নব্য সালাফি ও বনি ইজরায়েলিদের মধ্যকার সাদৃশ্য!

শায়খ খালিদ আল হুসাইনান

পিডিএফ ডাউনলোড

কিছু আহলে ইলমের (যেমন আমাদের দেশের সরকারি সালাফি/আহলে হাদিস ‘আলেম’গণ) আকীদার বিষয়ে এবং বিদআতি ও পথভ্রষ্ট দলসমূহের প্রতিবাদ করার বিষয়ে খুব আগ্রহ ও গুরুত্ব।

অপরদিকে তিনি দেখেন, শাসক কুফর, শিরক ও ধর্মত্যাগে লিপ্ত, কিন্তু এতে তিনি স্বীয় দ্বীন ও আকীদার ব্যাপারে গোস্বা ও গায়রত প্রকাশ করেন না।

এব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে যথাসম্ভব ইঙ্গিতে সেরে যান; স্পষ্ট ও পরিস্কারভাবে বলেন না। আর এর জন্য নিজের সামর্থমত বিভিন্ন ওযর বানিয়ে নেন।

কিন্তু যদি দরীদ্র লোকদের কেউ তাতে লিপ্ত হয়, যার কোনো ক্ষমতা নেই, সামাজিক অবস্থান নেই, তখন সেই আলেমরা দ্বীন ও আকীদার ব্যাপারে নিজের গোস্বা ও গায়রত প্রকাশ করে,
বিভিন্ন মন্দ বৈশিষ্ট্যের সাথে তার বিবরণ তুলে ধরে, মানুষকে তার মজলিসে বসা থেকে সতর্ক করে,
সেখানে আল ওয়ালা ওয়াল বারা (বন্ধুত্ব ও সম্পর্কচ্ছেদ) এর আকীদার ব্যাবহার করে, উক্ত লোককে পরিত্যাগ করে এবং অন্য মানুষকে আদেশ করে তাকে পরিত্যাগ করার জন্য।

তাহলে সে শাসক বা যার দেশে ক্ষমতা আছে, তার ক্ষেত্রে এই আয়াতের উপর আমল করে:
(فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَيِّنًا لَعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى) وقوله: (ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ)
“তোমরা গিয়ে তার সাথে নম্রভাবে কথা বলবে। হয়ত সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা (আল্লাহকে) ভয় করবে”।

এবং এই আয়াতের উপর:

“তোমার প্রভুর পথে আহ্বান কর প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে (বিতর্কের প্রয়োজন হলে) বিতর্ক করবে সর্বোত্তম পন্থায়”।

পক্ষান্তরে দরীদ্র, সাধারণ জনগণ এবং যাদের দেশে কোনো অবস্থান নেই, তাদের ক্ষেত্রে এই আয়াতের উপর আমল করে:
(فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ)
“তাই তোমাকে যে বিষয়ে আদেশ করা হয়েছে তা প্রকাশ্যে বলতে থাক আর মুশরিকদেরকে পরওয়া করো না।”

বনী ইসরাঈলীদের সাথে এর বেশ সাদৃশ্য রয়েছে।

রাসূলুল্লাহ সা: বলেনঃ


“তোমাদের পূর্ববর্তীরা ধ্বংস হয়েছিল এজন্য যে, যখন তাদের কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করত, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত, পক্ষান্তরে যখন তাদের মধ্যে নিম্ন শ্রেণীর লোক চুরি করত, তার উপর হদ প্রয়োগ করত”।
(বুখারী মুসলিম)

আরেকটি আশ্চর্য ও বিরল ব্যাপার হল, তারা তাদের ভাষণে ও দরসে ঘোষণা দেয়, এমন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার, যা জীবনের সর্ব বিষয়ে আল্লাহর শরীয়ত দ্বারা শাসন করবে,

কিন্তু যখন কোন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় অথবা প্রতিষ্ঠার পথে থাকে আর মুজাহিদগণ তাদের সাহায্য করার ও তাদের সঙ্গে থাকার আহ্বান করেন, তখন তারা পিছুটান দিতে শুরু করে, তার সাহায্য-সহযোগীতা থেকে বিরত থাকে এবং অলসতা করে।

তখন তারা আল্লাহর শরীয়ত বাস্তবায়নকারী ইসলামী রাষ্ট্রে হিজরত করার তুলনায় তাগুতের রাষ্ট্রে বসবাস করাকেই প্রাধান্য দেয়, যা আল্লাহর বিধান ব্যতীত ভিন্ন আইনে শাসন করে।

তাহলে কেন এই ধোঁকা ও পিছুটান?

এটা কি পার্থিব ইনকাম ও ব্যক্তিস্বার্থ হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে? আল্লাহই ভাল জানেন।

নাকি এটা শয়তানের ধোঁকা, মিথ্যা স্বপ্ন, মিথ্যা প্রবঞ্চনা? আল্লাহই ভাল জানেন।
.
সে কি ধারণা করে, তার আলোচনা ও ভাষণের দ্বারা অচিরেই এখানে এমন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে, যা তাগুতী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করবে এবং সেদেশে তাকে পরাজিত করবে?

আসলে সে হাজার বার চিন্তা করে,

কিভাবে তার সুন্দরী স্ত্রীর বিচ্ছেদ সহ্য করবে?
কিভাবে তার সন্তানদের বিচ্ছেদ বরণ করবে?

কিভাবে তার সেই বাড়ী-ঘর ছেড়ে যাবে, যা বানাতে ও সাঁজাতে তার বহু ক্লান্তি সহ্য করতে হয়েছে?
কিভাবে তার সেই বেতন ছেড়ে আসবে, যার পশ্চাতে মহা সম্মান তার পদচুম্বন করে?
আরো চিন্তা করে, কিভাবে তার সেই দেশ ছাড়বে, বহু বছর যাতে থাকতে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে?

আমরা তাকে আল্লাহ তা’আলার এই বাণী স্বরণ করিয়ে দিব:
(قُلْ مَتَاعُ الدُّنْيَا قَلِيلٌ وَالْآَخِرَةُ خَيْرٌ لِمَنِ اتَّقَى وَلَا تُظْلَمُونَ فَتِيلًا )
“বল, পার্থিব ভোগসম্ভার তুচ্ছ আর যারা (আল্লাহকে) ভয় করে তাদের জন্য আখেরাতই উত্তম। আর তোমাদের প্রতি সামান্যও জুলুম করা হবে না।”

আরো স্মরণ করিয়ে দিব:
(قُلْ إِنْ كَانَ آَبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ)
“বল, তোমাদের কাছে যদি আল্লাহ, তার রাসূল এবং তার পথে জিহাদ করা অপেক্ষা বেশি প্রিয় হয় তোমাদের পিতা, তোমাদের পুত্র, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের খান্দান, তোমাদের সেই সম্পদ, যা তোমরা অর্জন করেছ, তোমাদের সেই ব্যবসায়, যার মন্দা পড়ার আশঙ্কা কর এবং বসবাসের সেই ঘর, যা তোমরা ভালবাস, তাহলে অপেক্ষা কর, যে পর্যন্ত না আল্লাহ নিজ ফায়সালা প্রকাশ করেন। আল্লাহ অবাধ্যদেরকে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছান না।”

শায়খ আস সা’দী রহ: বলেন:


“এই আয়াতটি বড় দলিল আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল সা: কে ভালবাসা ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে, তাদের ভালবাসাকে অন্য সকল জিনিসের ভালবাসার উপর প্রাধান্য দেওয়ার ব্যাপারে এবং ঐ ব্যক্তির উপর কঠিন শাস্তি ও ভীষণ ক্রোধ অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে, যার নিকট উল্লেখিত জিনিসগুলোর কোনটার ভালবাসা আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল ও জিহাদের ভালবাসার চেয়ে অধিক হয়।”
এটা বোঝার আলামত হল, যখন তার নিকট দু’টি জিনিস পেশ করা হয়,
একটি হল সে আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসবে, তাতে তার কোন প্রবৃত্তির কামনা থাকবে না
আর দ্বিতীয়টি হল, সে নিজের নফস ও নফসের কামানাকে ভালবাসবে, কিন্তু এতে তার আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের ভালবাসা হারাতে হবে অথবা তাতে ঘাটতি আসবে।এক্ষেত্রে যদি সে আল্লাহ যা ভালবাসেন তার উপর নিজের কামনাকে প্রাধান্য দেয়, তাহলে এটাই প্রমাণ করবে যে, সে জালিম, স্বীয় ওয়াজিব পরিত্যাগকারী।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *