ইসলামী শাসন একটি সুস্পষ্ট বিষয়; এতে কোন অস্পষ্টতা নেই

উস্তাদ সাদাত চারখী হাফিযাহুল্লাহ

ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা পুন:প্রতিষ্ঠার জন্য যারা জিহাদ করছেন এবং শাহাদাতবরণ করছেন তাদের জন্য সুসংবাদ, আর যারা গণতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্রের জন্য যুদ্ধ করছে এবং নিহত হচ্ছে তাদের জন্য দুখ:বোধ করছি।

ইতিহাস প্রমাণ করে প্রত্যেক অত্যাচারী, সীমালঙ্গনকারী এবং দখলদারদের সমাধিস্থল হলো আফগানিস্তান। আফগানজাতি ‘ইসলামের তরবারি’ তথা জিহাদের মাধ্যমে তাদের পরিচয় অক্ষুন্ন রেখেছে এবং বৈশ্বিক সুপার পাওয়ারদের ধূলিসাৎ করে নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষা করেছে।

আলহামদুলিল্লাহ ইমারাতে ইসলামিয়ার মুজাহিদদের ত্যাগ ও সীমাহীন কুরবানীর কারণে আজ ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের জাহাজ এ ভূমিতে নতুন করে আবার নোঙ্গর করেছে।

যদিও দুর্ভাগ্যবশত; ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ, যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর পালিত কিছু বুদ্ধিজীবী এবং কিছু অসভ্য দাস, ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে অস্পষ্ট ও মুর্খতা বলে টিভিতে প্রচার করছে। এদের উদাহরণ হলো চামচিকার মতো যারা দিনের আলোয় সূর্যের আলো দেখতে পায় না।

ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা কুরআনুল কারীমের নিম্নোক্ত মূলনীতির আলোকে প্রতিষ্ঠিত।

আল্লাহ তায়ালা বলেন;

إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ یقُصُّ الْحَقَّ وَهُوَ خَیرُ الْفَاصِلِینَ

“আল্লাহ ছাড়া কারো নির্দেশ চলে না। তিনি সত্য বর্ণনা করেন এবং তিনিই শ্রেষ্ঠতম মীমাংসাকারী”। (সুরা আনআম-৫৭)

সুতরাং ঐ আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কারো কোন আদেশ চলবে না, যিনি সঠিক আদেশ দেন এবং তিনিই সর্বোত্তম শাসক। অর্থাত তিনি ছাড়া আরো কারো আদেশ নিষেধ চলবে না।  অর্থাৎ সৃষ্টি জগত, তাকওয়ীনি জগত এবং শরয়ী বা দ্বীনি বিধি–বিধান সকল ক্ষেত্রেই আদেশ চলবে একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার।

এ বিষয়ের প্রতি ‍গুরুত্ব দিয়ে আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা বলেন; তিনি সত্যকে মিথ্যা থেকে পৃথক করেছেন এবং তিনিই সত্যকে মিথ্যা থেকে উত্তম পৃথককারী।  ইরশাদ হয়েছে;

يَقُصُّ الْحَقَّ وَ هُوَ خَيْرُ الْفاصِلِينَ

“তিনি সত্য বর্ণনা করেন এবং তিনিই শ্রেষ্ঠতম মীমাংসাকারী”। (সুরা আনআম-৫৭)

 কারণ; যিনি সবচে বেশি জ্ঞানী এবং যিনি জ্ঞান প্রয়োগ করার সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান, তিনিই হবেন সত্যকে মিথ্যা থেকে শ্রেষ্ঠ পৃথককারী। হুকুম শব্দটি এখানে হুকুমত অর্থে এসেছে। এর দ্বারা বিচার বিভাগও বুঝানো হয়। কাজেই রাস্ট্র ও বিচার বিভাগ সম্পর্কীয় বিষয়াদি একমাত্র আল্লাহ তায়ালার কর্তৃত্বের অধীন। কারণ তিনিই এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা, মালিক এবং শাসক। তাই সকল ধরণের কর্তৃত্ব এবং সার্বভৌমত্ব তার জন্য সীমাবদ্ধ।

মনে রাখতে হবে ইসলামী সরকার ব্যবস্থাপনায় কোন অস্পষ্টতা নেই। ইসলামী সরকার ব্যবস্থা হলো; এমন আইনের শাসন, যে আইনের সার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্যই নির্ধারিত। তাই ইসলামী আইন বলতে আল্লাহ তায়ালার হুকুম ও তার কর্তৃত্বপরায়ণতাকেই বুঝনো হয়। ইসলামী আইন বা আল্লাহ তায়ালার আদেশ রাস্ট্রের সকল ব্যক্তি ও কর্মচারীর উপর প্রযোজ্য হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুরু করে খোলাফায়ে রাশেদা পর্যন্ত রাষ্ট্রের সকল ব্যক্তিবর্গ এই ইসলামী হুকুমতের বিধানে অধিনেই ছিলেন।

বর্তমানের প্রচলিত সকল সরকার ব্যবস্থা ও প্রশাসনের থেকেও ‘ইসলামী সরকারের’ সংজ্ঞা ও পরিচয় সবচে’ অর্থবহ এবং সুষ্পষ্ট। এতে কোন অস্পষ্টতা নেই। যারা বলছে যে ইসলামী সরকার ধারণার মধ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে, তালেবানরা যা পুনরুদ্ধারের জন্য লড়াই করছে, তারা আসলে চামচিকার মতে। দ্বীনে ইসলাম এবং এর বিধানাবলী সমৃদ্ধ ইসলামী রাষ্ট্রকে যারা অস্পস্টতা বলে উড়িয়ে দিতে চায়, আমরা তাদেরকে চোখের ডাক্তার দেখানোর পরামর্শ দেব।

যেহেতু দীন হিসেবে ইসলামে কোন অস্পষ্টতা নেই, তাই এর রাষ্ট্র ধারণা ও এর শাসন ব্যবস্থায়ও কোন অস্পষ্টতা থাকতে পারেনা। ইসলামী সরকার হল এমন দ্বীনি বা ধর্মীয় সরকার, যা মুসলিম সমাজে গড়ে উঠে ধর্মের স্তম্বের উপর ভিত্তি করে। ইসলাম আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে দেয়া একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীন। এতে মানুষ কীভাবে তার জীবন পরিচালনা করবে তা পরিপূর্ণভাবে শিখানো হয়েছে। আর ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা মানুষের জীবনেরই অংশ। তাই মানুষের জীবনের অংশ হিসেবেই ‘সরকার ব্যবস্থাপনা’ গড়ে তোলার জন্য জরুরী হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশনার অনুসরণ করা। এটি একটি অবশ্যম্ভাবী বিষয়।

অন্য কথায়, ইসলাম একটি দ্বীন, একটি আদর্শ এবং একটি আইডিওলজি। মানুষ কিভাবে তাদের জীবনকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে গড়ে তুলবে ইসলামে এর পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা দেয়া আছে। কাজেই ইসলামী হুকুমতের প্রয়োজনীয়তা এখানেই যে, প্রথমত বিচারক এবং দায়িত্বশীলগণ ইসলামী শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে অবগতি লাভ করবেন; অত:পর তার মাধ্যমে সমাজের মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিবেন এবং যাবতীয় অন্যায়, বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করবেন। বিশৃঙ্খলা এবং যাবতীয় নৈরাজ্য প্রতিহত করবেন। পাশাপাশি আইন ও এর প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের সকল কাজে ইসলামের সীমা রক্ষা করতে সাহায্য করবেন।

 কতক আলিম ইসলামী সরকারকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন যে’

“ইসলামী সরকার বলা হয়, এমন সরকার ব্যবস্থাপনাকে, যেখানে মানুষের যাবতীয় মূল্যবোধ, রাজনৈতিক জীবন, রাজনৈতি ব্যবস্থাপনার কাঠামো এবং সমাজের সর্বস্তরের পরিচালনার বিষয়গুলো ধর্মের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হবে।”

আবার অনেকে ইসলামী শাসন ব্যবস্থাকে সজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে যে,

ইসলামী সরকার ব্যবস্থা হলো; এমন আইনের শাসন, যে আইনের সার্বভৌম কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্যই নির্ধারিত। আর ইসলামী আইন বলতে আল্লাহ তায়ালার হুকুম ও তার কর্তৃত্বপরায়ণতাকেই বুঝনো হয়। ইসলামী আইন বা আল্লাহ তায়ালার আদেশ রাস্ট্রের সকল ব্যক্তি ও কর্মচারীর উপর সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। আরো সহজভাবে বললে বলতে হয়; ইসলামের সরকার মানে এমন সরকার যেখানে সকল সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহ তায়ালার।

সার্বভৌমত্ব দুই প্রকার:

(ক) ‘তাকবিনী’ তথা বৈশ্বিক সৃষ্টি ও ব্যবস্থাপনাগত সার্বভৌমত্ব।

(খ) ‘তাশরীঈ’ তথা আইন ও শাসকগত সার্বভৌমত্ব

 (حاکمیت تکوینی) বা তাকবিনী সার্বভৌমত্ব বলা হয় মহাবিশ্ব এবং এর সৃষ্টিগত সকল কর্তৃপরায়ণতাকে। আর মানুষের উপর প্রয়োগের জন্য নির্ধারিত আইন ও বিধানের সাথে সম্পর্কিত সার্বভৌমত্বকে আইনী সার্বভৌমত্ব তথা (حاکمیت تشریعی) বলে।

এই উভয় সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহ তায়ালা জন্যই নির্ধারিত। আল্লাহ তায়ালাই সকল ক্ষমতার উৎস এবং ইসলামী আইনই আইনের একমাত্র উৎস। কেননা খালকিয়াত, রুবুবিয়্যাত, এবং হক্কানিয়াতের অধিকার একমাত্র আল্লাহ তায়ালা জন্যই নির্ধারিত। তাই সকল আইন প্রণয়ের অধিকার একমাত্র আল্লাহ তায়ালা জন্যই সংরক্ষিত।

অন্যদিকে প্রজাতন্ত্র এবং গণতন্ত্রে আইন প্রণয়নের অধিকার জনগণ এবং মানুষের জন্য সংরক্ষিত। আধুনিক ব্যবস্থাপনা গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করা হয়, আইন তৈরী ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘নাগরিকদের অধিকার’ এর স্বীকৃতির মাধ্যমে। কিন্তু ইসলামী ব্যবস্থাপনায় আইন প্রণয়ণ ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে জনগণের ক্ষমতার বা সার্বভৌমত্বের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই।

তাকবীনি সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে কোন সৃষ্টির জন্য সৃষ্টিগতভাবেই আল্লাহ তায়ালার কর্তৃত্ব ও ইচ্ছার লঙ্ঘন করা সম্ভব নয়। কিন্তু তাশরীঈ ব্যাপারটা এমন নয়। মানুষদেরকে আল্লাহ তায়ালা যেসব হুকম দিয়েছেন পালন করার জন্য এ ক্ষেত্রে সৃষ্টিগতভাবে মানুষের তার বিপরীতে অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা রয়েছে। যার সুযোগে মানুষ আল্লাহ তালায়ার আইন বর্জন করে থাকে। (যদিও তাকে তার অনুমোদন দেয়া হয়নি)। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলাম মানুষের স্বভাবজাত সক্ষমতার কথা স্বীকার করে। এর অর্থ হচ্ছে মানুষ নিজেরাই সংগঠন তৈরী করতে পারে। তারপর এর মাধ্যমে আইন প্রণয়ণ, প্রয়োগ, আদেশ, নিষেধসহ অন্যান্য বিষয়াদিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। (যদিও বর্তমানে মানুষের মাঝে প্রকৃত অর্থে এই অধিকারও নেই)। এবং কর্তৃত্ববাদী রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে।

