সংশয়ঃ শত্রুসংখ্যা মুসলিমদের দ্বিগুণ হলে তাদের মুকাবিলা বৈধ নয়।

মুফতি জামিল মাহমুদ

এদেশীয় একজন স্বঘোষিত সালাফি আলেম ‘ডক্টর সাইফুল্লাহ’ আরাকান ইস্যুতে উক্ত ফতোয়া প্রদান করেছিলেন। আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ আরও এগিয়ে গিয়ে বলেছেন “সমান সমান না হলে মুকাবিলা ইসলামে জায়েজ নয়।”
(লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ)
অথচ, বদর, উহুদ, মুতা সহ অধিকাংশ যুদ্ধই এই ফতোয়া অনুযায়ী হারাম হওয়ার কথা! (নাউজুবিল্লাহ)
মূলত, বিষয়টি হচ্ছে,

“কাফিরদের সংখ্যা মুসলিমদের দ্বিগুণ হলে যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে পালানো বৈধ। কিন্তু যদি মুসলিমদের সংখ্যা ১২০০০ এর অধিক হয় তাহলে দ্বিগুণ হলেও পালানো বৈধ নয়।”

অথচ, এই বিষয়টিকে যুদ্ধে শামিলের শর্ত বানিয়ে ফেলা হচ্ছে! কতই না নিকৃষ্ট গোমরাহি। বিস্তারিত জানতে পড়ুনঃ

কিতাব: আল-লুবাব ফিল জামই বাইনাস সুন্নাতি ওয়াল কিতাব:

যখন কাফেরের সংখ্যা ২ জনের চেয়ে অধিক হয়ে যায়, তখন একজন মুসলিমের জন্য মুমনিদের এমন কোন দলের সাথে গিয়ে মিলিত হওয়া, যেখানে সাহায্য রয়েছে, এটা জায়েয আছে।
কিন্তু যদি পলায়ন করত: এমন সাধারণ মুসলিমদের সাথে গিয়ে মিলিত হয়, যাদের সাথে সাহায্য নেই, তাহলে এটা আল্লাহ তা’আলার বাণীতে উল্লেখিত ধমকির অন্তর্ভূক্ত-ومن يولهم يومئذ دبره…
“যে ব্যক্তি সেদিন তাদেরকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে, যুদ্ধের জন্য কৌশল অবলম্বন অথবা নিজ দলে স্থান গ্রহণের উদ্দেশ্য ছাড়া, সে আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্রোধ নিয়ে ফিরবে এবং তার ঠিকানা জাহান্নাম, আর তা অতি মন্দ ঠিকানা।”
অনুরূপ রাসূল সা: বলেছেন:
আমি প্রত্যেক মুসলিমের (আশ্রয় গ্রহণের) জন্য দল স্বরূপ।
অনুরূপ হযরত ওমর রা: এর নিকট যখন সংবাদ পৌঁছলো যে, উবাইদ ইবনে মাসউদ লড়াইয়ের দিন সামনে অগ্রসর হতে হতে নিহত হয়েছেন, কিন্তু পিছু হটেননি, তখন তিনি বললেন:
আল্লাহ আবু উবাইদের প্রতি রহম করুন! তিনি যদি আমার দিকে আশ্রয় গ্রহণ করতেন, তাহলে তো আমি তার জন্য দলস্বরূপ হতাম। অত:পর যখন আবু উবাইদের সাথীগণ তার নিকট গিয়ে পৌঁছলেন, তখন তিনি বললেন, আমি আপনাদের (আশ্রয় গ্রহণের) জন্য দল। আর তিনি তাদেরকে ভর্ৎসনা করলেন না।
এই হুকুমটি আমাদের মতে ততক্ষণ কার্যকর থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলিমদের সংখ্যা ১২ হাজারে না পৌঁছে। কিন্তু যখন মুসলিমদের সংখ্যা ১২ হাজারে পৌঁছবে, তখন তাদের জন্য তাদের দিগুণ থেকেও পলায়ন করা জায়েয হবে না। তবে যুদ্ধের কৌশল হিসাবে এরূপ জায়েয আছে।
অর্থাৎ শত্রুদের বিরুদ্ধে ফাঁদ পাতার জন্য এক স্থান থেকে সরে অন্য স্থানে যাওয়া- যেমন সংকীর্ণ স্থান থেকে প্রশস্ত স্থানের দিকে যাওয়া বা প্রশস্ত স্থান থেকে সংকীর্ণ স্থানের দিকে যাওয়া অথবা শত্রুদের জন্য লুকিয়ে থাকা বা এধরনের অন্য কোন কৌশল, যেগুলো মূলত: যুদ্ধ থেকে ভেগে যাওয়া নয়, বরং এগুলো হচ্ছে মুসলিমদের দলের সাথে মিলিত হয়ে একসঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য।
অত:পর যখন তাদের সংখ্যা ১২ হাজারে পৌঁছবে, তখন ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান রহ: বলেন: সৈন্যবাহিনী যখন এই পরিমাণে পৌঁছে, তখন শত্রুদের সংখ্যা যতই হোক, মুসলিমদের জন্য তাদের শত্রুদের থেকে পলায়ন করা কোনভাবেই জায়েয নেই। শত্রুদের সংখ্যা যতই বেড়ে যাক। তিনি আমাদের উলামাদের মাঝে এব্যাপারে কোন ইখতিলাফ উল্লেখ করেননি।
তিনি উবায়দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত ইমাম যুহরী রহ: এর হাদীসের মাধ্যমে দলিল পেশ করেন। উবায়দুল্লাহ বলেন:
রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন: সর্বোত্তম সহচর চার জান। সর্বোত্তম প্রেরিত বাহিনী ৪০০ জন। সর্বোত্তম সৈন্যবাহিনী ৪ হাজার। ১২ হাজারের কোন বাহিনী কখনো সংখ্যা স্বল্পতার কারণে পরাজিত হবে না।
কোন বর্ণনায় আছে, যে দলের সদস্য ১২ হাজারে পৌঁছে, তারা কখনো পরাজিত হয় না, যদি তারা ঐক্যবদ্ধ থাকে।
ইমাম ত্বহাবী রহ: বর্ণনা করেন: ইমাম মালেক রহ: কে প্রশ্ন করা হল, যে আল্লাহর বিধান থেকে বের হয়ে গেছে এবং ভিন্ন বিধান দ্বারা শাসন পরিচালনা করে, আমাদের জন্য কি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে পিছিয়ে থাকা জায়েয আছে?
তখন তিনি বলেন: যদি তোমার সাথে তোমার মত ১২ হাজার থাকে, তাহলে তোমার জন্য পিছিয়ে থাকা জায়েয নেই। এমনটা না থাকলে তোমার পিছিয়ে থাকা জায়েয আছে। প্রশ্নকারী ছিল, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর ইবনে আব্দুল আযীয রহ:। এই মতটি ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসার রহ: এর থেকে বর্ণিত মতের অনুরূপ।

