রণশক্তির ভারসাম্যতা!

শায়খ আবু উবাইদা আল-কুরাইশী

(ইসলাম ও কুফরের মাঝে চলমান এ যুদ্ধে মুজাহিদদের অবস্থান এবং তাদের সামরিক সক্ষমতার তুলনামূলক বিশ্লেষণ।)

নিউইয়র্ক এবং ওয়াশিংটন হামলার পর  মিডিয়া পাড়ায় এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে মুজাহিদদের নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই দুই বরকতময় হামলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মুজাহিদদের সাথে আল্লাহ তায়ালার বিশেষ সাহায্য এবং রহমত ছিল।

একটি উর্ধ্বগামী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে আন্তর্জাতিক যুদ্ধক্ষেত্রে আল-কায়েদার এই আকস্মিক উত্থানে (যারা আল-কায়েদার গড়ে উঠার ইতিহাস জানে না তাদের জন্য আকস্মিক’) বিশ্বের সাধারণ মানুষসহ আন্তর্জাতিক রাজনীতির অঙ্গনগুলোর ভড়কে উঠাই স্বাভাবিক।

কারণ, বছরের পর বছর ধরে আমেরিকার নুন খেয়ে দাজ্জাল মিডিয়াগুলো পৃথিবীবাসীর সামনে আমেরিকার কল্পিত শক্তির মিথ্যা স্তম্ভ নির্মাণ করে রেখেছে তাই পুরো পৃথিবী মুজাহিদদের এই মোবারক হামলা নিয়ে দ্বিধা সংশয়ে ভুগলেও, এটাকে অস্বীকার করলেও আমাদের অবাক হবার কিছু নেই।

কিন্তু সবচাইতে বেদনায়ক ও দুঃখজনক বিষয় হলো, যখন দেখি  কিছু কিছু ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এই হামলার ব্যাপারে দায়িত্বজ্ঞানহীন বিশ্লেষণসহ ঘৃণ্য মন্তব্য করছে। তাদের উচিৎ ছিল, মানসিকভাবে নেতিয়ে পড়া উম্মাহকে এই মোবারক হামলার সুসংবাদ শুনিয়ে উজ্জীবিত করা তা না করে তারা উম্মাহর মনোবল বিনষ্টকারী, মুজাহিদদের হৃদয় বিদীর্ণকারী বক্তব্য একের পর এক দিয়েই যাচ্ছে।

এর কারণ কি এটাই যে, উম্মাহর মাঝে জিহাদী চেতনার যে অপ্রতিরোধ্য স্রোত শুরু হয়েছে, তা তারা সহ্য করতে কিংবা মানতে চাইছে না …? এবং এই জিহাদী উম্মাহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হইচই ফেলে দেবার মতো কোনো ঘটনা ঘটাতে পারে, ইতিহাস রচনা করতে পারে তা তাদের  মস্তিষ্কে ধরছে না?

মোটকথা (৯/১১) এর মহান ঘটনার মধ্য দিয়ে (মুজাহিদদের যে অবিস্মরণীয় বিজয়) অর্জিত হয়েছে তাতে অবাক হবার কিছুই নেই। কারণ, এ বিজয় এসেছে বহু ত্যাগ আর কোরবানীর পর। শুধু বসে থেকে, আত্মত্যাগপূর্ণ সংগ্রাম ছাড়া পৃথিবীতে কোনো ধর্ম, কোনো আদর্শই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। দ্বীন তাদের দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত হয়; যাদের কর্মপন্থায় সামগ্রিকতা ও সমন্বয়তা রয়েছে।

কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, যুগ যুগ যাবৎ ইসলামী দলগুলো আদ দাওয়া আল ইসলামীয়ার সর্বোচ্চ লক্ষ্য (আল্লাহর যমীনে আল্লাহর বিধান কায়েম ও আল্লাহর বান্দাদেরকে আল্লাহর শাসনে পরিচালিত করা) অর্জনের সঠিক ও কার্যকরী পথগুলো ভুলে রয়েছে।

তবে বিগত দশকগুলোতে ইসলামী জাগরণ এমন কিছু আত্মোৎসর্গকারীও পেয়েছে, যাঁরা বাতিলের সামনে মুসার লাঠির ভূমিকা পালন করছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, এই উম্মাহরই অপর অনেক গুনীজন এদের বিরোধিতা করাকেই নিজেদের দ্বীনি দায়িত্ব জ্ঞান করছে এবং দ্বীন কায়েমের আল্লাহ প্রদত্ত ত্বরীকা নিয়ে উম্মাহর মাঝে সমূহ সংশয় ছড়িয়ে যাচ্ছে। (আলইয়াজু বিল্লাহ)

ইনশা আল্লাহ, আজ আমি সে সকল দ্বীনি ভাই ও গুণীজনদের সমীপে এমন কিছু বিষয় তুলে ধরবো; যা তাদের চিন্তার রুদ্ধদ্বার খুলে দিবে।

