প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক জিহাদের মাঝে পার্থক্য

প্রশ্ন:

প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক জিহাদের মাঝে পার্থক্য কী?

প্রতিরক্ষামূলক জিহাদের জন্য কি ঝাণ্ডা ও ইমাম থাকা শর্ত?

ইরাকে অবস্থিত জোট বাহিনীকে আমাদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত শত্রুর পর্যায়ে ধরা যাবে নাকি তারা কালামে পাকে ঘোষিত সে ব্যক্তিদের মত?

لا ينهاكم الله عن الذين لم يقاتلوكم في الدين

অর্থঃ ‘ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিস্কার করেনি তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তেমাদেরকে নিষেধ করেন না।’

-সূরা মুমতাহিনা:৮

বর্তমানে ইরাকে আমাদের জন্য মানুষের দ্বীন ও তাওহিদ বিষয়ে তালিমে লিপ্ত থাকা উত্তম নাকি আমাদের দেশের দখলদার সৈন্যদের বিরুদ্ধে জিহাদে লিপ্ত হওয়া উত্তম?

বিস্তারিত এবং উপদেশমূলক উত্তর কামনা করছি; যাতে করে এমন কোনো কল্যাণ আমাদের থেকে ছুটে না যায় যা আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য ইচ্ছা করেছেন অথবা এমন কোনো অকল্যাণে পতিত না হই যা থেকে আমাদের বিরত থাকা উচিত। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

 

উত্তর দিয়েছেন  শায়খ আবু বাসির তারতুসি –

আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন।

প্রতিরক্ষামূলক জিহাদ হলো, সে সব কাফের শুত্রুকে প্রতিহত করা, যারা মুসলমানদের দেশ ও ইজ্জতের উপর আক্রমণ করে, চাই তারা মূলগতভাবে কাফের হোক কিংবা মুরদাত হওয়ার কারণে হোক।

এ প্রকারের জিহাদ সে সব মুসলমানের উপর ফরজ, যাদের দেশ ও সীমানায় শত্রু পক্ষ আক্রমণ করেছে। যদি তারা শুত্রুদেরকে প্রতিহত করতে সক্ষম না হয়, তাহলে দেশ ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য শত্রু পক্ষকে প্রতিহত করা তাদের পার্শ্ববর্তী মুসলমাদের উপর ফরজ। এ প্রকার জিহাদের জন্য ব্যাপক শক্তিধর ইমাম ও জামাআত থাকা শর্ত নয়। যদি ইমাম বা জামাআত পাওয়া যায় তাহলে ভালো। আর যদি না পাওয়া যায় তাহলে প্রত্যেক মুসলমানের উপর নিজ উদ্যোগে যথাসাদ্ধ জিহাদে বেরিয়ে পড়া ফরজ।

যদি সার্বজনিন ইসলামী কোনো ঝাণ্ডা না থাকে যার অধীনে সকল মুসলিম একত্র হবে, তাহলে প্রত্যেক জামাআতের জন্য, জামাত না হলে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে হলেও বিশেষ ঝাণ্ডা থাকা আবশ্যক।

যার বৈশিষ্ট্য হবে, প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে শত্রকে প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়া এবং দেশ, ধর্ম ও স্বাধীনতা রক্ষার প্রত্যয় নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায়, আল্লাহর আনুগত্য প্রদর্শন করে একমাত্র তাঁরই পথে জিহাদ করা। যেন আল্লাহর কালিমা বুলন্দ হয়, কুফুরী কালিমা পরাজিত হয়।

আর আক্রমনাত্মক জিহাদের অর্থ হলো, মুসলমানদের পক্ষ থেকে কাফের শত্রুকে তাদের দেশে জিহাদের জন্য আহ্বান করা। এ প্রকার জিহাদের জন্য কোনো কোনো আহলে ইলম ইমাম ও স্বতন্ত্র রাষ্ট্র থাকা শর্তযুক্ত করেছেন। কিন্তু আমার নিকট শর্ত না থাকা অগ্রাধিকারযোগ্য মনে হচ্ছে। আক্রমণাত্মক জিহাদ স্বতন্ত্র রাষ্ট্র ও ইমাম ছাড়া বিশুদ্ধ।

যার প্রমাণ, আবু বাসির রা. ও তাঁর সঙ্গীদের দেশ ও ইমাম ছাড়া এককভাবে জিহাদের আহ্বান। তাঁরা তখনকার ইসলামী রাষ্ট্র মদীনার সীমানা ও মদীনার সাথে যেসব আরবগোত্র সন্ধির মাধ্যমে সে সীমানার অর্ন্তভুক্ত হয়েছিলো তার বাইরে কুরাইশী কাফেলাকে উদ্দেশ্য করে জিহাদের আহ্বান করেছিলেন। মদীনার মাঝে এবং মক্কার কুরাইশ ও আরবগোত্রগুলোর মাঝে যে সন্ধি ও শান্তিচুক্তি হয়েছিলো তাকে হুদাইবিয়ার সন্ধি বলে নামকরণ করা হয়।

ইরাকে অবস্থিত জোট বাহিনী সম্পর্কে উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে বলবো, এরা হচ্ছে মুসলিম ভূখণ্ডের দখলদার, মুসলামনদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত সৈন্য। এরা মুসলিম ভূখণ্ডে বিশৃঙ্খলা ও ফাসাদ সৃষ্টি করতে চায়। তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা, তাদেরকে প্রতিহত করা, যেখান থেকে এসেছিলো তাদেরকে সেখানেই পাঠিয়ে দেয়া ফরজ হওয়ার ব্যপারে সন্দেহ পোষণ করা জায়েয নেই। এসব দখলদার যুদ্ধাদের উপর রাব্বে কারীমের এ আয়াত প্রযোজ্য নয়,

لا ينهاكم الله عن الذين لم يقاتلوكم في الدين

‘ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিস্কার করেনি তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তেমাদেরকে নিষেধ করেন না।’ -সূরা মুমতাহিনা:৮

বরং তাদের উপর প্রযোজ্য হলো আল্লাহর এ বাণী,

ولا يزالون يقاتلونكم حتى يردوكم عن دينكم إن استطاعوا ومن يرتدد منكم عن دينه فيمت وهو كافر فأولئك حبطت أعمالهم في الدنيا والآخرة وأولئك أصحاب النار هم فيها خالدون

‘তারা তো সর্বদাই তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকবে, যাতে করে তোমাদিগকে দ্বীন থেকে ফিরিয়ে দিতে পারে যদি সম্ভব হয়। তোমাদের মধ্যে যারা নিজের দ্বীন থেকে ফিরে দাঁড়াবে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, দুনিয় ও আখেরাতে তাদের যাবতীয় আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে। আর তারাই হলো দোযখবাসী। তাতে তারা চিরকাল থাকবে।’ -সূরা বাকারা:২১৭

وقاتلوا في سبيل الله الذين يقاتلونكم

‘আল্লাহর রাস্তায় কিতাল করো তাদের সাথে যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে।’ -সূরা বাকারা:১৯০

يا أيها الذين آمنوا قاتلوا الذين يلونكم من الكفار وليجدوا فيكم غلظة واعلموا أن الله مع المتقين

‘হে ঈমানদারগণ, তোমাদের নিকটবর্তী কাফেরদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাও এবং তারা তোমাদের মধ্যে কঠোরতা অনুভব করুক আর জেনে রাখো, আল্লাহ মুত্তাকিদের সাথে রয়েছেন।’ -সূরা তওবা:১২৩

সতর্কতা হিসেবে এখানে আমি একটি কথা বলতে বাধ্য, আল্লাহ তাআলা যদি ইরাকের জন্য আগ্রাসী সৈন্যদের বিরুদ্ধে জিহাদ ও প্রতিরোধের ব্যবস্থা না করতেন যার মাধ্যমে দখলদার সৈন্যদের অনেক আশা-ভরাসা, অনেক ভয়ঙ্কর পরিকল্পানাকে গুড়িয়ে দিয়েছে,

তাহলে হে ইরাকবাসী! তোমরা তোমাদের নারীদেরকে বন্দী এবং আমেরিকান বাহিনীর একজনের কোল থেকে আরেকজনের কোলে ছোঁড়াছুড়ি করতে দেখতে। সুতরাং আল্লাহর শুকুর আদায় করো, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে একটি দলকে জিহাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন। মুজাহিদদের বিরুদ্ধে শত্রুদের সহযোগী ও গুপ্তচর হওয়ার পরিবর্তে তোমরা বরং তাদের সহযোগী হও।

 

কোনটি আগে? দাওয়াত ইলাল্লাহ নাকি জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ?

আমি বলি, দুটির কোনোটির মাঝে কোনো বিরোধ নেই। না দুটির উপর একই সঙ্গে আমল করার মধ্যে কোনো বিরোধ রয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ চালিয়ে যাওয়া উচিৎ, পাশাপাশি তাওহিদের দাওয়াতও চলতে থাকবে। যেমন বর্তমান ইরাকের অবস্থা। সে ক্ষেত্রে একটি অপরটির সহযোগী হবে, দুটিই মনজিলে মাকসাদে পৌঁছার কারণ হবে।

সুতরাং জিহাদ যেভাবে তাওহিদ এবং তাওহিদবিশ্বাসীদের ছাড়া চলে না, তেমনিভাবে তাওহিদের জন্যেও রয়েছে জিহাদের ব্যপক প্রয়োজন। জিহাদ তাওহিদকে, তাওহিদের আহালকে রক্ষা করবে। তাওহিদকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাবে যে, যমিনে দাপটের সাথে বিচরণ করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *