বিদআতি ও বিরোধীদের সাথে আচরণনীতি (২)

শায়খ খালিদ বাতারফি

খুবই পেরেশানি ও দুঃখের বিষয় হল, আমাদের সমাজে যেন আদাব ও আখলাক উঠে গিয়েছে। আমাদের মাঝে যেন স্বজনপ্রীতি ও গোষ্ঠীপ্রীতি শিকড় গেড়েছে। ফলে আমরা উলামা, উমারাহ ও সম্মানিত ব্যক্তি ও আমাদের অন্যান্য মুসলিমদের প্রতি যথাযথ আদাব ও সম্মান বজায় রাখছি না অথবা পারছি না।

তাই সকল মুসলিম, বিশেষ করে মুজাহিদিনের জন্য একটি নির্দেশিকা অত্যান্ত জরুরী ছিল। আশা করছি বক্ষ্যমাণ পুস্তিকা সিরিজটি সেই অভাব পূরণ করবে ইনশা আল্লাহ। 

এই পুস্তিকাটি ‘জামাআত কায়িদাতুল জিহাদ ফি জাজিরাতুল আরব’ (AQAP) এর আমীর শাইখ খালিদ বাতারফি হাফিযাহুল্লাহ’র অনবদ্য সিরিজ দরস أصول التعامل مع أهل البدع والمخالفين  এর বাংলা অনুবাদ। এটির অন্যান্য দরসগুলো ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ প্রকাশিত হবে ইনশা আল্লাহ।

আশা করি আম ও খাস সকল মুসলিমদের উপকারে আসবে ইনশা আল্লাহ। পরিশেষে সকল প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলার। 

দ্বিতীয় মূলনীতিঃ মুজতাহিদকে গুনাহগার সাব্যস্ত না করা। যদি তিনি কোন উসুলি অথবা ফুরুঈ মাসআলায় ভুল করেন, তাহলে তাকে তাকফির বা তাফসিক করা যাবে না।

কেউ প্রবৃত্তি ও শৈথিল্যের কারণে ভুল করলো, আর কেউ ইজতিহাদ ও তাবিলের কারণে ভুল করলো – উভয়ের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। 

এখন কথা হল আমরা এটা কিভাবে জানবো? হ্যাঁ, সেটা জানা যাবে ব্যক্তির অবস্থা জানার মাধ্যমে। যদি ব্যক্তির ইসলামে অগ্রগামিতা থাকে, সৎ ও মর্যাদাবান হয় এবং এ অবস্থায় যদি সে মুখালেফ কোন কথা বলে, তাহলে সে অনিচ্ছায় এমনটি করেছেন বলে আমরা ধরে নিব। অথবা তিনি ব্যাখ্যাসাপেক্ষে এমনটা বলেছেন এবং এতে কোন কল্যাণ নিহিত রয়েছে – এমনটাই ধরে নেয়া ভাল হবে। 

মুখলিস ও দুনিয়াদারের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। দুনিয়াদাররা ইসলাম ও মুসলিমদের অবস্থাকে গুরুত্ব দেয় না। সে তার ব্যক্তিগত স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়। সে মুসলিমদের স্বার্থের উপর ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। সে কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে নববী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর প্রবৃত্তিকে প্রাধান্য দেয়। 

সুতরাং এখানে এই ব্যক্তি (দুনিয়াদার) ও পূর্বে উল্লেখিত ব্যক্তির (মুখলিস) মাঝে পার্থক্য রয়েছে। কেননা অনেক মানুষ দ্বিতীয় প্রকার ব্যক্তির ব্যাপারে অভিযোগ করে। তারা যখন আহলুস সুন্নাহ’র কোন আলিমের সাক্ষাৎ করে, তখন জানতে চায় যে, “অমুক ব্যক্তির ব্যাপারে আপনার রায় কি? এই ব্যক্তি তো সৎ। কিন্তু সে এমন কাজে পতিত হয়েছে, যা তাকে কাফের করে দেয়, অথবা ফাসেক করে দেয়, অথবা তার বিষয়টি সংশয়পূর্ণ হয়ে উঠে। আর এর ফলে মানুষের আপত্তি করার সুযোগ তৈরি হয়”। 

তখন ঐ আলেম তাকে বলেন যে, “না। এই ব্যক্তি সৎ। তার দ্বীনের ক্ষেত্রে অগ্রগামিতা রয়েছে। ইসলামের সেবায় তার ভূমিকা রয়েছে। বাকি তার বিষয়টি সংশয়পূর্ণ হওয়ার কারণ হল – কখনো কখনো সে ব্যাখ্যাসাপেক্ষ কথা বা কাজ করে থাকে”। 

এরপর তারা আলিমের কাছে জানতে চান যে, “ঠিক আছে। তবে অমুকও তো একই কথা বলেছে। তাহলে তাকে মুরতাদ অথবা ফাসেক অথবা এমন কিছু কেন বলা হয় না? কেন আপনি এই ব্যক্তি ও ঐ ব্যক্তির মাঝে পার্থক্য করেছেন, অথচ উভয়ের কাজ এক”!? 

তখন আমরা বলবো যে, “অবস্থার ভিন্নতার কারণে উভয় ব্যক্তির হালাত ভিন্ন রকম। এই ব্যক্তির ব্যাপারে আমরা ভালো ছাড়া মন্দ কিছু জানি না। সে এর দ্বারা ভালো বৈ মন্দ কিছু ইচ্ছা করেনি। কিন্তু তার পদ্ধতি ভুল হয়েছে। আমরা তার ভুলকে স্বীকৃতি দেই না এবং তা অস্বীকার করি। তার ভুলকে স্পষ্ট করে দেই। কখনো কখনো বিষয়টি কঠোর তিরস্কার ও বর্জনের দিকে গড়ায়”। যেমনটি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাব ইবনে মালিক ও মুরারাহ ইবনে রাবি’ এর সাথে করেছিলেন। তারা শ্রেষ্ঠ সাহাবীদের মধ্য থেকে হওয়া সত্ত্বেও তাদের সাথে কথা-বার্তা ও সম্পর্ক বর্জন করা হয়েছিল। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুনাফিকদের সাথে কথা-বার্তা বন্ধ করেননি, যারা শুধু গাযওয়ায়ে তাবুকই নয়, বরং অন্যান্য আরও অনেক গাযওয়া’তে পিছনে রয়ে গিয়েছিল এবং ইসলামের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছিল। 

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই মর্যাদাবান ব্যক্তিবর্গ ও ঐসকল লোকদের মাঝে পার্থক্য করেছিলেন। সেসময়কার মুনাফিক ও বিরোধীরা অন্যায় করার পরও স্বীকার করেনি। বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে মিথ্যা বলেছে। অতঃপর তাওবা করতে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য ইস্তেগফার করেছেন। 

আর এই সাহাবারা নিজেরাই এসেছেন, অপরাধ স্বীকারও করে নিয়েছিলেন। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সত্য বলেছেন। এতদাসত্ত্বেও তাদেরকে হুজুর শাস্তি দিয়েছেন। কেন? 

তাদের অগ্রগামিতা, মর্যাদা ও সততার কারণে। এখানেই রয়েছে উভয় দলের সাথে আচরণগত পার্থক্য।

যে তাবিল ও ইজতিহাদের কারণে ভুল করেছে অথবা কুফরে পতিত হয়েছে এবং এই ইজতিহাদ ও তাবিলের প্রমাণও রয়েছে – এমন ব্যক্তির ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, 

“যে ব্যক্তি এমন কোন কাজ ইবাদত হিসেবে করে এবং সে মনে করে যে এই আমলের মাধ্যমে সে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবে অথবা সে এমন কথা বা কাজ করবে যা আল্লাহ শরীয়তসম্মত করেননি – তাহলে সে দ্বীনের মধ্যে এমন আইন রচনা করলো, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি এবং এ ক্ষেত্রে যে তাকে অনুসরণ করলো, সে তাকে আল্লাহর সাথে শরীক করলো। সেই ব্যক্তি অন্যদের জন্য এমন আইন রচনা করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ তাকে দেননি। 

হ্যাঁ, আইন প্রণয়নকারী কখনও কখনও কোনো ব্যাখ্যার কারণে এমনটি করে থাকে। তাই তার এই তাবিলের কারণে আশা করি তাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর যদি সে মুজতাহিদ হয়, তাহলে ভুল ইজতাহিদের কারণে ক্ষমা করে দেওয়া হবে এবং ইজতিহাদের কারণে সাওয়াবও দেওয়া হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তার অনুসরণ জায়েজ হবে না। এমনিভাবে প্রত্যেক ওই ব্যক্তির অনুসরণ জায়েজ নেই, যে এমন কথা বলে বা কাজ করে, যার বিপরীত সঠিকটা জানা আছে। যদিও বক্তা বা কর্তা নেকি পাবে অথবা ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে”। 

অর্থাৎ কোন ব্যক্তি যদি এমন কোন কাজ করে, যা আল্লাহর শরীয়তের বিপরীত, আর সে কোনো ব্যাখ্যার আশ্রয়ে অথবা ইজতিহাদের কারণে এমনটা করে তাহলে সে মাজুর হবে। কিন্তু যে ব্যক্তি – এই কথাটি বা কাজটি আল্লাহর শরীয়তের বিপরীত – এটি স্পষ্ট হওয়ার পরও তার অনুসরণ করবে সে গুনাহগার হবে। কেননা সে সঠিক বিষয়টি জেনেছে। 

যাই হোক আমরা দ্বিতীয় মূলনীতি শেষ করলাম। এখন আমরা আলোচনা করবো বিদআতি ও বিরোধীদের সাথে আচরণবিধি সম্পর্কে। 

আমরা আমাদের আলোচনায় পার্থক্য নিরূপণ করেছি তাদের মাঝে যাদের একজন প্রবৃত্তি ও শৈথিল্যের কারণে ভুলে পতিত হয়েছে এবং প্রবৃত্তি ও শৈথিল্যকে দুনিয়া, মর্যাদা ও বাড়ি-গাড়ি ইত্যাদির উপার্জনের সাথে সংযুক্ত করেছে। আর অপর আরেক ব্যক্তি যে, ইজতিহাদ ও তাবিলের কারণে ভুল ও বিদআতে পতিত হয়েছে। 

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ বলেছেন- 

“অতঃপর কেউ কেউ বিশেষ ব্যাখ্যার দ্বারা মদের কোন কোন প্রকারকে হালাল মনে করে। যেমন আহলে কুফারা এমনটা মনে করে।…(ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ দীর্ঘ আলোচনার পর বলেন) মদের একটা প্রকারকে হালালকরণ – এটা ইজতিহাদি ভুলের কারণে হয়েছে। তিনি ব্যাখ্যায় ভুল করেছেন। অথচ তিনি ঈমানদার এবং তিনি সাওয়াবের প্রত্যাশা করেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এই উম্মতের ভুল ক্ষমা করে দিয়েছেন। আল কুরআনে আছে-

رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا

“অর্থঃ হে আমাদের পালনকর্তা, যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদেরকে অপরাধী করো না”। (সূরা বাকারা ২:২৮৬)

এই বিষয়টি তেমন – যেমন কেউ কেউ (ربا الفضل) রিবা আল ফদলকে (সুদের একটি প্রকারের নাম) হালাল মনে করেছেন। কেউ সুর-সংগীত শ্রবণকে জায়েজ মনে করেছেন। কেউ কেউ বিশেষ ব্যাখ্যার সাথে কতলকে জায়েজ বলেছেন।

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু (ربا الفضل) রিবা আল ফদলকে (সুদের একটি প্রকারের নাম) বৈধ মনে করতেন। আবু সাইদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু তার সাথে এই বিষয়ে কথা বলেন। আমরা এটা দেখতে পাইনি যে, আবু সাইদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বা অন্যকোনো সাহাবী ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সরাসরি কাফির বলেছেন। না, এমনটা কেউ বলেননি।

ইবনে হাজাম জাহেরী রহিমাহুল্লাহ’র বিষয়টাও এমন। কোনো উলামা ইবনে হাজাম জাহেরীকে কাফের বলেছেন বলে আমাদের জানা নেই। সংগীত ও বাদ্যযন্ত্রের বৈধতার হাদিসগুলো জয়িফ। কিন্তু ইবনে হাজাম গানের বৈধতা দেন। এজন্য কেউ তাকে কাফের বলেননি।

ঠিক একইভাবে সিফাতে বারি তায়ালা নিয়েও তার কিছু কথা আছে। ইবনে হাজাম জাহেরী জাহমিয়া মতালম্বী ছিলেন। আল্লাহ তায়ালার সিফাত নিয়ে কথা বলাতে তাকে বেত্রাঘাতও করা হয়। এতদসত্বেও আপনারা দেখবেন যে, উলামায়ে কিরাম তাকে সম্মানসূচক শব্দে পরিমাপ করতেন। তিনি হলেন শাইখ ও প্রশংসিত জ্ঞানীদের একজন, ইবনে হাজাম জাহেরী একজন স্বতন্ত্র মতের অধিকারী বিজ্ঞ আলেম।

অপর দিকে আমরা যখন ইবনে হাজাম জাহেরী এর অবস্থা লক্ষ্য করি আমরা দেখতে পাই যে, তার মত করে আর কেউ মুরজিয়া সম্প্রদায়কে দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে পারেনি। তিনি মুরজিয়া আকিদাকে ভ্রান্ত আকিদা ও তাদের বিদআতকে শয়তানি বলেছেন।