সকল দ্বিধা সংশয়ের ময়লা ঝেড়ে পবিত্র কাফেলায় শরীক হবার আলোকিত পথ উম্মোচিত করবে। কারণ, সংশয়ের গ্যাড়াকলে আবদ্ধ থেকে কালক্ষেপনের মত সময় আমাদের হাতে নেই। ক্রুসেডার বাহিনী সমগ্র শক্তি একত্রিত করে আমাদের  দুয়ারে এসে উপস্থিত।

খিলাফতে ইসলামিয়ার পতনের পর হতে প্রত্যেক দশকেই অনেক ধরনের ইসলামী আন্দোলনের শ্লোগান তোলা হয়েছে। যদিও সাময়িকভাবে সে আন্দোলনগুলো যুগোপযোগী মনে হয়েছিল, কিন্তু বর্তমান বিশ্ব প্রমাণ করে দিয়েছে যে, তার কোনটাই সার্বজনীন এবং বাস্তবমুখী ছিল না।

সে চিন্তাগুলো ছিল অনেকটাই কাল্পনিক ও অযৌক্তিক। সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে শক্তি অর্জনের যে কোরআনী নির্দেশনা মুসলমানদেরকে দেওয়া হয়েছে, তা বেমালুম ভুলে থাকা হয়েছে।

অধিকন্তু ‘যুগের  বিবর্তন’ এবং ‘স্থান পরিবর্তন’ এই দুটি বিষয় যে কোন যুদ্ধনীতির দুই বাহুমূলের ন্যায়। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের নেতারা এই দু’টি বিষয়ের প্রতিও তেমন দৃষ্টি দেয়নি।

ফলস্বরূপ, গন্তব্যহীন দিশেহারা পথিকের নিস্ফল পথ মাড়ানো ছাড়া আমাদের ভাগ্যে আর বেশি কিছু জোটেনি।

এর চাইতেও দুঃখজনক কথা হলো, প্রতিটি দলই ধারণা করে বসেছিল যে, তারা অন্যদের চাইতে অগ্রগামী ও শ্রেষ্ঠ। হয়তো প্রতিষ্ঠাকাল বিচারে, অথবা সদস্য সংখ্যার আধিক্য হিসেবে, কিংবা স্বভাবজাত অহমিকার কারণে। এভাবে পারস্পরিক উন্নাসিকতার কারণে কাঙ্খিত সর্বোচ্চ লক্ষ্যে পৌছাঁর পথে নিজেদের ত্রুটিপূর্ণ জায়গাটি চি‎হ্নিত করতে সবাই ব্যর্থ হয়েছে।

আল্লাহর নির্দেশিত সরল-সোজা পথ বাদ দিয়ে প্রত্যেকেই নিজস্ব চিন্তার আঙ্গিকে পরিশ্রম করে যাচ্ছিল । এ পথে সমূহ দুঃখ কষ্ট-ক্লেশ মাথা পেতে নিচ্ছিল। সবাই নিজ নিজ লায়লার প্রেমে কবিতা আবৃতিতে মত্ত ছিল। দিন দিন শতধা বিভক্তির ধারা ক্রমশ বাড়ছিল।

এতসব প্রচেষ্টা মেহনত সত্ত্বেও উম্মাহর ক্ষত গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছিল। এভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না, তাই ঐশী অমোঘ নীতি  “সুন্নাতুল ইসতিবদাল” (এক জাতিকে বাদ দিয়ে আরেক জাতিকে নিয়ে আসা) প্রকাশ পেল।

আরেকটি নতুন ইসলামী প্রজন্ম তৈরী হল। যাঁরা আল্লাহর নির্দেশ হুবহু পালনে বদ্ধ পরিকর। যদিও তাঁদের উত্থান পরিক্রমা দুই দশক যাবৎই চলছে। তবে গত ২৯শে ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার এক মোবারক দিনে পুরো বিশ্ব স্বচক্ষে তাঁদেরকে প্রত্যক্ষ করল।

এটি একটি স্বতঃসিদ্ধ বিষয় যে, ইসলামী খিলাফতের পুনরুদ্ধার হোক কিংবা স্বল্প পরিসরে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হোক, কোনটাই সহজসাধ্য ব্যাপার নয়।

শক্তি অর্জন এবং শক্তি প্রয়োগ ছাড়া তার বাস্তবায়ন কখনোই সম্ভব নয়। কিছু মানুষ শক্তির অর্থ নির্ধারণেও ভুল করে। তারা আত্মিক শক্তিকেই এক্ষেত্রে যথেষ্ট মনে করে।

অথচ ইসলামী শাসন বাস্তবায়ন এবং শত্রুর আক্রমন থেকে তা সুরক্ষার জন্য কোরআন আমাদেরকে যে শক্তি অর্জনের নির্দেশ দিয়েছে, তা সামরিক ও বাহ্যিক শক্তি বৈ অন্য কিছু নয়। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

وَأَعِدُّوا لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ وَمِن رِّبَاطِ الْخَيْلِ ﴿الأنفال: ٦٠﴾

“আর প্রস্তুত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যা কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থ্যের মধ্যে থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে।” (সূরা আনফাল: ৬০)

আমি মনে করি ইসলাম পুনরুত্থানের পথে সর্বোচ্চ ভুল এবং পদস্খলনের জায়গাটি হলো এই ‘শক্তিদর্শন’। আসলে শক্তি  কী? তা কীভাবে  অর্জিত হবে? কীভাবে  তা কাজে লাগানো যাবে?

এই বিষয়টি নিয়ে প্রত্যেক জাতির সমরবিদরা প্রচুর  গবেষণা করেছে, যাতে স্বজাতিকে আরো উর্ধ্বে ও আরো মর্যাদাপূর্ণ স্থানে নিয়ে যেতে পারে। আজ আমরা এ জাতীয় কিছু গবেষণার দিকে নজর দিতে চাই। বিজাতির গবেষণায় নজর দেওয়া কি ঠিক?

এমন প্রশ্নের জবাবে বলব- কোনো জ্ঞান যদি ইসলামী মূলনীতির বিরোধী না হয়, তাহলে তা থেকে ফায়দা নিতে কোন মানা নেই। কারণ, হাদিসে বর্ণিত হয়েছে- প্রজ্ঞা, সে তো মু’মিনের হৃত সম্পদ, যেখানেই সে পাবে তাকে কাজে লাগাবে।

শক্তি কী?

এ ব্যাপারে আমাদের জানামতে সবচেয়ে গোছানো আলোচনা করেছে আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা ‘সি আই এ’র সবচে ঝানু গোয়েন্দাপ্রধান ড. রে ক্লাইন (Ray Cline)। সে যখন গোয়েন্দাপ্রধান ছিল তখন আমেরিকার গোয়েন্দা তৎপরতা ছিল সম্পূর্ণ পেশাদারিত্বপূর্ণ।

বর্তমানে, তাদের পেশাদারিত্বের সিংহভাগই তো দখল করে ফেলেছে ইলেক্ট্রিক ডিভাইস আর ইন্টারনেট।

ড. রে ক্লাইন কোরিয়া যুদ্ধের সময় আমেরিকার প্রধান গোয়েন্দা বিশ্লেষক ছিল। ১৯৬১ সালে আমেরিকা কর্তৃক কিউবায় ঐতিহাসিক মিসাইল হামলার পরবর্তী সময়ে গুপ্তচরবৃত্তিতে তার দক্ষতা প্রকাশ পায়। গুপ্তচরবৃত্তিতে তার দখল দেখে মার্কিন কর্তৃপক্ষ তাকে ১৯৬২ সালে গোয়েন্দা অধিদপ্তরের(D.D.I) ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে নিয়োগ দেয়।

ভারসাম্যতার বিশ্লেষণমূলক এ আলোচনাটি বিবৃত হয়েছে ড. ক্লাইনের “World Power Assessment: a Calculus of Strategic Drift” নামক গ্রন্থে। সে গ্রন্থে ড. ক্লাইন ‘শক্তির’ ওপর একটি সূত্র উল্লেখ করেছিল। সূত্রটি নিচে দেওয়া হলো-

Pp = (C+E+M) x (S+W)

Pp = Potential Power (সম্ভব্য শক্তি)

C = critical mass (ভূমি, ভূমির অধিবাসী যোদ্ধা ও যুদ্ধক্ষেত্র)

E= economic capability ( অর্থনৈতিক সক্ষমতা)

M =military capability (সৈন্যসংখ্যা ও সামরিক সক্ষমতা)

S= strategic purpose ( সামরিক দর্শন এবং লক্ষ্য-উদ্দেশ্য)

W = Will (যোদ্ধাদের মনবল ও জনসাধারণের মানসিক সমর্থন)।

সূত্রটির আরবী অনুবাদ হবে এমন-

القوة الكامنة = (الكتلة الضرورية + قدرت اقتصادية + قدرات عسكرية) x (الغاية الاستراتيجية + الإرادة)

বৈশ্বিক অঙ্গনে প্রভাব বিস্তারের জন্য যেমন  ‘ভারসাম্যতাকে’ মূল ভিত্তি নির্ধারণ করা হয়েছে, তেমনিভাবে কোন দল ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়  আন্দোলনরত কোন জামাতের জন্যও এই ভারসাম্যতা অত্যাবশ্যকীয়।

সূত্রটি আবার দেখে নেই-

১- الكتلة الضرورية বা অত্যাবশ্যক বিষয়সমূহ । যেমন- ভূমি, ভূমির অধিবাসী, যুদ্ধক্ষেত্র।।

২- قدرت اقتصادية বা অর্থনৈতিক সক্ষমতা, অর্থাৎ দেশের উৎপাদিত কাঁচামাল।

৩- قدرات عسكرية বা সামরিক সক্ষমতা, তথা- সৈন্যসংখ্যা ও সামরিক সক্ষমতা।

৪- الغاية الاستراتيجية বা স্ট্রাটেজিক্যাল টার্গেট তথা সামরিক দর্শন এবং লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ।

৫- الإرادة তথা যোদ্ধাদের মনোবল ও জনসাধারণের মানসিক সমর্থন।

এই বিশ্লেষণে প্রতিভাত হলো যে, অর্থহীন আবেগমাখা কিছু শ্লোগানের নাম রণশক্তি নয়। বরং তা একটি চাক্ষুষ বাস্তবতা; যা হবে দৃশ্যমান। সকলে উপলব্ধি করতে পারবে এমন। আর তা অর্জনের পথে চেষ্টাটাও হবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নীতিমালার আলোকে। কোন খামখেয়ালী বা বিলাসী চিন্তা চেতনায় তা অর্জিত হবার নয়। এমনিভাবে শত্রুর মোকাবেলাও হবে একটি সুরক্ষিত ভূমি থেকে, বাস্তবতা বিবর্জিত কিছু ধারণার বশবর্তী হয়ে শুধু সংঘাত বাঁধিয়ে দিলেই টিকে থাকা যাবে না।

এতে আরো সুস্পষ্ট, কেউ যদি উপরোল্লিখিত বিষয়গুলোর কোনো একটি বাদ দিয়ে নিজের শক্তি পরিপূর্ণ হবার দাবী করে, তাহলে সে এই ভারসাম্যতা থেকে সম্পূর্ণ বাহিরে চলে যাবে। সুতরাং সামান্য পরিমাণ বাহ্যিক প্রস্তুতি নিয়ে যদি কোনো ইসলামী আন্দোলন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে, তাহলে তাদের পরিণতি হবে; হয়তো অস্তিত্ব বিনাশ কিংবা মাঝপথে থেমে যাওয়া। এমনিভাবে, কেউ যদি শুধু অর্থনৈতিক শক্তি অর্জন করে, আর বাকী পয়েন্টগুলোর প্রতি গুরুত্ব না দেয়, তাহলে অবশ্যম্ভাবীভাবে তার পরিণতিও হবে মাঝপথে থেমে যাওয়া।

তেমনিভাবে, ভারসাম্য তৈরীর জন্য অন্যের শক্তির উপর ভরসা করাও বোকামি ছাড়া কিছু নয়। আমার শক্তি সেটাই যেটা আমার নিয়ন্ত্রণে। কতিপয় আরব রাষ্ট্রে আমরা এর তিক্ত অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করেছি। কারণ, যাদের শক্তির উপর নির্ভর করা হচ্ছে, তারা যে কোনো সময় সঙ্গ ত্যাগ করতে পারে। ইসলামিস্টদের ছেড়ে তাদের নিজস্ব নীতি নির্ধারকদের আদর্শ গ্রহণ করতে পারে। আর সে আদর্শ যে ইসলামের সাথে বিরোধপূর্ণ হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

যেসব ইসলামী দল শত্রুদের সাথে স্থায়ী শান্তিচুক্তি করে রেখেছে; ফলে সামরিক শক্তি অর্জনের কোনো চেষ্টা করছে না, তাদের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া একটি অবাস্তব কল্পনা এবং হাস্যকর বিষয়। এই পদ্ধতিতে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোনো ঘটনা ইতিহাসে নেই। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মহাত্মা গান্ধীর বিজয়কে উদাহরণ টেনে আমার এই কথায় কেউ কেউ আপত্তি করতে পারেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো এখানে গান্ধীর তেমন কৃতিত্ব নেই। স্বাধীনতা লাভের জন্য অসংখ্য মুসলিমের রক্তঝরানো আন্দোলন যদি না হত, তাহলে ইংরেজদের তাড়ানো সম্ভব হত না। আর গান্ধীর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে ব্রিটিশরা “দুই বিপদের মাঝে অপেক্ষাকৃত ছোট বিপদ গ্রহন করার” নীতি অবলম্বন করেছিল।

কিছু ইসলামী দল এমনও রয়েছে, যারা মৌলিক পরিবর্তনে বিশ্বাসী। কিন্তু তারা সমগ্র চেষ্টা ব্যয় করে থাকে সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি অর্জন এবং দলের সদস্যদের মনন গঠনে। পক্ষান্তরে, তাদের স্ট্রাটেজিক্যাল চিন্তাগত ও আদর্শিক সুদৃঢ় কোনো ভিত্তি নেই। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের অনুপ্রবেশ হয় ভগ্ন ডানায় উড়াল দেওয়ার ন্যায়। পরিণতিতে তাদের চরম মূল্য দিতে হয়। তাদের সদস্যরা উপহাসের পাত্রে পরিণত হয়। লজ্জাজনক পতন বুঝাতে তাদেরকে  উদাহরণ হিসেবে নিয়ে আসা হয়।

এখানে আলকুতলাতুয্ যরুরিয়্যাহ বা الكتلة الضرورية নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে যে, আমাদের নিজস্ব ভূমি, যোদ্ধা ও যুদ্ধক্ষেত্র আছে, ফলে আমাদের অন্যগুলো না থাকলেও চলবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু এতটুকু দিয়েই নতুন কোনো ভূমির উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রশক্তির ব্যাপারটা এর চাইতে ভিন্ন। কিন্তু এই প্রশ্ন তখনই গ্রহনযোগ্য, যখন সামরিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতা পূর্ণাঙ্গরুপে বহাল থাকে। যেমনটি হয়েছে ল্যাটিন আমেরিকা, এশিয়া এবং আফ্রিকার কিছু বিদ্রোহী দলের সাথে। এমনিভাবে কিছু ইসলামী দলের উদাহরণও এখানে দেওয়া যেতে পারে। যেমন- লেবানন, চেচনিয়া, সোমালিয়া ও আফগানিস্তানের ইসলামী দলগুলো। ভারসাম্যপূর্ণ আন্দোলনের ফলে এই দলগুলো এমন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে যে, সেসব দেশের যে কোনো প্রান্তে তাদেরকে ডিঙ্গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব।

এর আলোকে আমরা বলব- আমাদের আল-কায়েদার ভাইয়েরা শুন্য হাতে মাঠে নামেননি। সংশয় সৃষ্টিকারীরা যেমনটা বলে বেড়াচ্ছে। বরং ড. ক্লাইন রণশক্তিতে ভারসাম্যতার যে দর্শন দেখিয়েছে, তা যদি আমরা আল-কায়েদার উপর প্রয়োগ করি তাহলে দেখা যাবে- আল-কায়েদার যে রণশক্তি রয়েছে, একটি গোপন আন্দোলনের জন্য এটি শুধ পর্যাপ্তই নয় বরং অনেক বেশি। Critical mass তথা যোদ্ধা এবং যুদ্ধভূমির বিবেচনায় বলব, আফগানিস্তানে প্রচুর সংখ্যক মুজাহিদ রয়েছেন । দীর্ঘ সময় যাবৎ তাঁরাই সে ভূখন্ডের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। এটি এমন রাষ্ট্র যা যুগ যুগ যাবৎ একটি অতিউপযুক্ত যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বলতে গেলে আফগান হলো পৃথিবীর পরাশক্তিগুলোর শক্তি প্রদর্শন আর শক্তি ক্ষয়ের কেন্দ্র। পরাশক্তিগুলোর গোরস্থান। আর অর্থনীতির কথা হলো, আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদদের মতে মুজাহিদদের অর্থনৈতিক অবস্থান অনেক ভালো এবং সুরক্ষিত। বরং ইসলামী অঞ্চলগুলোতে জাতিগত সম্প্রীতি গড়ে উঠার কারণে অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির পথে রয়েছে। আর সামরিক দিক থেকে তাঁদের অবস্থা আলহামদুলিল্লাহ! এতই সন্তোষজনক যে, যতই বাড়িয়ে বলা হোকনা কেনো তা কমই মনে হবে।  মুজাহিদদের নিজেদের বক্তব্য বাদই দিলাম, আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থাগুলোর কথাই সামনে আনা যাক। ‘সিএনএন’ এর এক সংবাদে বলা হয়েছে– মুজাহিদদের যুদ্ধকৌশল এতটাই সুনিপুণ যে, তারা পাশ্চাত্যের সর্বোচ্চ প্রশিক্ষিত যেকোনো বাহিনীকে সহজেই কাবু করতে সক্ষম।

আর কৌশলগত ভিত্তির ব্যাপারে বলব, তানযীম আল-কায়েদা গত দশক থেকেই ঘোষণা দিয়ে আসছে– তাদেরকে হালকাভাবে দেখার কোন সুযোগ নেই। তাঁরা খুব ভালো ভাবেই জানেম কোন দিক থেকে আমেরিকার গর্দানে আঘাত হানতে হয়। আর ইরাদা তথা মুজাহিদদের মনোবলের ব্যাপারে বলা যায়, পৃথিবীতে আল্লাহর পথের মুজাহিদদের মত এমন আর কাউকে আপনি পাবেন না, যারা এমন পর্বতসম দৃঢ়তা আর আকাশছোঁয়া ঈমানী শক্তি  বুকে ধারণ করে।

এই পর্যালোচনায় আমরা দেখতে পেলাম, তানযীম আল-কায়েদার মুজাহিদগণ অতি অল্প সময়ে (মাত্র এক দশকে) যে সক্ষমতা অর্জন করেছেন, অন্যান্য দল কয়েক দশকেও তার সিকি ভাগও অর্জন করতে পারেনি। এর কারণ একটাই, আর তা হলো রণশক্তির সেই ভারসাম্যতা, যা তাঁদেরকে যুগের ফেরাউন আমেরিকার ঘাড় মটকাতে সামর্থ যুগিয়েছে। তাঁরা আমেরিকার অন্দরমহলে ঢুকে তার পিঠে পেরেক ঠুকতে সক্ষম হয়েছে মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ের ব্যবধানে। তাঁদের সুনিপুণ যুদ্ধকৌশল আর রণদক্ষতা কাজে লাগিয়ে। অভিযোগকারীরা কি তাদের এসব কর্মদক্ষতা দেখছেনা? প্রত্যেকেই নিরপেক্ষভাবে নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখি। আশা করি সঠিক উত্তর  পেতে তেমন কষ্ট হবেনা।

অভিযোগকারী ভাইয়েরা প্রকৃত অবস্থা সহজে মেনে নিবে না। তাদের সামনে নতুন নতুন আরো অনেক অভিযোগ দাঁড়িয়ে যাবে। তারা আবার অভিযোগের ভিন্ন সুর তুলে বলবে- সম্ভব্য শক্তিতে (Potential Power) কোথায় আমেরিকা আর কোথায় আল-কায়েদা! এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হলো আল-কায়েদার  রণশক্তির ভারসাম্যতার গোড়ায় কুঠারাঘাত করা। কিন্তু এই অভিযোগও ধোপে টিকবে না, ইনশাআল্লাহ।

পূর্বে ভারসাম্যতার যে পাঁচটি পয়েন্ট আলোচনা করা হয়েছে, তাকে আমরা মৌলিক দুই প্রকারে ভাগ করতে পারি।

প্রথম প্রকার = (C+E+M) তথা যোদ্ধা ও যুদ্ধক্ষেত্র+অর্থনৈতিক সক্ষমতা+সামরিক সক্ষমতা।

দ্বিতীয় প্রকার = (S+W) তথা যুদ্ধকৌশল+ইরাদা (মুজাহিদদের সুউচ্চ মনোবল ও যুদ্ধভূমির অধিবাসীদের সহযোগিতামূলক মানসিকতা।

এই দুই প্রকার হলো ভারসাম্যপূর্ণ রণশক্তির দুই বাহুর ন্যায়।

এবার আসা যাক তুলনামূলক বিশ্লেষণে। প্রথম বাহুতে যদিও আমেরিকা ও আল-কায়েদার মাঝে বিস্তর ফারাক রয়েছে, কিন্তু দ্বিতীয় বাহুতে মুজাহিদগণ এতটাই অগ্রগামী যে আমেরিকা কল্পনায়ও তার ধারে কাছে আসতে পারবে না।

এবার আমরা যখন উভয় বাহুতে সমন্বয় সাধনে যাবো, তখন দেখব- ভারসাম্যতায় আল-কায়েদা আমেরিকার চাইতে কয়েকধাপ এগিয়ে আছে। এই কারণেই সুপার পাওয়ার খ্যাত আমেরিকার মনে আল-কায়েদার ব্যাপারে এত ভীতি। একদিন আল-কায়েদার হাতেই আমেরিকার দম্ভ বিচূর্ণ হয়ে ইসলামের বিজয় অর্জিত হবে, ইনশাআল্লাহ।

আরেকটি মজার ব্যাপার হলো আমেরিকা একটি বিস্তৃত রাষ্ট্রশক্তি হবার কারণে সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনকল্যাণসহ বহু সেক্টর তাকে সামলে চলতে হয় । এসব বিষয়ে সমন্বয় করতে গিয়ে তাদের চেষ্টা এবং শক্তি বহু খাতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ফলে, তাদের বিভিন্ন অসুবিধা ও সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়। পক্ষান্তরে, মুজাহিদগণের সকল প্রচেষ্টা একটি মাত্র লক্ষ্যে নিবদ্ধ। তা হলো ক্রুসেডার আমেরিকার গলায় পরাজয়ের বেড়ি পড়ানো। এটি ছাড়া তাদের আর কোনো ব্যস্ততা নেই। কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। এই বিষয়টিই মুজাহিদদেরকে কর্মক্ষমতায় আমেরিকার অনেক উর্ধ্বে নিয়ে গেছে।

ভারসাম্যতা বিশ্লষণের আরেক দিক

এতো ছিল সামগ্রিকভাবে রণশক্তির বিশ্লেষণ। বিশ্লেষনের আরেকটি বিশেষ দিক রয়েছে। এখন আমরা তা নিয়ে আলোচনা করব ইনশা আল্লাহ।

বর্তমানে মুজাহিদগণ আমেরিকার সাথে সম্মুখ সমরে লিপ্ত। যুদ্ধ পরিচালনার বিশেষ কিছু নীতিমালা রয়েছে। কারণ, যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক শক্তিই হলো মূল চালিকা শক্তি। এ কারণে সরাসরি যুদ্ধে ভারসাম্যের নীতিমালা, পূর্বের নীতিমালার ব্যাতিক্রম। এ বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকজন রণশক্তি বিশ্লেষক আলোচনা করেছে। এর মধ্যে সবচে গ্রহনযোগ্য বিশ্লেষক হল ড. টি.এন ডুপায় (Dupuy)। সে তার গবেষণাধর্মী গ্রন্থ “Understanding war” এ বলেছে, সরাসরি যুদ্ধে ভারসাম্যতার সংক্ষিপ্ত সূত্র হলো-

P=NVQ

P= Combat power(লড়াই সক্ষমতা), N= numbers of troops(যোদ্ধাসংখ্যা), V= Variable factors(পরিবর্তনশীল নিয়ামকসমূহ), Q= Quality of troops (যোদ্ধাদের মান)।

সূত্রটির আরবী রূপ হলো:

القوة في القتال= عدد القوات x عوامل متغيرة x نوعية القوات

القوة في القتال= তথা রণশক্তি বা লড়াই সক্ষমতা

عدد القوات তথা যোদ্ধা সংখ্যা

عوامل متغيرة তথা পরিবর্তনশীল নিয়ামকসমূহ

نوعية القوات তথা যোদ্ধাদের মান

ড. ডুপায়ের এই বিশ্লেষণের আলোকে আমাদের সামনে যে বাস্তবতা ফুটে উঠে, তা হলো আমেরিকা এবং মুজাহিদদের মাঝে রণশক্তিতে তেমন তারতম্য নেই। যদিও বাহ্যিকদৃষ্টিতে মার্কিন ফোর্সের সংখ্যা মুজাহিদদের চাইতে অনেক বেশি। তাদের তুলনায় মুজাহিদদের সদস্য সংখ্যা অনেক কম। কিন্তু যুদ্ধকৌশল  বিবেচনায় নিলে যে পরিমাণ মুজাহিদ আছেন ,তার চাইতে বেশির প্রয়োজনও নেই। তা সত্ত্বেও যদি কখনো সদস্য বাড়ানোর প্রয়োজন হয়, তাহলে লক্ষ লক্ষ মুসলিম যুবক জীবন উৎসর্গ করার অদম্য বাসনা নিয়ে মুজাহিদ শাইখদের ডাকে লাব্বাইক বলার প্রতীক্ষায় দিন গুনছে। এটা ছিল numbers of troops বা যোদ্ধা সংখ্যা নিয়ে আলোচনা।

আর যদি Quality of troops বা যোদ্ধাদের মান নিয়ে কথা বলি, তাহলে শত্রু মিত্র সবাই বলতে বাধ্য যে, এক্ষেত্রে মুজাহিদদের যা আছে আমেরিকার কাছে তার সহস্র ভাগের একভাগও নেই। আমেরিকার প্রত্যেকটা সৈন্যের প্রত্যেকটা ফায়ারের সাথে ডলারের সম্পর্ক। প্রতি সেকেন্ডে জীবন হারানোর শংকা। স্ত্রী সন্তান নিয়ে দুশ্চিন্তা। স্বদেশে ফিরে যাবার চাপা উৎকন্ঠা। বহুমুখী মানসিক অশান্তি। পক্ষান্তরে, খোদার রাহের মুজাহিদদের প্রতিটা ফায়ারে জান্নাতের অমীয় সুধার ঘ্রাণ। প্রতি মুহূর্তে হুরে ঈনদের সাথে সাক্ষাতের তামান্না! জীবনের সময়গুলো প্রিয় প্রেমাস্পদ আল্লাহর রাহে কাটানোর সে অব্যক্ত প্রশান্তি! আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দ্বীন ক্বায়েমের অদম্য নেশা! দ্বীনের দুশমনদের স্বহস্তে শাস্তি দিয়ে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব পালন করার বুকভরা তৃপ্তি! এ বিষয়গুলোর কারণে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতিটা কষ্ট তাদের কাছে বাসর রাতের ফুলশয্যার কোমল আলিঙ্গনের চাইতেও মধুর। একেকজন মুজাহিদ একেকটা তাজা সিংহ। তাদের প্রত্যেকের ললাটে চকচক করে বীরত্বের প্রতীক। তারা আমেরিকানদের ন্যায় চরিত্রহীন সীমালংঘনকারী লম্পট কাপুরুষ নয়।

পরিবর্তনশীল নিয়ামকসমূহ বা পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি (Variable factors) – তো এই বিষয়ে বলেব যে, যুদ্ধের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি সর্বদাই মুজাহিদদের নিয়ন্ত্রণে আছে, আলহামদুলিল্লাহ। কারণ, তাঁরাই যুদ্ধের সূচনা করেছেন। শত্রুর ডেরায় গিয়ে আকস্মিক হামলা চালিয়েছেন। যুদ্ধের ময়দান এবং পরিবেশ তাঁরাই নির্বাচন করেছেন। এমনিভাবে, শত্রুর মনোভাব, কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে তাঁরা সম্যক অবগত। পক্ষান্তরে, মার্কিন সেনাদের কাছে মুজাহিদদের সবকিছুই অপরিচিত, অজ্ঞাত। ময়দানের পরিবেশ, মুজাহিদদের হামলার ধরণ, সৈন্য সংখ্যা সবকিছু্ই তাঁদের কাছে রহস্যে ঘেরা।

মোট কথা, এই দ্বিতীয় প্রকার ভারসাম্যতার তুলনামূলক বিশ্লেষণে আমাদের কাছে সুস্পষ্ট হল যে, বু্দ্ধিবৃত্তিক এবং যৌক্তিক বিচারে এই ময়দানের ফলাফল তথা চূড়ান্ত বিজয় ইসলাম ও মুসলমানদের ভাগেই আসবে, ইনশাআল্লাহ।

রণশক্তির বিশ্লেষণ এবং তা অর্জনের মাধ্যম বুঝানোর জন্য আমরা এখানে কৌশলগত ভারসাম্যতার কিছু নমুনা তু্লে ধরলাম। আমেরিকানরা যেগুলো কাজে লাগিয়ে থাকে। আমার ধারণা সীরাতে নববীর উপর যাদের দৃষ্টি আছে, তারা দেখতে পাবেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শক্তির ক্ষেত্র নির্ধারণ এবং শক্তি অর্জনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। নববী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় এবং তার সুরক্ষায় ভারসাম্যতা লাভের সকল খাত- যোদ্ধা সংগ্রহ, সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন, কৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণ, যোদ্ধাদের  মানসিকভাবে প্রস্তুত করা ইত্যাদি বিষয়ে সর্বদা সামগ্রিক দৃষ্টি রাখতেন। যখন থেকে উম্মাহ নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে তাদের নবীর আদর্শ ভুলে বসেছে, তখন থেকেই তাদের জন্য ব্যর্থতা আর পরাজয় অবধারিত হয়েছে।

পূর্বের আলোচনা দ্বারা পাশ্চাত্য দর্শনের প্রশংসা ও স্তুতি গাওয়া উদ্দেশ্য নয়। বরং একজন মুজাহিদের জ্ঞান, সুন্নাহর যতটুকু অংশ আবিষ্কার করতে পেরেছে; তা তুলে ধরা। জ্ঞানীদের চিন্তা এবং ময়দানের কর্মীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে ফায়েদা নেওয়া। সমগ্র পৃথিবীর ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ সত্ত্বেও মুজাহিদগণ তাদের আন্দোলনের ধাপে ধাপে এই বিষয়গুলো কার্যত বাস্তবায়ন করেই সামনে এগুচ্ছেন, আলহামদুলিল্লাহ।

যে সকল ভাইয়েরা এখনো মুজাহিদদের সক্ষমতা নিয়ে দ্বিধায় আছেন, এতকিছুর পরও যাদের মনে প্রশান্তি আসছে না, তাদেরকে বলব– আপনারা আপনাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করে যান, আপনাদের অন্তরগুলো মুজাহিদদের সাথে মিলিয়ে নিন। পক্ষান্তরে, যারা মুজাহিদদের সামর্থ্য নিয়ে ধুম্রজাল তৈরী করছে, তাদের কর্মপদ্ধতি নিয়ে সংশয় ছড়িয়ে যাচ্ছে এবং তাগুতদের সামনে নতজানু হয়ে মুজাহিদদের কার্যক্রম থেকে মন্দ ফায়েদা লুটতে চাচ্ছে, তারা অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত। তাদের দৃষ্টান্ত সেই উট পাখির ন্যায়, যে তার মাথা মাটিতে লুকিয়ে রেখেছে অথচ শত্রু তার সামনেই ওত পেতে আছে। ইহুদীদের নীল নকশা, ক্রুসেডারদের ষড়যন্ত্র যুগ যুগ ধরে বেড়েই চলছে। এর মোকাবেলায় শুন্য মাঠে কিছু মুখস্ত চিৎকার কোনই কাজে আসছে না, দিনের পর দিন এগুলো দেখার পরও আর কতদিন আমরা গা বাঁচিয়ে রইব? অথচ মুসলিম উম্মাহ আজ বিশাল বিপদের সম্মুখীন…!

সুত্র-পাক্ষিক আল-আনসার ম্যাগাজিন, ১৭ তম সংখ্যা, ১৫ রজব ১৪২৩ হিজরি, ২২ সেপ্টেম্বর ২০০২ ইংরেজি, পৃষ্ঠা: ১০-১৬

(Visited 140 times, 1 visits today)