُدُوا  اللّٰہَ وَ لَا تُشۡرِکُوۡا بِہٖ شَیۡئًا وَّ بِالۡوَالِدَیۡنِ  اِحۡسَانًا

অর্থ: আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সাথে আর কাউকে শরীক করো না এবং পিতা মাতার সাথে সদাচরণ করো।” (সূরা নিসা, আয়াত ৩৬)

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন,

وَ قَضٰی رَبُّکَ اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّاۤ  اِیَّاہُ وَ بِالۡوَالِدَیۡنِ اِحۡسَانًا ؕ

অর্থ: তোমার রব এটা বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন যে তোমরা একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতামাতার সাথে সদ্বব্যবহার করবে

(সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত ২৩)

৩. তাওহীদুল আসমাওয়াস সিফাত :

কোন ধরণের তাহরীফ (বিকৃতিসাধন), তা’তীল (নিষ্কৃয়করণ) এবং তামছীল (সাদৃশ্য প্রদান) ব্যতীত আল্লাহ তা‘আলার নামসমূহ ও গুণাবলীর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۖ لَهُ ٱلْأَسْمَآءُ ٱلْحُسْنَىٰ

অর্থ: তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। সমস্ত উত্তম নাম তারই।

(সূরা ত্বহা, আয়াত ৮)

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,

هُوَ ٱللَّهُ ٱلَّذِى لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۖ عَٰلِمُ ٱلْغَيْبِ وَٱلشَّهَٰدَةِۖ هُوَ ٱلرَّحْمَٰنُ ٱلرَّحِيمُ . هُوَ ٱللَّهُ ٱلَّذِى لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلْمَلِكُ ٱلْقُدُّوسُ ٱلسَّلَٰمُ ٱلْمُؤْمِنُ ٱلْمُهَيْمِنُ ٱلْعَزِيزُ ٱلْجَبَّارُ ٱلْمُتَكَبِّرُۚ سُبْحَٰنَ ٱللَّهِ عَمَّا يُشْرِكُونَ . هُوَ ٱللَّهُ ٱلْخَٰلِقُ ٱلْبَارِئُ ٱلْمُصَوِّرُۖ لَهُ ٱلْأَسْمَآءُ ٱلْحُسْنَىٰۚ يُسَبِّحُ لَهُۥ مَا فِى ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِۖ وَهُوَ ٱلْعَزِيزُ ٱلْحَكِيمُ

অর্থ: তিনিই আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি দয়াময় পরম দয়ালু। তিনিই আল্লাহ- তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনিই অধিপতি, তিনিই পবিত্র, তিনিই শান্তি, তিনিই নিরাপত্তা বিধায়ক, তিনিই রক্ষক, তিনিই পরাক্রমশালী, তিনিই প্রবল, তিনিই অতীব মহিমান্বিত। ওরা যাদেরকে শরীক স্থির করে আল্লাহ তাআলা তা হতে পবিত্র, মহান। তিনিই আল্লাহ- সৃজনকর্তা, উদ্ভাবনকর্তা, রুপদাতা, সকল উত্তম নাম তাঁরই। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবকিছুই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা হাশর, আয়াত ২২-২৪)

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেছেন, “আল্লাহর প্রতি ঈমানের অংশ হলো আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাবে নিজের জন্য যেসব গুণ সাব্যস্ত করেছেন এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রবকে যেসব গুণে গুণান্বিত করেছেন, সেগুলোর প্রতি কোন ধরণের তাহরীফ, (বিকৃতিসাধন) তা’তীল, (নিষ্কৃয়করণ) তাকয়ীফ, (ধরণ বর্ণনা করা) এবং তামছীল (সাদৃশ্য প্রদান) ব্যতীত ঈমান আনা। বরং বান্দাগণ বিশ্বাস করবে যে আল্লাহ তা‘আলা এমন মহান যে,

لَيْسَ كَمِثْلِهِۦ شَىْءٌۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلْبَصِيرُ

অর্থ: তার মত কিছুই নেই, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা শুরা, আয়াত ১১)

সুতরাং আল্লাহ নিজের জন্য যেসব গুণ সাব্যস্ত করেছেন সেগুলোকে অস্বীকার করবে না। আল্লাহর কালাম বিকৃত করবে না। আল্লাহর নাম ও আয়াত সমূহের অপব্যাখ্যা করবে না, তাঁর কোন আকৃতি বর্ণনা করবে না এবং তাঁর গুণাবলির সাথে মাখলূকের গুণাবলীর কোন তুলনা করবে না। কেননা আল্লাহর সমতুল্য কেউ নেই, তাঁর কোন সমকক্ষ নেই, নেই কোন অংশীদার। সৃষ্টির দ্বারা তাকে অনুমান করা যাবে না। কেননা তিনিই নিজের ব্যাপারে এবং অন্যের ব্যাপারে সৃষ্টির চেয়ে অধিক জ্ঞাত, অধিক সত্যবাদী এবং সর্বোত্তম বর্ণনাকারী। ঐ ব্যক্তিরা এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম যারা আল্লাহর ওপর এমন বিষয় আরোপ করে যা তারা জানেনা এজন্যই আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

سُبْحَٰنَ رَبِّكَ رَبِّ ٱلْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ . وَسَلَٰمٌ عَلَى ٱلْمُرْسَلِينَ . وَٱلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلْعَٰلَمِينَ

অর্থ: ওরা যা আরোপ করে তোমার রব তা হতে পবিত্র ও মহান, যিনি সকল ক্ষমতার অধিকারী। শান্তি বর্ষিত হোক রাসূলদের প্রতি। প্রশংসা সব জগৎ সমূহের রব আল্লাহরই প্রাপ্য।” (সূরা আস সাফফাত, আয়াত ১৮০-১৮২)

তো রাসূলদের বিরোধীরা আল্লাহর জন্য যেসব গুণ আরোপ করে, আল্লাহ সেগুলো থেকে নিজেকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন এবং রাসূলদের প্রতি শান্তি বর্ষণ করেছেন। কেননা তাঁরা যা বলেন তা দোষ ত্রুটি হতে মুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় নাম ও গুণের ক্ষেত্রে ইছবাত ও নফীর সমন্বয় সাধন করেছেন।

সুতরাং “আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আহর জন্য রাসূলদের আনীত হেদায়েত থেকে ফেরার কোন অবকাশ নেই। কেননা এটাই হলো সিরাতে মুস্তাকীম বা সরল পথ, তাদের পথ যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন। নাবিয়্যীন, সিদ্দিকীন, শুহাদা এবং সালিহীনদের পথ।” (মাজমূউল ফাতাওয়া ৩য় খন্ড, ১২৯-১৩০ পৃষ্ঠা।)

نواقض كلمة التوحيد

(তাওহীদ ভঙ্গকারী বিষয়সমূহ)

তাওহীদ ভঙ্গকারী অনেক বিষয় আছে। এগুলোকে ৩ প্রকারে বিভক্ত করা যেতে পারে।

১.  نواقض كلمة التوحيد القلبية বিশ্বাসগত নাওয়াকিয।

২. نواقض كلمة التوحيد القولية উক্তিমূলক নাওয়াকিয।

৩. نواقض كلمة التوحيد الفعلية কর্মগত নাওয়াকিয।

نواقض كلمة التوحيد القلبية

কালীমাতুত তাওহীদের বিশ্বাসগত নাওয়াকিয কালিমাতুত তাওহীদের এমন কিছু নাওয়াকিয রয়েছে যার সম্পর্ক শুধু অন্তরের বিশ্বাসের সাথে, কথা বা কাজের সাথে যার কোন সম্পৃক্ততা নেই। সেগুলো নিম্নে বর্ণনা করা হলো-

(ক)[2]  الجحود والتكذيب অর্থাৎ অস্বীকার বা মিথ্যারোপ করা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেছেন,

وَجَحَدُوا۟ بِهَا وَٱسْتَيْقَنَتْهَآ أَنفُسُهُمْ ظُلْمًا وَعُلُوًّاۚ فَٱنظُرْ كَيْفَ كَانَ عَٰقِبَةُ ٱلْمُفْسِدِينَ

অর্থ: তারা (ইহুদীরা) অন্যায়ভাবে ও সীমালঙ্ঘন করে নির্দেশগুলো প্রত্যাখ্যান করলো। যদিও তাদের অন্তর এগুলোকে সত্য বলে গ্রহণ করেছিলো। দেখো, বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কি হয়েছিল।” (সূরা নামল, আয়াত ১৪)

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন,

قَدْ نَعْلَمُ إِنَّهُۥ لَيَحْزُنُكَ ٱلَّذِى يَقُولُونَۖ فَإِنَّهُمْ لَا يُكَذِّبُونَكَ وَلَٰكِنَّ ٱلظَّٰلِمِينَ بِـَٔايَٰتِ ٱللَّهِ يَجْحَدُونَ

অর্থ: অবশ্যই আমি জানি যে তারা যা বলে তা তোমাকে নিশ্চয়ই কষ্ট দেয়; কিন্তু তারা তো তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে না; বরং জালিমরা আল্লাহর নিদর্শনসমূহ অস্বীকার করে।” (সূরা আনআম, আয়াত ৩৩ )

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রহ. এ আয়াত সম্পর্কে বলেন, “আল্লাহ তা‘আলা তাদের পক্ষ থেকে তাকযীব বা মিথ্যা প্রতিপন্ন করণ অসাব্যস্ত করলেন এবং জুহুদ তথা অস্বীকার সাব্যস্ত করলেন। এটা জানা কথা যে যবান দ্বারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করা তাদের থেকে প্রমাণিত। সুতরাং জানা গেল যে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের থেকে অন্তরের তাকযীব অর্থাৎ মিথ্যা প্রতিপন্ন করা অসাব্যস্ত করেছেন।”

(আল ফাতাওয়াল কুবরা, ৫ম খন্ড, ১৬৪ পৃষ্ঠা।)

(খ) الإستحلْال أمر معلوم تحريمه من الدين بالضرورة[3]

 অর্থাৎ দ্বীনের মাঝে সুনিশ্চিত ও সুপ্রমাণিত হারাম বিষয়কে হালাল মনে করা।

 ইমাম শাওকানী রহ. বলেন, “ইসলামী শরীয়াহর একটি সার্বজনীন স্বীকৃত মূলনীতি হলো, قطعي (সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত) বিধান অবিশ্বাসকারী বা অস্বীকারকারী, হারামকে হালাল মনে করে এমন ব্যক্তি এবং ঔদ্ধত্ব, জিদ ও অবজ্ঞাবশত قطعي বিধানের বিরোধিতাকারী বা বিপরীত আমলকারীর হুকুম হলো, তারা মূলত আল্লাহকে অস্বীকারকারী এবং পবিত্র শরীয়তকে অস্বীকারকারী যা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের জন্য মনোনীত করেছেন। অর্থাৎ সে কাফির।” (আদ দাওয়া আজিল ফী দাফ’য়ীল আদুয়্যিল স্বায়িল, ২৪ পৃষ্ঠা।)

শাইখ সুলাইমান ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব রহ. বলেন, ঐকমত্যপূর্ণ হারামকে হালাল মনে করা এবং ঐকমত্যপূর্ণ হালালকে হারাম মনে করা কুফরে ই’তিক্বাদী বা বিশ্বাসগত কুফুর। কেননা একমাত্র ইসলাম বিদ্বেষীরাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা. কর্তৃক হালালকে হালাল আর হারামকে হারাম মানতে অস্বীকৃতি জানায় (তাওহীদ খালাক্ব, ৯৮ পৃষ্ঠা।)

(গ) الشرك في الربوبية আশ শিরক ফির রুবুবিয়্যাহ (রুবুবিয়্যাহর ক্ষেত্রে শিরক)

তা হলো এই বিশ্বাস পোষণকরা যে, সৃষ্টির কর্তৃত্বকারী গাইরুল্লাহ বা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ। যেমনটি জাহিল সূফীরা আউলিয়াদের ব্যাপারে বিশ্বাস রাখে যে, তাদের হাতে বিভিন্ন বিষয়ের কর্তৃত্ব এবং বিপদ দূর করার ক্ষমতা রয়েছে এবং যেমনটা ইমামিয়্যাহ, ইসমাঈলিয়্যাহ এবং বাতেনী সম্প্রদায় বিশ্বাস করে যে সৃষ্টি জগতে তাদের ইমামদের অদৃশ্য ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব রয়েছে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُۥٓ إِلَّا هُوَۖ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَآدَّ لِفَضْلِهِۦۚ يُصِيبُ بِهِۦ مَن يَشَآءُ مِنْ عِبَادِهِۦۚ وَهُوَ ٱلْغَفُورُ ٱلرَّحِيمُ

অর্থ: এবং আল্লাহ তোমাকে ক্লেশ দিলে এর মোচনকারী আর কেউ নেই। আর আল্লাহ যদি তোমার কল্যাণ চান তবে তাঁর অনুগ্রহ রদ করবার মতো কেউ নেই। তাঁর বান্দাদের মধ্যে তিনি যাঁকে ইচ্ছা কল্যাণ দান করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা ইউনুস, আয়াত ১০৭)

অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

مَّا يَفْتَحِ ٱللَّهُ لِلنَّاسِ مِن رَّحْمَةٍ فَلَا مُمْسِكَ لَهَاۖ وَمَا يُمْسِكْ فَلَا مُرْسِلَ لَهُۥ مِنۢ بَعْدِهِۦۚ وَهُوَ ٱلْعَزِيزُ ٱلْحَكِيمُ

অর্থ: আল্লাহ মানুষের প্রতি কোনো অনুগ্রহ অবারিত করলে কেউ তা নিবারণ করতে পারে না এবং তিনি কিছু নিরুদ্ধ করতে চাইলে কেউ তার নিবারণকারী নেই। তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।” (সূরা ফাত্বির, আয়াত ২)

আল্লাহ তা‘আলা অপর এক জায়গায় বলেন,

قُلِ ٱدْعُوا۟ ٱلَّذِينَ زَعَمْتُم مِّن دُونِ ٱللَّهِۖ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِى ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَلَا فِى ٱلْأَرْضِ وَمَا لَهُمْ فِيهِمَا مِن شِرْكٍ وَمَا لَهُۥ مِنْهُم مِّن ظَهِيرٍ

অর্থ: বলো! তোমরা ডাকো ওদেরকে যাদেরকে তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে ইলাহ মনে করো। ওরা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে অনুপরিমাণ কিছুর মালিক নয় এবং এতদুভয়ে ওদের কোন অংশ নেই এবং ওদের কেউ তাঁর সহায়কও নয়।

(সূরা সাবা, আয়াত ২২)

(ঘ) اْلعراض عن دين الله لا يتعلمويعمل يعمل به

আল্লাহর দ্বীন থেকে বিমুখ হওয়া, দ্বীন একেবারেই না শেখা ও আমল না করা।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَيَقُولُونَ ءَامَنَّا بِٱللَّهِ وَبِٱلرَّسُولِ وَأَطَعْنَا ثُمَّ يَتَوَلَّىٰ فَرِيقٌ مِّنْهُم مِّنۢ بَعْدِ ذَٰلِكَۚ وَمَآ أُو۟لَٰٓئِكَ بِٱلْمُؤْمِنِينَ . وَإِذَا دُعُوٓا۟ إِلَى ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ إِذَا فَرِيقٌ مِّنْهُم مُّعْرِضُونَ . وَإِن يَكُن لَّهُمُ ٱلْحَقُّ يَأْتُوٓا۟ إِلَيْهِ مُذْعِنِينَ . أَفِى قُلُوبِهِم مَّرَضٌ أَمِ ٱرْتَابُوٓا۟ أَمْ يَخَافُونَ أَن يَحِيفَ ٱللَّهُ عَلَيْهِمْ وَرَسُولُهُۥۚ بَلْ أُو۟لَٰٓئِكَ هُمُ ٱلظَّٰلِمُونَ

অর্থ: ওরা বলে আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনলাম এবং আমরা আনুগত্য স্বীকার করলাম। কিন্তু এরপর ওদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়। আসলে ওরা মুমিন নয়, যখন ওদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে ওদের মধ্য ফায়সালা করে দেবার জন্য আহ্বান করা হয়, তখন ওদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়। আর যদি ওদের প্রাপ্য থাকে তাহলে ওরা বিনীতভাবে রাসূলের নিকট ছুটে আসে। ওদের অন্তরে কি ব্যাধি আছে? না ওরা সংশয় পোষণ করে? না ওরা ভয় করে যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ওদের প্রতিও জুলুম করবেন? বরং ওরাইতো জালেম।

(সূরা নূর, আয়াত ৪৭-৫০)

ইমাম ইবনুল ক্বায়্যিম রহ. বলেন, “কুফরে ই’রায বা বিমুখতামূলক কুফর হলো কর্ণ ও অন্তর দিয়ে রাসূল সা. থেকে বিমূখতা প্রদর্শন করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সত্যায়নও না করা,

আবার শত্রুতাও না করা এবং তাঁর আনীত দ্বীনের প্রতি বিন্দুমাত্রও ভ্রæক্ষেপ না করা।” (মাদারিজুস সালিকীন, ১ম খন্ড, ৩৬৬-৩৬৭ পৃষ্ঠা)

তিনি আরো বলেন, “বান্দা দুই কারণে আযাবের উপযুক্ত হয়।

১. দলীল প্রমাণ থেকে বিমুখ হওয়া এবং এর ওপর ও এর দাবীর ওপর আমলের

    ইচ্ছে পোষণ না করা।

২. দলীল সাব্যস্ত হবার পরেও হঠকারীতা অবলম্বন করা এবং দাবী অনুযায়ী

    আমলের ইচ্ছা পোষণ না করা।

প্রথমটি কুফরুল ই’রায (বিমূখতামূলক কুফর) আর দ্বিতীয়টি হলো কুফরুল ইনাদ (হঠকারীতামূলক কুফর)।

আর দলীল কায়েম না হওয়ায় এবং দলীল জানা সম্ভব না হওয়ায় জাহল বা অজ্ঞতার কারণে যে কুফরি করা হয় আল্লাহ তা‘আলা সেই কুফুরির ব্যাপারে রাসূলগণ কর্তৃত্ব হুজ্জত বা দলীল কায়েম হওয়ার পূর্বে আযাব না দেওয়ার কথা বলেছেন।” (ত্বরীকুল হিজরাতাইন, ৩৮৪ পৃষ্ঠা।)

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রহ. এ সকল আয়াতের পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলেন, ‘আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বর্ণনা করেছেন যে, যে ব্যক্তি রাসূলের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে এবং তাঁর হুকুম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে সে মুনাফিকদের অন্তর্ভুক্ত, সে মুমিন নয়। আরে মুমিন তো সে যে বলবে, “শোনলাম তো মানলাম।”

সুতরাং যখন শুধু রাসূলের হুকুম থেকে বিমুখ হওয়া এবং অন্যের কাছে ফায়সালা চাওয়ার ইচ্ছার কারণেই নিফাক সাব্যস্ত হয় এবং ঈমান দূরীভূত হয়ে যায়, অথচ এটা তরক মাত্র যা কখনো কখনো প্রবৃত্তির প্রবলতার কারণেও হয়ে থাকে। তাহলে আল্লাহর সুস্পষ্ট হুকুম প্রত্যাখ্যান করা কিংবা তাকে কটাক্ষ করা বা গালি দেয়া ইত্যাদির ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কি হতে পারে? (অর্থাৎ এগুলোও সুস্পষ্ট কুফরী কাজ) (আস সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৩৯)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا۟ إِلَىٰ مَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ وَإِلَى ٱلرَّسُولِ رَأَيْتَ ٱلْمُنَٰفِقِينَ يَصُدُّونَ عَنكَ صُدُودًا

অর্থ: তোমাদের যখন বলা হয় আল্লাহ তাআলা যা অবতরণ করেছেন তাঁর দিকে এবং রাসূলের দিকে এসো, তখন মুনাফিকদের তুমি দেখবে যে তারা তোমার নিকট হতে একেবারে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।” (সূরা নিসা, আয়াত ৬১)

ইমাম ইবনুল ক্বাইয়্যিম রহ. বলেন, “আল্লাহ তা‘আলার রাসূল কর্তৃক আনীত দ্বীন থেকে বিমুখ হয়ে অন্য দ্বীনের দিকে ধাবিত হওয়াকে খালেস নিফাকি বলে। যেমনিভাবে খাটি ঈমান হলো তাঁর কাছেই মোকাদ্দামা দায়ের করা এবং তাঁর ফয়সালার প্রতি কোনরূপ দ্বিধা সংশয় না থাকা। তাঁর ফয়সালার প্রতি নিজেকে সমর্পণ করাই হলো সন্তুষ্টি, পছন্দ এবং মুহাব্বাত। এটাই হলো ঈমানের হাকীকত।

ইমাম শাওকানী রহ. কে একটি প্রশ্ন করা হয়েছিল, প্রশ্নটি ছিল নিম্নরুপঃ

ওই সকল মরুচারীদের হুকুম কী, যারা শুধু কালিমা পড়েছে কিন্তু এছাড়া শরীয়তের আর কোনো বিধি-বিধান পালন করে না। তারা কি কাফের? তাদের বিরুদ্ধে কি মুসলমানদের ওপর যুদ্ধ পরিচালনা করা কি ওয়াজিব?

শায়েখ রহ. জবাবে বলেছিলেন, “যে ব্যক্তি ইসলামের রোকনসমূহ তরক করবে তার ওপর আবশ্যকীয় কথা ও কাজ প্রত্যাখ্যান করবে এবং শুধুই কালিমা পড়বে, সে নিঃসন্দেহে কাফের তাঁর জান-মাল সবই হালাল।” (ইরশাদুল সা’য়িল, ৩৩ পৃষ্ঠা।)

(ঙ)  بعض او كراهية بعض ما جاء به النبي ﷺ

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আনীত দ্বীনের কোন একটি বিধান অপছন্দ করা বা এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা।

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

وَالَّذِينَ كَفَرُوا فَتَعْسًا لَّهُمْ وَأَضَلَّ أَعْمَالَهُمْ ﴿محمد: ٨﴾

ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ ﴿محمد: ٩﴾

অর্থ: যারা কুফুরি করেছে তাদের জন্য রয়েছে দুর্ভোগ এবং তিনি তাদের কর্ম ব্যর্থ করে দিবেন। এটা এজন্য যে আল্লাহ তাআলা যা অবতরণ করেছেন ওরা তা অপছন্দ করে। সুতরাং আল্লাহ তাদের কর্ম নিস্ফল করে দিবেন।” (সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত ৮-৯)

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রহ. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক আনীত কোন বিধানকে অপছন্দ করাকে “নাওয়াকিযুত তাওহীদ” (অর্থাৎ তাওহীদ ভঙ্গকারী বিষয়) এর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণ উল্লেখ করে বলেন, “কেননা সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রদানকৃত সকল সংবাদ স্বীকার করে, মুমিনরা যা সত্যায়ন করে সেও তার সবই

সত্যায়ন করে। এতদসত্বেও সে তা অপছন্দ করে, তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে এবং অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে তাঁর প্রবৃত্তি ও কামনা বাসনার চাহিদা মোতাবেক না হওয়ার কারণে। সে তখন বলে, আমি এটার স্বীকৃতি দিবোনা এবং আঁকড়ে ধরবো না, আমি এই হক্বের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি এবং এটাকে ঘৃণা করি। এই ব্যক্তির কুফুরি ইসলামের সুনিশ্চিত দলীল দ্বারা প্রমাণিত। এ ধরণের তাকফীরে কুরআন পরিপুর্ণ।” (আস সারিমুল মাসলুল, ৫২৪ )

نواقض كلمة التوحيد القولية

কালিমাতুত তাওহীদের উক্তিগত নাওয়াকিয কালিমাতুত তাওহীদের উক্তিগত কিছু নাওয়াকিয রয়েছে। অন্তর ও অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সাথে যেগুলোর কোন সম্পর্ক নেই এ ধরণের কিছু নাওয়াকিয নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

(ক) আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর দ্বীনকে গালি দেওয়া

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

يَحْذَرُ ٱلْمُنَٰفِقُونَ أَن تُنَزَّلَ عَلَيْهِمْ سُورَةٌ تُنَبِّئُهُم بِمَا فِى قُلُوبِهِمْۚ قُلِ ٱسْتَهْزِءُوٓا۟ إِنَّ ٱللَّهَ مُخْرِجٌ مَّا تَحْذَرُونَ . وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُۚ قُلْ أَبِٱللَّهِ وَءَايَٰتِهِۦ وَرَسُولِهِۦ كُنتُمْ تَسْتَهْزِءُونَ . لَا تَعْتَذِرُوا۟ قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَٰنِكُمْۚ إِن نَّعْفُ عَن طَآئِفَةٍ مِّنكُمْ نُعَذِّبْ طَآئِفَةًۢ بِأَنَّهُمْ كَانُوا۟ مُجْرِمِينَ

অর্থ: মুনাফিকরা আশংকা করে এমন সূরা না আবার অবতীর্ণ হয়ে যায় যা ওদের অন্তরের কথা ব্যক্ত করে দিবে। (হে নবী! আপনি তাদের) বলে দিন, তোমরা বিদ্রæপ করতে থাকো, তোমরা যা আশংকা করো নিশ্চয়ই আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিবেন। আপনি ওদেরকে প্রশ্ন করলে নিশ্চয়ই ওরা বলবে, “আমরা তো আলাপ আলোচনা ও ক্রীড়া কৌতুক করছিলাম। (হে নবী! আপনি তাদের) বলুন, “তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর নিদর্শন এবং তাঁর রাসূলকে বিদ্রæপ করেছিলে? ওযরখাহী করো না। তোমরা ঈমান আনার পর কুফুরি করেছো। তোমাদের মধ্যে কোন দলকে ক্ষমা করলেও অন্য দলকে শাস্তি দিবো কারণ তারা অপরাধী।” (সূরা তাওবা, আয়াত ৬৪-৬৬)

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ্ রহ. বলেছেন, “আল্লাহর আয়াতসমূহ এবং আল্লাহর রাসূলের প্রতি ঠাট্টা বিদ্রæপ কুফুরী হওয়ার ব্যাপারে এই আয়াত সুস্পষ্ট। তাহলে গালি দেওয়ার ব্যাপারটি তো বলার অপেক্ষা রাখে না।” (আস সারিমুল মাসলুল, ৩১)

তিনি আরো বলেন, “যদি কেউ আল্লাহ অথবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালি দেয়, তাহলে সে ভিতর বাহির উভয় দিক থেকে কাফির হয়ে যাবে। চাই গালিদাতা এটা হারাম মনে করুক বা হালাল মনে করুক অথবা কোন ধরণের বিশ্বাসই না রাখুক। এটাই ফুকাহা এবং আহলুস সুন্নাহর মাযহাব যারা “ঈমান কথা ও কাজের নাম” এর প্রবক্তা। ইসহাক ইবনে রাহওয়াই রহ. বলেন,

মুসলমানদের এ ব্যাপারে ইজমা রয়েছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ অথবা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালি দিবে সে কাফের হয়ে যাবে যদিও কিনা সে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা স্বীকার করে। কাজী আবু ইয়া’লা “আল মু’তামাদ” নামক কিতাবে বলেন, যে আল্লাহ অথবা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালি দিবে সে কাফের হয়ে যাবে গালি দেওয়াকে সে হালাল মনে করুক অথবা হারাম মনে করুক।”(আস সারিমুল মাসলুল ৫১২-৫১৩)

(খ) আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ অপারগ এমন বিষয়ে গাইরুল্লাহকে আহ্বান করা এবং গাইরুল্লাহ এর কাছে সাহায্য চাওয়া

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

وَلَا تَدْعُ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَۖ فَإِن فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِّنَ ٱلظَّٰلِمِينَ . وَإِن يَمْسَسْكَ ٱللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُۥٓ إِلَّا هُوَۖ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَآدَّ لِفَضْلِهِۦۚ يُصِيبُ بِهِۦ مَن يَشَآءُ مِنْ عِبَادِهِۦۚ وَهُوَ ٱلْغَفُورُ ٱلرَّحِيمُ

অর্থ: আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকেও আহ্বান করোনা, যা তোমার উপকারও করেনা, অপকারও করে না। কারণ এটা করলে তো তুমি সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ তোমাকে ক্লেশ দিলে এর মোচনকারী আর কেউ নেই এবং আল্লাহ যদি কল্যাণ চান, তবে তা রদ করার কেউ নেই। তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাঁকে ইচ্ছা কল্যাণ দান করেন। তিনি ক্ষমাশীল পরম দয়ালু” (সূরা ইউনুস, আয়াত ১০৬-১০৭)

ক্বাযী শাওকানী রহ. বলেন, “সমস্ত দু‘আ আল্লাহর জন্য হওয়ার আগ পর্যন্ত তাওহীদ খাঁটি হতে পারে না। আহ্বান, সাহায্য-প্রার্থনা, আশা-আকাঙ্খা, কল্যাণ চাওয়া এবং অকল্যাণ দূর করতে চাওয়া ইত্যাদি আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহরই পক্ষ থেকে। অন্যের জন্য নয়, অন্যের পক্ষ থেকেও নয়।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَأَنَّ ٱلْمَسَٰجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا۟ مَعَ ٱللَّهِ أَحَدًا

অর্থ: আল্লাহর সাথে অপর কাউকে ডেকো না।” (সূরা জ্বিন, আয়াত ১৮)

অন্যত্র বলেন,

لَهُۥ دَعْوَةُ ٱلْحَقِّۖ وَٱلَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِهِۦ لَا يَسْتَجِيبُونَ لَهُم بِشَىْءٍ

অর্থ: দাওয়াতুল হক বা সত্যের আহ্বান আল্লাহরই। আর যারা তাঁকে ছাড়া অন্যদের ডাকে, তারা তাদের আহ্বানে কোনোই সাড়া প্রদান করে না।(সূরা রা, আয়াত ১৪)

(গ) নবুওয়াত দাবী করা

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ ٱفْتَرَىٰ عَلَى ٱللَّهِ كَذِبًا أَوْ قَالَ أُوحِىَ إِلَىَّ وَلَمْ يُوحَ إِلَيْهِ شَىْءٌ وَمَن قَالَ سَأُنزِلُ مِثْلَ مَآ أَنزَلَ ٱللَّهُۗ وَلَوْ تَرَىٰٓ إِذِ ٱلظَّٰلِمُونَ فِى غَمَرَٰتِ ٱلْمَوْتِ وَٱلْمَلَٰٓئِكَةُ بَاسِطُوٓا۟ أَيْدِيهِمْ أَخْرِجُوٓا۟ أَنفُسَكُمُۖ ٱلْيَوْمَ تُجْزَوْنَ عَذَابَ ٱلْهُونِ بِمَا كُنتُمْ تَقُولُونَ عَلَى ٱللَّهِ غَيْرَ ٱلْحَقِّ وَكُنتُمْ عَنْ ءَايَٰتِهِۦ تَسْتَكْبِرُونَ

অর্থ: যে আল্লাহর ওপর অপবাদ আরোপ করে কিংবা বলে আমার ওপর ওহী নাযিল হয় (?) যদিও তাঁর ওপর মোটেও ওহী নাযিল হয় না এবং যে বলে, “আল্লাহ যা অবতরণ করেছেন আমি তাঁর অনুরুপ অবতরণ করবোতাঁর চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে? যদি তুমি দেখতে পেতে যখন জালিমরা মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকবে এবং ফেরেশতাগণ হাত বাড়িয়ে বলবে, তোমরা তোমাদের প্রাণ সংহার করো। তোমরা যে আল্লাহর সম্পর্কে অন্যায় বলতে এবং তাঁর নিদর্শন সম্পর্কে ঔদ্ধত্ব্য প্রকাশ করতে, এজন্য তোমাদেরকে অবমাননাকর শাস্তি দেওয়া হবে।” (সূরা আনআম, আয়াত ৯৩)

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ্ রহ. বলেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা নবুওয়াতের দাবী করবে, সে হচ্ছে সবচেয়ে মারাত্মক কাফির, সবচেয়ে বড় জালিম এবং আল্লাহর সৃষ্টি জগতের মাঝে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ ٱفْتَرَىٰ عَلَى ٱللَّهِ كَذِبًا لِّيُضِلَّ ٱلنَّاسَ بِغَيْرِ عِلْمٍۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهْدِى ٱلْقَوْمَ ٱلظَّٰلِمِينَ

অর্থ: সুতরাং যে ব্যক্তি অজ্ঞতা বশত মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য আল্লাহর ওপর মিথ্যারোপ করে, তার চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে? নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা জালিম সম্প্রদায়কে হেদায়েত দেন না।” (সূরা আনআম, আয়াত ১৪৪। আল জাওয়াবুস সহীহ লিমান বাদ্দালা দ্বীনাল মাসীহ, ১ম খন্ড, ৩০ পৃষ্ঠা।)

আল্লামা ইবনে হাযম জাহেরী রহ. বলেন, “যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরে ঈসা ইবনে মারয়াম আ. ব্যতীত (-যিনি পূর্বে নবী ছিলেন এবং শেষ যামানায় পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়ে শেষ নবীর উম্মত হিসেবে দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদ করবেন) অন্য কারো জন্য নবুওয়াত দাবী করবে সে কাফের। এ ব্যাপারে মুসলমানদের কোন বিরোধ নেই। কেননা এটা

কুরআন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত সুনিশ্চিত হেদায়েত বিরোধী।” (আল ফাসল ৩য় খন্ড, ২৯৩ পৃষ্ঠা।)

(ঘ) দ্বীনের অকাট্য কোন বিধানকে মিথ্যা মনে করা

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ ٱفْتَرَىٰ عَلَى ٱللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِـَٔايَٰتِهِۦٓۗ إِنَّهُۥ لَا يُفْلِحُ ٱلظَّٰلِمُونَ

অর্থ: তাঁর চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে? যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে কিংবা আল্লাহর আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। নিশ্চয়ই অপরাধীরা সফলকাম হবে না।” (সূরা আনআম, আয়াত ২১)

আবিল ইয্য হানাফী রহ. বলেন, “মুসলমানদের মধ্যে এ ব্যাপারে কোন বিরোধ নেই যে, “কোন ব্যক্তি যদি দ্বীনের মুতাওয়াতির, অকাট্য, সুস্পষ্ট ওয়াজিব, হারাম বা এ জাতীয় অন্য কোন বিধানকে অস্বীকার করে, তাহলে তাকে তওবা করতে বলা হবে। সুতরাং তওবা করলে তো ভালো, নতুবা তাকে কাফির মুরতাদ হিসেবে হত্যা করা হবে।” (শারহুল আক্বীদাতুত ত্বহাবিয়্যাহ ৩৫৫)। মোল্লা আলী কারী রহ.ও একই কথা বলেছেন (শারহুল ফিক্বহুল আকবার ১৩৮)

ক্বাজী ইয়ায রহ. বলেছেন, “এমনিভাবে যারা শরীয়াতের কোন একটি মূলনীতিকে এবং রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তাওয়াতুরের মাধ্যমে (ধারাবাহিকভাবে) প্রমাণিত কোন কর্মকে অস্বীকার এবং মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, তাদের কুফুরির ব্যাপারে উম্মাহর ধারাবাহিক ইজমা সংঘটিত হয়েছে। যেমন কোন ব্যক্তি ৫ ওয়াক্ত সালাত অথবা রাকাত, সিজদার সংখ্যাকে অস্বীকার করলো। (আশ শিফা, ২য় খন্ড, ১০৭৩ পৃষ্ঠা।)

ইমাম ইবনে বাত্তাহ রহ. বলেন, যে ব্যক্তি অস্বীকারবশত এবং মিথ্যা প্রতিপন্ন করতঃ আল্লাহর প্রণীতকোন ফরজ অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তাকীদ করা কোন সুন্নাহ ছেড়ে দিবে সে সুস্পষ্ট কাফির। আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাসী কোনো আকলমান্দ তাঁর কুফুরির ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ও সংশয় পোষণ করতে পারে না। (আল ইনাবাহ ২য় খন্ড, ২৬৪ পৃষ্ঠা)

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রহ. বলেন, ধারাবাহিকভাবে প্রমাণিত সুস্পষ্ট ওয়াজিব বিধান ওয়াজিব হওয়া এবং হারাম বিধানের হারাম হওয়ার প্রতি ঈমান রাখা ঈমানের সবচেয়ে বড় মূলনীতি এবং দ্বীনের সবচেয়ে বড় ভিত্তি। একে অস্বীকারকারী সর্বসম্মতিক্রমে কাফের। (মাজমুউল ফাতাওয়া, ১২তম খন্ড, ৪৯৭ পৃষ্ঠা।)

ইমাম নববী রহ. বলেছেন, “যে ব্যক্তি নস (কুরআন সুন্নাহ) এর ভিত্তিতে উম্মাহর ঐক্যমতপূর্ণ কোন বিধানকে অস্বীকার করবে; আর বিধানটিও ইসলামের এমন কোনো বিষয়ের অন্তর্ভূক্ত যা সাধারণ, বিশেষ সকলেই সমান অবগত, যেমন নামাজ, যাকাত, হজ্ব, অথবা মদ হারাম হওয়া ইত্যাদি -সে কাফের হয়ে যাবে।

আর যে ব্যক্তি এমন ঐক্যমতপূর্ণ বিধানকে অস্বীকার করে, যা শুধু বিশেষজনেরাই জানে- যেমন ঔরসজাত মেয়ে থাকলে ছেলে মেয়ের মিরাস ১/৬ এর অধিকারী হওয়া, ইদ্দতকালীন নারীকে বিবাহ হারাম হওয়া। এমনিভাবে যদি কোনো বিশেষ যুগের আলেমগণ এক বিশেষ মাসআলায় একমত হওয়ার মাসআলায় সে দ্বিমত পোষণ করে, তবে সে কাফের হবে না।” (রাওযাতুত ত্বালিবীন, ২য় খন্ড, ১৪৬ পৃষ্ঠা।)

نواقض كلمة التوحيد الفعلية

কালিমাতুত তাওহীদের কর্মগত নাওয়াকিয

কালিমাতুত তাওহীদের কিছু কর্মগত নাওয়াকিয রয়েছে, নিম্নে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো-

(ক) গাইরুল্লাহর জন্য কোনো ইবাদত করা

এটা হলো উলূহিয়্যার ক্ষেত্রে শিরক। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

ثُمَّ  رُدُّوۡۤا  اِلَی اللّٰہِ مَوۡلٰىہُمُ  الۡحَقِّ ؕ اَلَا لَہُ  الۡحُکۡمُ ۟ وَ ہُوَ  اَسۡرَعُ  الۡحٰسِبِیۡنَ ﴿۶۲﴾  قُلۡ مَنۡ یُّنَجِّیۡکُمۡ مِّنۡ ظُلُمٰتِ الۡبَرِّ وَ الۡبَحۡرِ تَدۡعُوۡنَہٗ  تَضَرُّعًا وَّ  خُفۡیَۃً ۚ لَئِنۡ اَنۡجٰىنَا مِنۡ ہٰذِہٖ  لَنَکُوۡنَنَّ مِنَ الشّٰکِرِیۡنَ ﴿۶۳

অর্থ: বলো, আমার নামাজ, আমার ইবাদত, আমার জীবন, আমার মরণ জগতসমূহের রব একমাত্র আল্লাহ্রই উদ্দেশ্যে। তাঁর কোন শরীক নেই, আমাকে এই আদেশই করা হয়েছে এবং আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে আমিই প্রথম।” (সূরা আনআম, আয়াত ১৬২-১৬৩)

শাইখ সুলাইমান ইবনে আব্দুল্লাহ রহ. বলেছেন, চার মাযহাবের উলামায়ে কেরাম এবং অন্যান্য সকলেই ‘মুরতাদের হুকুম’ (ফিকহের কিতাবের) পরিচ্ছেদে বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করবে, অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অন্য কারো ইবাদত করবে, চাই তা যে প্রকারের ইবাদতই হোক না কেন সে কাফের।” (তাইসীরু আযীযিল হামীদ, ১৯৪ পৃষ্ঠা।)

ক্বাযী শাওকানী রহ. বলেন, মৃতদের উদ্দেশ্যে জবাই করা তাদের ইবাদত, তাদের নামে সম্পদের সামান্য অংশও মানত করা কুফর। তাদের সম্মান করা তাদের ইবাদত, যেমনিভাবে কুরবানীর জন্য জবাই করা, মালের যাকাত দেয়া এবং বিনয় অনুগত হওয়া সর্বসম্মতিক্রমে আল্লাহর ইবাদত। যদি কেউ ধারণা করে যে, উভয়টির মাঝে পার্থক্য বিদ্যমান- যেমন আমাদের সামনে কেউ যদি এমন বলে যে, সে মৃতদের আহ্বান, তাদের জন্য জবাই এবং মান্নতের দ্বারা তাদের ইবাদতের ইচ্ছে করে না, তাহলে তাকে প্রশ্ন করো, তবে কেনো তুমি এই কাজ করলে? তোমার রবের আদেশ নাযিল হওয়া সত্ত্বেও মৃতকে আহ্বান করা অবশ্যই তোমার অন্তরের কোন না কোন কারণেই হয়ে থাকবে, যা ব্যক্ত করে তোমার যবান। যদি হাজতের সময় কোন ধরণের আক্বীদা বিশ্বাস ছাড়াই তুমি মৃতদের যিকিরের প্রলাপ বকতে থাকো, তবে তো তুমি বিকারগ্রস্ত। এমনিভাবে যদি তুমি আল্লাহর জন্য পশু জবাই করো এবং মানত করো তবে কোন অর্থে তা মৃতের জন্য উৎসর্গ করলে? এবং তাঁর কবরে নিয়ে গেলে। কেননা দরিদ্ররা তো ভূপৃষ্টের সকল ভূমিতেই বিদ্যমান। তুমি আক্বলমান্দ হলে তোমার কোনো কাজ কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া হতে পারে না।” (আদ দুরারুন নাদ্বীদ ফী ইখলাসি কালিমাতিত তাওহীদ,২০-২১ পৃষ্ঠা।)

(খ) আল্লাহর পরিবর্তে নিজেরা আইন প্রণয়ন

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

أَمْ لَهُمْ شُرَكَٰٓؤُا۟ شَرَعُوا۟ لَهُم مِّنَ ٱلدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَنۢ بِهِ ٱللَّهُۚ وَلَوْلَا كَلِمَةُ ٱلْفَصْلِ لَقُضِىَ بَيْنَهُمْۗ وَإِنَّ ٱلظَّٰلِمِينَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ

অর্থ: না রয়েছে তাদের জন্য কিছু ইলাহ, যারা দ্বীনের মধ্যে এমন বিধান রচনা করে যার অনুমতি আল্লাহ দেন নি।” (সূরা শুরা, আয়াত ২১)

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ্ রহ. বলেছেন, “মানুষ যখন ঐকমত্যপূর্ণর্  হারামকে হালাল বানায় অথবা ঐকমত্যপূর্ণ হালালকে হারাম বানায় কিংবা ঐকমতপূর্ণ আইন পরিবর্তন করে, তখন সে সর্বসম্মতিক্রমে কাফের হয়ে যায়।” (মাজমুউল ফাতাওয়া, ৩য় খন্ড, ২৬৭ পৃষ্ঠা।)

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

أَلَمْ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ ءَامَنُوا۟ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَآ أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوٓا۟ إِلَى ٱلطَّٰغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوٓا۟ أَن يَكْفُرُوا۟ بِهِۦ وَيُرِيدُ ٱلشَّيْطَٰنُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلَٰلًۢا بَعِيدًا

অর্থ: তুমি কি তাদেরকে দেখনি যারা দাবী করে যে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তারা বিশ্বাস করে, অথচ তারা ত্বাগুতের কাছে বিচার প্রার্থী হতে চায় – যদিও ত্বাগুতকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং শয়তান তাদেরকে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়” (সূরা নিসা, আয়াত ৬০)

আল্লামা ক্বাযী শাওকানী রহ. বলেছেন, “এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ঐ সকল ব্যক্তিদের অবস্থা নিয়ে আশ্চর্য বোধ করেছেন, যারা নিজেদের ব্যাপারে দাবী করে যে, তারা রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি অবতীর্ণ কিতাব অর্থাৎ কুরআন এবং পূর্ববর্তী নবীদের ওপর অবতীর্ণর্  কিতাব সমূহের প্রতি ঈমান এনে সমন্বয় সাধন করেছে অথচ তারা এমন কর্মকান্ডে লিপ্ত যা তাদের দাবী খন্ডন ও মূল হতে বাতিল করে দেয় এবং সুস্পষ্ট করে দেয় যে তারা মোটেও তাদের দাবীর ওপর নেই। আর তা হলো ত্বাগুতের কাছে ফায়সালা চাওয়ার ইচ্ছা। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও পূর্ববর্তী নবীদের ওপর অবতীর্ণ কিতাবে ত্বাগুতকে অস্বীকার করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।” (ফাতহুল ক্বাদীর, ২য় খন্ড ১৬৮ পৃষ্ঠা।)

শায়েখ মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম রহ. বলেন, “আল্লাহর এই বাণীতে তাদের ঈমানের দাবীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়েছে। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আনীত দ্বীন ভিন্ন অন্য কোনো দ্বীন বা মতবাদের নিকট বিচার চাওয়া এবং ঈমান একই হৃদয়ে সহাবস্থান করতে পারে না বরং একটা অপরটির বিপরীত।

)الطاغوت(

আত ত্বাগুত শব্দটি নির্গত হয়েছে (الطغيان) আত তুগইয়ান শব্দ থেকে যার অর্থ হলো সীমালঙ্ঘন করা। সুতরাং যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আনীত দ্বীন ভিন্ন অন্য কিছু দ্বারা ফয়সালা করবে সেই ত্বাগুতের ফায়সালা করলো এবং তাগুতের কাছে বিচার কামনা করলো।” (রিসালাতু তাহকীমিল ক্বাওয়ানীন, ২ পৃষ্ঠা।)

শাইখ মুহাম্মাদ আমীন আশ শানকীতি রহ. ত্বাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থীর কুফরি বর্ণনা করে বলেন-

“এ ব্যাপারে সবচেয়ে সুস্পষ্ট দলীল হলো যা আল্লাহ তা‘আলা সূরা নিসায় সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, “যারা আল্লাহর আইন ভিন্ন অন্য আইনে বিচার প্রার্থনা করে, তারা নিজেদেরকে মুমিন দাবী করায় আল্লাহ তা‘আলা আশ্চর্যবোধ করেছেন, এটা কেবলমাত্র এজন্যই যে ত্বাগুতের কাছে বিচার প্রার্থনা করা সত্তে¡ও মৌখিকভাবে তাদের ঈমানের দাবী এমন চুড়ান্ত পর্যায়ের মিথ্যাবাদীতা, যাতে আশ্চর্য না হয়ে পারা যায় না, আর তা রয়েছে আল্লাহ তা‘আলার এই বাণীতে,

أَلَمْ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ ءَامَنُوا۟ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَآ أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوٓا۟ إِلَى ٱلطَّٰغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوٓا۟ أَن يَكْفُرُوا۟ بِهِۦ وَيُرِيدُ ٱلشَّيْطَٰنُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلَٰلًۢا بَعِيدًا

অর্থ: তুমি কি তাদেরকে দেখনি? যারা দাবী করে যে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তাঁরা বিশ্বাস করে অথচ তারা ত্বাগুতের কাছে বিচার প্রার্থী হতে চায়।” (সূরা নিসা, আয়াত ৬০। আদ্বওয়াউল বয়ান, ৪ম খন্ড, ৮৩ পৃষ্ঠা।)

সা’দী রহ. বলেন, “মুনাফিকদের অবস্থা অবলোকনে আল্লাহ তা’আলা আশ্চর্যবোধ করেছেন (যারা দাবী করে যে তারা ‘রাসূলের আনীত এবং পূর্ববর্তী নবীদের আনীত কিতাবের প্রতি বিশ্বাসী) এতদসত্বেও (“তাঁরা ত্বাগুতের কাছে বিচার প্রার্থী হতে চায়) ‘ত্বাগুত হলো প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি- যে আল্লাহর আইন ব্যতীত অন্য আইন দ্বারা বিচার ফায়সালা করে (অথচ তাদেরকে আদেশ দেওয়া হয়েছিল ত্বাগুতকে অস্বীকার করার)। সুতরাং এটা এবং ঈমান কিভাবে একত্র হতে পারে? কেননা ঈমানের দাবী হলো আল্লাহর আইনের প্রতি আত্মসমর্পণ এবং সকল বিষয়ে আল্লাহকেই বিচারক ও বিধানদাতারূপে গণ্য করা। সুতরাং যে নিজেকে মুমিন বলে দাবী করবে, আবার আল্লাহর হুকুমের ওপর ত্বাগুতের হুকুমকে প্রাধান্য দিবে সে ঈমানের দাবীতে মিথ্যাবাদী।” (তাইসীরুল কারীমির রহমান ফী তাফসীরি কালামিল মানান, ১ম খন্ড, ১৮৪ পৃষ্ঠা।)

(গ) মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদেরকে সাহায্য করা

অর্থাৎ মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা, অথবা কাফেরদের পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করা এ সবই কাফেরদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تَتَّخِذُوا۟ ٱلْيَهُودَ وَٱلنَّصَٰرَىٰٓ أَوْلِيَآءَۘ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَآءُ بَعْضٍۚ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُۥ مِنْهُمْۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهْدِى ٱلْقَوْمَ ٱلظَّٰلِمِينَ

অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইহুদী-খ্রিস্টানদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেউ তাদেরকে বন্ধুরুপে গ্রহণ করলে সে তাদেরই মধ্যে গণ্য হবে। আর আল্লাহ জালিম স¤প্রদায়কে হেদায়েত দেন না।” (সূরা মায়িদাহ, আয়াত ৫১)

ইমাম ইবনুল ক্বায়্যিম রহ. বলেছেন, “আল্লাহ তা‘আলা ফায়সালা দিয়েছেন, তাঁর চেয়ে উত্তম ফায়সালাকারী আর কেউ নেই। যে ব্যক্তি ইহুদী খ্রিষ্টানদেরকে বন্ধুরুপে গ্রহণ করবে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। “তোমাদের মধ্যে হতে যে তাদেরকে বন্ধুরুপে গ্রহণ করবে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।”

সুতরাং কুরআনের আয়াত দ্বারা কাফিরদের বন্ধুরা কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত বলে সাব্যস্ত হলো। তাহলে তাদের হুকুমও কাফেরদের মতোই হবে। (আহকামুআহলিয যিম্মাহ, ১ম খন্ড, ৬৭ পৃষ্ঠা।)

যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাতারীদের সাথে যোগদান করেছিলো তাদের ব্যাপারে ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, “যারা তাতারীদের সাথে যোগ দিবে, তাতারীদের অনেকের চেয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাই অধিক যুক্তিযুক্ত। কেননা তাতারীদের মধ্যে কাউকে বাধ্য করা হয়েছে আবার কাউকে বাধ্য করা হয়নি। আর শতঃসিদ্ধ সর্বজন স্বীকৃত মূলনীতি হলো যে আসলী কাফেরের চেয়ে মুরতাদের শাস্তি বিভিন্ন কারণে বেশি ভয়াবহ।”

শায়েখ ইবনে বায রহ. বলেছেন, “উলামায়ে ইসলাম এ ব্যাপারে একমত যে, যে ব্যক্তিই মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফিরদেরকে যে কোনো প্রকারে সাহায্য-সহযোগিতা করবে সেও তাদের মতো কাফের। যেমনটা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تَتَّخِذُوا۟ ٱلْيَهُودَ وَٱلنَّصَٰرَىٰٓ أَوْلِيَآءَۘ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَآءُ بَعْضٍۚ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُۥ مِنْهُمْۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهْدِى ٱلْقَوْمَ ٱلظَّٰلِمِينَ

অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইহুদী খ্রিষ্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, সেও তাদের মধ্যেই গণ্য হবে।” (সূরা মায়িদা, আয়াত ৫১। ফাতাওয়া ইবনুল বায রহ., ১ম খন্ড, ২৭৪ পৃষ্ঠা।)

আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, যেনো তিনি আমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে কালিমার শাশ্বত বাণীর সাথে দৃঢ়পদ রাখেন।

আমীন, আল্লাহুম্মা আমীন।

————

[1] মুহাদ্দিসীনে ক্বিরাম রাহুইয়া (رهويه) এবং আরবী ব্যকরণ শাস্ত্রবিদগণ রাহওয়াইহ উচ্চারণ করে থাকেন

[2] জুহূদ কথা ও কাজের দ্বারাও হতে পারে। কেননা এর তিনটি স্তর রয়েছে।

১। ভিতরে ও বাহিরে জুহূদ বা অস্বীকার। এটা হলো চুড়ান্ত পর্যায়ের কুফুর।

২। বাহিরে অস্বীকার করা অন্তরে নয়। যেমনটা ইহুদীদের মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নবুওয়াতকে অস্বীকার করা। অথচ অন্তরে স্বীকার করতো যে তিনি প্রেরিত নবী।

৩। ভিতরে ভিতরে অস্বীকার করা বাহিরে নয়। যেমন মুনাফিকরা করতো। সুতরাং যে ব্যক্তি এই তিন প্রকারের কোন এক প্রকারে লিপ্ত হবে সে কাফের ।

[3] ‘ইস্তিহলাল’ (হালাল মনে করা) কখনো কথার দ্বারা প্রমাণিত হয় আবার কখনো কাজের দ্বারা। যেমন কোন ব্যক্তি এমন কাজ করল যা সুস্পষ্টভাবে “ইস্তেহলাল” কে প্রমাণিত করে। যেমনটি ইমাম আবু দাউদ রহ. বর্ণিত হাদীসে

এসেছে। ইয়াযীদ বলেন, বারা তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি (বারা) বলেন আমার চাচার সাথে আমার দেখা হলো, তখন তাঁর হাতে একটি ঝান্ডা ছিল তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাচ্ছো?

তিনি বললেন, এক ব্যক্তি তাঁর পিতার স্ত্রীকে বিবাহ করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে পাঠিয়েছেন তাঁর গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার জন্য এবং তাঁর সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য। ইমাম ত্বহাবী (রহ.) বলেন, “ঐ বিবাহকারী যা করেছে, ইস্তিহলালের ভিত্তিতেই করেছে। যেমনটা তারা জাহিলিয়্যাতের সময় করতো। ফলে সে এই কাজের কারণেই মুরতাদ হয়ে গেছে। এজন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ব্যাপারে মুরতাদের ন্যায় আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন।” (শরহু মাআনীল আছার, ৩য় খন্ড, ১৪৯ পৃষ্ঠা।)

শাইখ আব্দুল্লাহ ইবনে নাসির আর রশীদ তাঁর “ইসলাহুল গালাত্বি ফী ফাহমিন নাওয়াকিয” নামক কিতাবে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ পিতার স্ত্রীকে বিবাহকারী ব্যক্তিকে হত্যা এবং তাঁর সম্পদকে তাক্বসীমের (তাক্বসীম হলো তাঁর মালকে ৫ ভাগে ভাগ করে এক ভাগ বাইতুল মালে জমা করা ও বাকী অংশ মুজাহিদদের মাঝে বন্টন করা -অনুবাদক) নির্দেশ দেন। আর এটা হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ থেকে তাঁর ব্যাপারে কুফুরীর হুকুম।

আর তাঁর কুফুরী ইস্তিহলালে আ’মালীর কারণে (ইস্তিহলালে ক্বলবীর কারণে না)। একদল আলেম হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। তাদের মাঝে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) মাসআলাতুল ইস্তিহলালের ব্যাপারে স্বীয় কিতাব “আস সারিমুল মাসলূলের” (৯৭১ পৃষ্ঠা) বলেন, “প্রথমে আপত্তির জবাব, যে ব্যক্তি হারাম কাজ হালাল মনে করবে সে সর্বসম্মতিক্রমে কাফির। কেননা যে কুরআনের হারামগুলোকে হারাম মনে করে না, বস্তুত সে কুরআনের প্রতি ঈমানই আনে নি।

অনুরুপভাবে সেও সর্বসম্মতিক্রমে কাফির যে কুরআনের হারামকে হালাল মনে করে -যদিও সে কাজটি না করে। ইস্তিহলাল হলো, এই বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহ এটাকে হারাম করেন নি। কখনো কখনো ইস্তিহলাল হয় “আল্লাহ তায়ালা এটাকে হারাম করেছেন” এই বিশ্বাস না রাখার কারণে। এটা হয়, “রুবুবিয়্যাহ এবং রিসালাতের প্রতি ঈমানের কমতি থাকার কারণে। এটা শুধুই অবিশ্বাস, যা কোন দলীলের ওপর ভিত্তিশীল নয়। কখনো সে জানে যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো সেটাই হারাম করেছেন, যা আল্লাহ হারাম করেছেন এরপর এটা আঁকড়ে ধরতে অস্বীকৃতি জানায় এবং হঠকারিতা অবলম্বন করে। এটা পূর্বের

চেয়েও মারাত্মক কুফুরি। এটা কখনো তাঁর একথা জানা সত্বেও হয়ে থাকে যে ব্যক্তি এই “তাহরীম বা নিষিদ্ধ করা” আঁকড়ে না ধরবে আল্লাহ তাকে শাস্তি প্রদান করবেন”।

(Visited 42 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two + eighteen =