অনেক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক সরকারের মতো ইসলামী সরকারগুলিরও তিনটি বিভাগ রয়েছে; উপদেষ্টা, নির্বাহী এবং বিচার বিভাগ। ইসলামী হুকুমাত মোটাদাগে এই তিনটি বিভাগেই কাজ করে। এবং তিনটি বিভাগের সকল কর্তৃত্ব আল্লাহ তায়লার জন্য স্বীকৃত।

যাইহোক, আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত, ‘ইসলামী সরকারের’ রাষ্ট্রধান এবং অন্যান্য বিভাগের কর্মকর্তা হওয়ার জন্য অনেকগুলো শর্ত রয়েছে; যদি কেউ সেই শর্ত পূরণ না করেন তবে, তিনি রাষ্ট্রপতি তো দূরের কথা, এর প্রার্থীও হতে পারেন না। ইসলামী সরকার ব্যবস্থা এমন নয় যে, যে কোন ফাসিক, বিশ্বাসঘাতক, জাতীয়তাবাদী, নফস পুজারী, প্রতারক, জনগণের ভোটের উপর নির্ভর করে এবং নিজেদের মনমতো করে সরকার প্রধান হওয়ার অধিকার রাখে।  ইসলামী আইনে এর কোন বৈধতা নেই। তাই যে ব্যক্তি ইসলামী সরকারের প্রধান হতে চায় তাকে অবশ্যই তাকওয়া, ধর্মপরায়ণতা, ন্যায়বিচার এবং ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত প্রয়োজনীয় মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে। এবং যে ব্যক্তি ইসলামী সমাজকে ইসলামের দিকে পরিচালিত করতে চায় তাকে অবশ্যই ইসলামকে জানতে হবে এবং এর উপকারিতা সম্পর্কে পরিপূর্ণ সচেতন হতে হবে।

আমরা বর্তমান আধুনিক সরকার (গণতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্র) এবং ইসলামী সরকারের মধ্যে পার্থক্যের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ এভাবে দিতে পারি যে, প্রজাতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা মানুষের জন্য মানুষের শাসন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করে এবং তা মানুষের কাছ থেকেই বৈধতা গ্রহণ করে। এটি একটি প্রতিষ্ঠিত বিষয় যে, এ মতবাদে শুধুমাত্র ইহজাগতিক উন্নতি ও অগ্রগতির কথাই চিন্তা করা হয়। এ ধরনের ব্যবস্থায়, আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করা হয়।

কিন্তু ইসলামী সরকারে, সার্বভৌমত্বের অধিকার একমাত্র আল্লাহ তায়ালার। এবং ইসলামী সরকারের অনুমোদন নেয়া হয় ইসলামী শরীয়াত থেকে, মানুষের থেকে নয়।  ইসলামী সরকার ব্যবস্থাপনা ইহজাগতিক এবং আধ্যাত্মিক উভয় দিকেই মনোযোগ দেয়। এখানে আল্লাহ তায়ালার জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ের অধিকার সংরক্ষিত রেখে মানুষ ও বস্তুজগতকে তার বিধানের অনুসারী করে রাখা হয়। অন্যদিকে মানর্বীয় মতাদর্শ গণতন্ত্রের সরকার ব্যবস্থায় মানুষের ক্ষমতাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রেখে অন্য সব কিছুকে এর অধিনে পরিচালিত করা হয়।

আমরা ভবিষ্যতের কোন লেখায় এই উভয় দর্শনের কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করব। ইনশাআল্লাহ

পরিশেষে, আমরা সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ার কাছে প্রার্থনা করি যে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, আমাদের দেশের নিপীড়িত জাতি তাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন অর্জন করবে এবং এই ভূমিতে একটি বিশুদ্ধ ইসলামী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে।

وما ذلک علی الله بعزيز

 

 

 

 

(Visited 90 times, 1 visits today)