অনুরূপভাবে আমরা শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহকে দেখি, তিনি আশআরি ও মুতাযিলা উলামাদের ব্যাপারে মতামত দিয়েছেন। আশআরিদের বিষয়টা মুতাযিলাদের চেয়ে সহজতর। মুতাযিলারা তো বিদআতে মুকাফফারায় লিপ্ত। তারা আল্লাহ তায়ালার সিফাতকে অস্বীকার করে। অথচ তিনি তাদের ব্যাপারে বলেন যে, ফালসাফা ও নাস্তিকদের প্রতিহত করার ক্ষেত্রে তাদের একটা অবস্থান রয়েছে।

তো এই সকল বিষয়গুলো মীযানে ওজন করা হবে। ইনশাআল্লাহ এই বিষয়ে সামনে বিস্তারিত আলোচনা আসবে।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, 

“কেউ কেউ কারো কতলের ব্যাপারে জায়েজ বলেছেন। সুতরাং এই বিষয়গুলো যা ঈমানদার ও নেককার শ্রেণীর থেকে হয়ে থাকে তা হয় কুফরির মত গুনাহ বা ক্ষমাযোগ্য গুনাহ কিংবা ক্ষমাযোগ্য ভুল। এরপরেও কুরআন সুন্নাহ যে দিকনির্দেশনা দেয় এবং যে আদেশ-নিষেধ করে যথাসাধ্য তার বিবরণ তুলে ধরা অপরিহার্য”।

এর মানে এই নয় যে বিদআতে বা কুফরিতে যারা লিপ্ত তাদের আমরা কাফের বলব না। তাদের বিদআত ও ত্রুটির ব্যাপারে চুপ থাকব – বিষয়টা এমন নয়। অবশ্যই তাদের অসংগতিগুলো তুলে ধরতে হবে।

ইবনে তাইমিয়াহ রহিমাহুল্লাহ ক্ষমার যোগ্য ভুলকারী ও শাস্তির যোগ্য ভুলকারীর পার্থক্য করে বলেন –

“যে ব্যক্তি ভুল করল ঐশী আদেশ মানার ক্ষেত্রে শৈথিল্য করার কারণে অথবা হুদুদুল্লাহ সীমালঙ্ঘন করার কারণে কিংবা সে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এই ভুল করল – তাহলে যে নিজের উপর অবিচারকারী হিসেবে গণ্য হবে – গুনাহগার হবে। সে শাস্তিযোগ্য বলে গণ্য হবে। 

পক্ষান্তরে যে মুজতাহিদ জাহেরি ও বাতেনি উভয় ক্ষেত্রে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য প্রকাশ করে এবং আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নির্দেশিত পথে ইজতিহাদ করে তাকে তার ভুলের কারণে ক্ষমা করে দেয়া হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مِن رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ ۚ كُلٌّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّسُلِهِ ۚ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا ۖ غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ﴿﴾لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا ۚ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ ۗ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا

“অর্থঃ রাসূল বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানরাও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমূহের প্রতি এবং তাঁর পয়গম্বরগণের প্রতি। তারা বলে আমরা তাঁর পয়গম্বরদের মধ্যে কোন তারতম্য করিনা। তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং কবুল করেছি। আমরা তোমার ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তা। তোমারই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না, সে তাই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই তার উপর বর্তায় যা সে করে। হে আমাদের পালনকর্তা, যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদেরকে অপরাধী করো না। (সূরা বাকারা ২:২৮৫-২৮৬) 

সহিহ মুসলিমে এসেছে – আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি (ক্ষমা) করলাম। অনুরূপভাবে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু এর বর্ণনায় এসেছে যে, যে এই দুই আয়াত এবং সুরা ফাতিহা পড়ে দুআ করবে আল্লাহ তায়ালা তার দুআ কবুল করবেন। 

সুতরাং এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দুআ কবুল হওয়া এবং মুমিনদের ভুল ও ভুলে যাওয়া বিষয়ে আল্লাহ পাকড়াও করবেন না – এটা প্রমাণিত করে। 

ইবনে তাইমিয়াহ রহিমাহুল্লাহ – ইজতিহাদ ও তাবিলে উলামায়ে উম্মাত কোনো ভুল করে থাকলে সে ক্ষেত্রে – বলেন, 

“উলামায়ে মুসলিমিন দুনিয়াতে তাদের ইজতিহাদের ভিত্তিতে মুতাকাল্লিম। তাই তাদের কথায় কোনো ভুল পাওয়া গেলেই তাদের কাফের বলা যাবে না। কেননা উলামায়ে মুসলিমিনকে জাহেলরা কাফের বলে থাকে যা একটি জঘন্য কাজ। মূলত এই কাজটা খাওয়ারেজ ও রাফেজিরা করে। তারাই উলামায়ে মুসলিমিনকে কাফের বলে থাকে। কেননা তারা মনে করে যে মুজতাহিদরা দ্বীনের ব্যাপারে ভুল করেছেন।

আর আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত এই ব্যাপারে ঐক্যমত যে, উলামায়ে মুসলিমিনকে শুধু ভুলের উপর ভিত্তি করে কাফের বলা জায়েজ নেই। বরং প্রত্যেকেই তাদের সুন্নাহ মুতাবেক কথাকে গ্রহণ করে থাকে।

তাদের কোনো ভুলের কারণে তাদের কথা গ্রহণ না করায় কুফরি, ফাসেকি বা গুনাহ কিছুই হবে না। মুমিনদের দুআর বিবরণ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا

“অর্থঃ হে আমাদের পালনকর্তা, যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদেরকে অপরাধী করো না”। (সূরা বাকারা ২:২৮৬)

সহিহ হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি তোমাদের দুআ কবুল করলাম। 

ইবনে তাইমিয়াহ বলেন, 

“এটা ঠিক যে, আমি এই বিষয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে অনেক আলোচনা করেছি। এই বিষয়ে আলোচনাও অনেক”।

তিনি আরও বলেন, 

“ব্যাখ্যা সাপেক্ষে যারা বিদআতে জড়িয়ে পড়ে এবং তাদের মাকসাদ থাকে শুধু রাসূলের অনুসরণ – তাদের ইজতিহাদি ভুলের কারণে কাফের বা ফাসেক বলা হবে না। এটা আমলের বিধিবিধানের ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ মতামত। আর আকিদার বেলায় অনেক মানুষ ইজতিহাদি ভুলের কারণে তাদের কাফের বা ফাসেক বলে থাকে। তবে এই মতামত কোনো সাহাবা কিংবা তাবেইদের থেকে জানা যায়নি। এমনকি কোনো আইম্মায়ে মুসলিমিনের পক্ষ থেকেও এ ধরণের মতামত আসেনি।

এটা মূলত বিদআতিদের মতামত, যারা বিদআত করে থাকে এবং তাদের মুখালিফ বা প্রতিপক্ষকে কাফের বলে। যেমন- খাওয়ারেজ, মুতাযিলা, জাহমিয়া ইত্যাদি। এদের সাথে ইমামদের কিছু অনুসারী শামিল আছেন। যেমন- ইমাম শাফেঈ ও আহমাদ রহিমাহুল্লাহ এর অনুসারীরা। তারা বিদআতিদের বিনা শর্তে কাফের বলেন। তাদের এই মতের বিপক্ষে যারা বলেন তাদেরকে বিদআতি বলে গণ্য করেন।

এগুলো খারেজি, মুতাযিলা ও জাহমিয়াদের মত। এই রায় আইম্মায়ে আরবাআ এবং অন্যান্য ইমামদের। তারা সকল বিদআতিদের কাফের বলেন না। বরং তাদের থেকে যে মতামত পাওয়া যায় তা বিরোধপূর্ণ।

কিন্তু কখনও তাদের (উলামায়ে কেরামের) কারো কারো থেকে এমন বক্তব্য বর্ণনা করা হয় যে, কোন ব্যক্তির উচ্চারিত একটি বক্তব্য কুফুরি বলে গণ্য। এক্ষেত্রে সে বক্তব্যকে কুফরি বলার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, কেবল মূল বক্তব্যটি কুফরি এবং একে কুফরি বলা হলে এ জাতীয় কথা থেকে মানুষ বেঁচে থাকবে। কিন্তু এর দ্বারা এটা জরুরী নয় যে, অজ্ঞতা ও তাবিল সহকারে যে কেউ সে বক্তব্যটি উচ্চারণ করলেই তাকে তাকফির করা হবে। ……… 

শেষে এসে তিনি বলেন: বিদআতপন্থীদের একটি দোষ হল তারা এক গোষ্ঠী অপর গোষ্ঠীকে তাকফীর করে। আর সত্যিকার উলামায়ে কেরামের একটি প্রশংসনীয় দিক হচ্ছে, তারা ভুল করেন কিন্তু ঢালাওভাবে তাকফির করেন না”।

আর আমাদের উপরোক্ত বক্তব্য দ্বিতীয় মূলনীতির ভেতর পড়বে।

(Visited 37 times, 1 visits today)