এক হাজার দু’হাজারের উপর বিজয় লাভ করবে- আবু জাফর আত-তাবারী:

হযরত ইকরিমা রা: থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহ তা’আলার বাণী- যদি তোমাদের মধ্য থেকে ২০ জন ধৈর্যশীল থাকে…- এর ব্যাপারে বলেন:
মুসলমান একজন আর কাফের দশ জন। অত:পর আল্লাহ তা’আলা তাদের উপর সহজ বা হালকা করে দেন। তাই এখন তাদের উপর এই বিধান করেন যে, তাদের এক জন পূরুষ শত্রুদের দু’জন পূরুষের মোকাবেলায় পলায়ন করতে পারবে না।

ফাতহুল কাদীর- ইমাম শাওকানী:

যখন নাযিল হল- তোমাদের বিশ জন ধৈর্যশীল (তাদের) দু’শ জনের উপর বিজয় লাভ করবে- তখন ফরজ করে দেওয়া হল যে, একজন দশ জন থেকে পলায়ন করতে পারবে না এবং বিশ জন দু’শ জনের থেকে পলায়ন করতে পারবে না। অত:পর নাযিল হয়- এখন আল্লাহ তোমাদের উপর সহজ করে দিলেন…।
তখন ফরজ করা হল, একশ’ জন, একশ’ জন থেকে পলায়ন করতে পারবে না।
ইমাম সুফিয়ান ইবনে শুবরুমা বলেন: আমি আমর বিল মারুফ ও নেহী আনিল মুনকারকেও এরূপ মনে করি; যদি দু’জন অন্যায়কারী হয়, তাহলে তাকে অবশ্যই আমর বিল মারুফ করতে হবে, আর যদি তিন জন থাকে তাহলে তার সাথে লড়াই না করারও সুযোগ আছে।
ইমাম বুখারী, নাহ্হাস তদ্বিয় কিতাব নাসিখ এ, ইবনে মারদুয়াহ ও বায়হাকী তদ্বিয় কিতাব সুনানে ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণনা করেন: তিনি বলেন:
যখন নাযিল হল- তোমাদের মধ্য থেকে দশ জন ধৈর্যশীল থাকলে দু’শ জনের উপর বিজয় লাভ করবে- তখন বিষয়টা মুসলিমদের নিকট কঠিন মনে হল, যেহেতু এতে ফরজ করা হয়েছে যে, একজন দশ জন থেকে পলায়ন করতে পারবে না। তখন সহজ করার জন্য আয়াত নাযিল হল- এখন আল্লাহ তোমাদের থেকে (চাপ) হালকা করে দিলেন।
তিনি আরও বলেন: অত:পর যখন আল্লাহ তাদের উপর সংখ্যার ব্যাপারে সহজ করে দিলেন, তখন তাদের থেকে যতটুকু সহজ করা হল, ততটুকু পরিমাণ তাদের ধৈর্যও কমে গেল।

কিতাব: আইসারুত তাফাসীর-আবু বকর আলজাযায়েরী:

এখান থেকে একথা পাওয়া গেল যে, কোন মুসলিমের জন্য দু’জনের মোকাবেলা থেকে পলায়ন করা জায়েয নেই। তবে যদি শত্রু দু’জনের বেশি হয়, তখন তার জন্য পলায়ন করা জায়েয আছে। এরকামভাবে সংখ্যা যতই হোক। যেমন দশ জনের জন্য বিশ জন থেকে পলায়ন করা হারাম হবে, কিন্তু তাদের জন্য ত্রিশ জন বা চল্লিশ জন থেকে পলায়ন করা জায়েয আছে।
এই বিধানটা হচ্ছে শুধু মাত্র কষ্ট লাঘবের জন্য, অন্যথায় একজন মুমিনের জন্য দশজন বা তার চেয়ে অধিকের সাথে মোকাবেলা করাও জায়েয আছে। যেমন মূতার দিন তিন হাজার সাহাবী অস্ত্রে সজ্জিত ১ লক্ষ ৫০ হাজার রোম ও আরবের যৌথ সেবানাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছেন।
আয়াতে بإذن الله আল্লাহর হুকুমে- এর অর্থ হল, তার সাহায্য ও শক্তিতে। কেননা আল্লাহ তা’আলার সাহায্য ছাড়া বিজয় সম্ভব নয়।

আবু জাফর আত-তাবারী:

হযরত ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত, লোকদের (ভ্রান্ত) কথা যেন আপনাদেরকে ধোকায় না ফেলে। কারণ আমি অনেক লোককে শুনেছি, তারা বলে, একজন মুসলিমের জন্য তখনই যুদ্ধ করা উচিত হবে, যখন প্রত্যেকের উপর দু’জন করে শত্রু ভাগে পড়ে এবং প্রত্যেক দু’জনের উপর চারজন করে ভাগে পড়ে। তারপর এই অনুপাতে।
তাদের ধারণা হল, কেউ যদি এ সংখ্যায় পৌঁছার আগ পর্যন্ত যুদ্ধ করে, তাহলে সে গুনাহগার হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত তারা এ সংখ্যায় না পৌঁছবে যে, প্রত্যেকের উপর দু’জন এবং প্রত্যেক দু’জনের উপর চারজন, ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ না করলেও তাদের কোন গুনাহ হবে না।
অথচ আল্লাহ তা’আলা বলেছেন:
( وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْرِي نَفْسَهُ ابْتِغَاءَ مَرْضَاةِ اللَّهِ وَاللَّهُ رَءُوفٌ بِالْعِبَادِ ) [سورة البقرة: ২০৭]
“লোকদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে, যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজ আত্মাকে বিক্রয় করে দেয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ বান্দাদের প্রতি দয়াশীল।”
আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন:
( فَقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ لا تُكَلَّفُ إِلا نَفْسَكَ وَحَرِّضِ الْمُؤْمِنِينَ ) [سورة النساء: ৮৪]
“তাই তুমি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে থাক, তোমার উপর তো তোমার নিজের ছাড়া অন্য কারো দায়ভার নেই। আর মুমনিদেরকে উৎসাহিত করতে থাক।”
অতএব এটিও একটি উৎসাহ, যা আল্লাহ সূরা আনফালে তাদের উপর নাযিল করেছেন। তাই আপনি অক্ষম হবেন না। যুদ্ধ করুন। কারণ আল্লাহ যেটা ঘটাতে চান, তা মানুষের মাঝে কার্যকর হবেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *