বোধগম্য কথা বলার অপরিহার্যতা

শায়খ হারিস আন-নাজ্জারি

ডাউনলোড

বিবেক-বুদ্ধির তারতম্যের দিক থেকে মানুষ বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। এটি মানুষের দোষ নয় বরং বিশেষত্ব। মানুষের মাঝে বুদ্ধি এবং বিবেকের ক্ষেত্রে যে পার্থক্য রয়েছে তা আল্লাহ তা’আলাই মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন।

প্রত্যেকই চিন্তাধারার পদ্ধতিতে রয়েছে ভিন্নতা। ব্যক্তির স্বভাবজাত, সত্তাগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক যে যোগ্যতা থাকে তা – তার বোধ-বিশ্বাস এবং চলার পথে ভিন্নতা তৈরি করে। মানুষের স্বভাবজাত যত নিয়ম-পদ্ধতি রয়েছে সবই মূলত আল্লাহর কিতাব, তার রাসূলের সুন্নাহ এবং আল্লাহ প্রদত্ত শরীয়ত নিঃসৃত।

তবে মানুষের কল্পনা, তথ্য গ্রহণ এবং মস্তিষ্কে তথ্য ধারণের পদ্ধতির ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে। তাই প্রত্যেকের জন্য আবশ্যক হল- অন্যদের সাথে এমনভাবে উঠা-বসা ও মেলা-মেশা করা, যাতে তাদের স্বভাব ও বুঝশক্তির ব্যাপারে একটা স্পষ্ট ধারণা আয়ত্ব করা সম্ভব হয়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন – আমরা যেন লোকদের সাথে তাদের বিবেক-বুদ্ধি অনুসারে কথা বলি।

এটি এ কথা বুঝানোর জন্য নয় যে, আমি তার চেয়ে মর্যাদায় বা ইলমে বড় – ফলে আমাকে তার সাথে এমনভাবে কথা বলতে হবে যেন এই নিম্ন-পর্যায়ের লোকটি তা বুঝতে পারে। বিষয়টা মোটেও এমন নয়। বরং এই নির্দেশনা এই জন্য দেয়া হয়েছে যেন একজন মানুষ অপরজনের বোধ-বুদ্ধি, পরিবেশ, তথ্যগ্রহণ এবং সংরক্ষণের ভিন্নতার প্রতি লক্ষ্য রাখে।

সুতরাং বুঝা গেল মানুষ তথ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিবেশ, বোধ এবং বিবেকের দিক থেকে ভিন্ন-ভিন্ন হয়ে থাকে।

ইমাম বুখারী রহ. তার সহীহ বুখারীতে একটি অধ্যায় এনেছেন যার শিরোনাম হল –

“باب مَن ترك بعض الاختيار مخافة أن يقصر فهم بعض الناس عنه فيقعوا في أشد منه”

“কোন মুস্তাহাব কাজ এ আশঙ্কায় ছেড়ে দেয়া যে, কিছু কম মেধাবী লোক ভুল বুঝে তার কারণে আরও অধিকতর বিভ্রান্তিতে পড়বে”। তারপর তিনি আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত একটি হাদিস এনেছেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,

يا عائشة لولا قومك حديثٌ عهدهم -قال ابن الزبير: بكفر- لنقضت الكعبة فجعلت لها بابين، باب يدخل الناس وباب يخرجون

 “হে আয়েশা! তোমার জাতি যদি নবাগত মুসলিম না হত তবে আমি কা’বা ভেঙ্গে তার দু’টি দরজা বানাতাম। এক দরজা দিয়ে লোকেরা প্রবেশ করতো আরেক দরজা দিয়ে লোকেরা বের হতো। (ইবনে যুবায়ের বলেন, কুফর থেকে নবাগত)

এমনটাই ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাজ। তিনি সাধারণ মানুষের বোধ-বুদ্ধির বিবেচনা করে কাজ করতেন। তিনি কোন কোন মুস্তাহাব কাজকে ছেড়ে দিয়েছেন শুধুমাত্র মানুষের অবস্থা বিবেচনা করে। ইমাম বুখারী রহ. অনুরূপ মর্মার্থের আরেকটি অধ্যায় নিয়ে এসেছেন, যার শিরোনাম-

“باب مَن خصَّ بالعلم قومًا دون قوم كراهية ألَّا يفهموا”

অর্থ -“ইলমি কিছু বিষয় কিছু লোকদেরকে বলা এবং অন্য লোকদেরকে না বলা – এই আশংকায় যে, তারা হয়তো বুঝতে পারবে না” । তারপর তিনি হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর একটি কথা উদ্ধৃত করেন,

حدِّثوا الناس بما يعرفون، أتحبّون أن يُكذَّب الله ورسوله؟!

“মানুষের নিকট সে ধরনের কথা বল যে ধরণের কথা মানুষ বুঝতে পারে। তোমরা কি পছন্দ কর যে, আল্লাহ এবং তার রাসূলের বিরুদ্ধে মিথ্যা আরোপ করা হোক?

এর স্বপক্ষে উদাহরণ হল – ইমাম মুসলিম রহ. তার কিতাবে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন- প্রথমটি: হযরত আলী ইবনে আবি তালিব থেকে, আর এই দ্বিতীয়টি: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে- তিনি বলেন,

“ما أنت بمحدِّثٍ قومًا حديثًا لا تبلغه عقولهم إلا كان لبعضهم فتنة”

“যদি তুমি কোন গোত্রের লোকদের সাথে এমনভাবে কথা বল যা তারা বুঝতে পারে না, তাহলে তোমার এ কথা তাদের কতককে ফেতনায় ফেলে দিবে”।

আমার এই কথাগুলোর উদ্দেশ্য হল- মানুষকে কি বলতে হবে, কখন বলতে হবে, কিভাবে বলতে হবে সেবিষয়ে একটু সতর্ক করে দেয়া। এ বিষয়ক কিছু জ্ঞান আমার কাছে আছে – যা আমি সকলের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। মানুষকে অপরজনের বুঝ অনুযায়ী কথা বলতে হবে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হল-

(ক) উপযুক্ত শব্দ চয়ন করা।

(খ) উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করা।

(গ) যার সাথে কথা বলছি তার অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখা। যদি লক্ষ্য না রাখি, তাহলে এ-কথাটি ফেতনা সৃষ্টি করতে পারে।

কখনো সঠিক কথাটি উল্টোভাবে বুঝার কারণে আমার প্রতি তার বদ-ধারণা তৈরি হতে পারে। অথবা আমার বলা কথা বা বিষয়টি সে এমনভাবে কার্যকর করতে পারে – যা আমি কখনো চাইনা। অথবা সে তার বিবেক-বুদ্ধির কমতির কারণে – এ সমস্ত আশ্চর্যজনক তথ্য জেনে সন্দেহে পড়ে যাবে।

তাই বিবেক এবং বুঝ শক্তির বিবেচনা করে কথা বলা সকলের সাথে সম্পর্ক রক্ষা এবং শিক্ষা দানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এ বিষয়ে উস্তাদ আব্দুল্লাহ আল-আ’দম বলেন-

শরিয়তের চাহিদা হল মানুষের সাথে এমনভাবে কথা বলা উচিৎ – যা তার মস্তিষ্ক অনুধাবন করতে পারে, তার বুঝ শক্তি আয়ত্ব করতে পারে এবং তার অন্তর উপলব্ধি করতে পারে। সন্দেহাতীতভাবেই এটি একটি কাঙ্ক্ষিত বিষয়। কোন কোন আলেম মানুষের সাথে এমনভাবে কথা বলাকে হারাম সাব্যস্ত করেছেন – যা মানুষ বুঝে না। আবার কেউ কেউ – লোকদেরকে এমন কোন বিষয় বলা যা লোকেরা বুঝে না বরং বিষয়টি তাদেরকে ফেতনায় ফেলে দেয় – এমন কথা বলাকে হারাম বলে ঘোষণা করেছেন। নিশ্চয়ই এটা হারামের অন্তর্ভুক্ত।

আলেম-উলামাদের এমন কথাকে(যা লোকেরা বুঝে না) হারাম বলে ঘোষণার কারণ হল – তারা আশংকা করেছেন যে, এর দ্বারা লোকেরা ফেতনায় পড়বে এবং কথাকে এমন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করবে যা কখনোই কাম্য নয়। অথবা কথাকে এমন কোন উদ্দেশ্যে চালিয়ে দিবে যা মূল উদ্দেশ্য ছিল না।

হাম্বলি মাযহাবের একজন ইমাম ইবনে আকিল রহ. বলেন, শ্রোতাকে এমন ইলম দেয়া হারাম যা সে গ্রহণ করতে পারবে না। এ কারণে যে, হতে পারে এটি তাকে ফেতনায় ফেলে দিবে।

ইমাম ইবনুল জাওযী রহ. বলেন, (তিনি ইবনুল কায়্যিম জাওযিয়া নন বরং তিনি আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী রহ.) এমন কোন বিষয় লেখা বা বলা উচিৎ নয় – যা সাধারণ মানুষ বুঝবে না।

ইবনে আকিল রহ. বললেন – হারাম, আর ইবনুল জাওযী বললেন – উচিৎ নয়। অতএব বুঝা গেল – উত্তম হল এমন বিষয় বর্জন করা।

মোট কথা – তথ্য পৌছানোর ক্ষেত্রে এবং মানুষের সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে আবশ্যক হলো শ্রোতার অবস্থার প্রতি খেয়াল রাখা। তথ্য পৌঁছে দেয়াই মূল উদ্দেশ্য নয়। বক্তার কাছে অনেক সময় এমন অনেক কথা বা তথ্য থাকে যা তার দৃষ্টিতে মানুষের কাছে পৌঁছানো অনেক গুরুত্বের দাবী রাখে। হ্যাঁ বাস্তবেও হয়তো তা অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং মানুষের কাছে পৌঁছানোর প্রয়োজন রয়েছে। তবে তার পদ্ধতি কি হবে? কোন সময় তা পৌঁছানো হবে? মানুষের সামনে বিষয়টি উপস্থাপনের জন্য কেমন শব্দ চয়ন করা হবে?

যেহেতু আমি মানুষের হেদায়েত চাই, মানুষকে ফেতনায় ফেলতে চাই না – তাই আমি তাদের কাছে এমন তথ্য পেশ করবো যার দ্বারা তারা হেদায়েত পাবে। এমন তথ্য পেশ করবো না যার দ্বারা তারা ফেতনায় পড়বে। আল্লাহর প্রতিটি বান্দার জন্য উচিৎ এ বিষয়টি বিবেচনা করা। আর এটাই শরিয়তের আদেশ।

কিভাবে এটা অর্জন হবে?

এটা অর্জন হবে উলামাদের সাথে পরামর্শ করার দ্বারা। কখনো এমন হতে পারে যে – আমার নিকট ইলম আছে ঠিক, কিন্তু আমার নিকট কোন অভিজ্ঞতা ও তথ্য নেই। কিন্তু একজন আলেমের কাছে রয়েছে দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতার ভান্ডার। তিনি এমন অনেক অবস্থা সম্পর্কে জানেন, যা আমি জানি না। তাই তার সাথে পরামর্শ করতে হবে।

অনেক আলেম হয়তো তোমাকে বলবেন – ‘তোমার জন্যে এটা এখন বলা উচিৎ নয়’ অথবা ‘তুমি তাকে বল তার এই আচরণ অমুকের মত অথবা অমুক দলের মত’। তাই এসকল ক্ষেত্রে আহলে ইলম ও ইলমের অধিকারীদের সাথে পরামর্শ করতে হবে। আর এর মধ্যেই অনেক কল্যাণ ও উপকারীতা রয়েছে।

আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রার্থনা করি তিনি যেন আমাদেরকে তারই ইবাদত করার তাওফিক দান করেন এবং তার নাফরমানি থেকে হেফাজত করেন।

والحمد لله رب العالمين والسلام عليكم ورحمة الله وبركاته

(Visited 58 times, 1 visits today)