অনুরাগী হোন!

শায়খ খালিদ বাতারফি

আমাদের জাতি আজ যে ফেতনা ও বিভক্তির মধ্য দিয়ে পথ অতিক্রম করছে এবং সঠিক পথ অনুসন্ধান করতে গিয়ে মুসলিমগণ যে অস্থিরতায় মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা এই হাদিসে কুদসিরই বাস্তব নমুনা।

এটি ইমাম মুসলিম রহিমাহুল্লাহ আবু যর রাযিয়াল্লাহু তাআআলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন: নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

عَنْ أَبِي ذَرٍّ الْغِفَارِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه و سلم فِيمَا يَرْوِيهِ عَنْ رَبِّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى، أَنَّهُ قَالَ: “يَا عِبَادِي: إنِّي حَرَّمْت الظُّلْمَ عَلَى نَفْسِي، وَجَعَلْته بَيْنَكُمْ مُحَرَّمًا؛ فَلَا تَظَالَمُوا. يَا عِبَادِي! كُلُّكُمْ ضَالٌّ إلَّا مَنْ هَدَيْته، فَاسْتَهْدُونِي أَهْدِكُمْ

“আল্লাহ্ বলেছেন:”হে আমার বান্দাগণ! আমি জুলুমকে আমার জন্য হারাম করে দিয়েছি, আর তা তোমাদের মধ্যেও হারাম করে দিয়েছি; অতএব তোমরা একে অপরের উপর জুলুম করো না। 

হে আমার বান্দাগণ! আমি যাকে হেদায়েত দিয়েছি সে ছাড়া তোমরা সকলেই পথভ্রষ্ট। সুতরাং আমার কাছে হেদায়েত চাও, আমি তোমাদের হেদায়েত দান করব”। (সহীহ মুসলিম – ২৫৭৭)

তাই এই সংশয়ের যুগে, পথভ্রষ্টতা ও প্রবৃত্তিপূজার আধিক্যের যুগে – আমাদের জন্য হেদায়েত অন্বেষণের বিভিন্ন উপায়-উপকরণ অবলম্বন করা প্রয়োজন। তন্মধ্যে একটি উপায় হল – ইনাবাত তথা অনুরাগ বা মনোযোগ। 

আল্লামা জুরজানির সংজ্ঞামতে ইনাবাত হল, অন্তরকে সংশয়ের আঁধার থেকে মুক্ত করা।

কেউ বলেন: ইনাবাত হল, সবকিছু থেকে ফিরে সবকিছুর মালিকের দিকে ধাবিত হওয়া।

কেউ বলেন: ইনাবাত হল, উদাসীনতা থেকে স্মরণের দিকে এবং অপরিচিত ভাব থেকে ঘনিষ্ঠতার দিকে ফেরা।

আন নিহায়াহ গ্রন্থে এসেছে: ইনাবাত হল, তওবার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফেরা। 

বলা হয় – সে প্রত্যাবর্তন করেছে, সে প্রত্যাবর্তন করে, প্রত্যাবর্তন করণ, সুতরাং সে একজন প্রত্যাবর্তনকারী- যখন কেউ আগমন করে ও প্রত্যাবর্তন করে।

 

ইনাবাতের মধ্যেই হেদায়েত:

আল্লাহর কিতাব থেকে এর দলিল হল, আল্লাহর বাণী-

اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَنْ يُنِيبُ  

“আল্লাহ যাকে চান বেছে নিয়ে নিজের দিকে টানেন। আর যে কেউ তাঁর অনুরাগী হয়, তাকে হেদায়েত দান করেন।” (সূরা আশ-শূরা 42:১৩)

সুতরাং যখন মানুষ আল্লাহর অনুরাগী হয় এবং তার স্বাভাবিক নীতি হয়ে যায় আল্লাহর প্রতি অনুরাগ ও তার দিকে ফেরা, তখন এটাই আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে সত্যের দিকে পথনির্দেশ করার এবং সে যে অস্থিরতার মধ্যে ছিল তা থেকে উত্তরণের একটি উপলক্ষ বা কারণ হয়।

ইবনে কাসির রহিমাহুল্লাহ বলেন: “আল্লাহ যাকে চান বেছে নিয়ে নিজের দিকে টানেন। আর যে কেউ তাঁর অনুরাগী হয়, তাকে হেদায়েত দান করেন।”- অর্থাৎ তিনিই হেদায়েতের উপযুক্ত ব্যক্তির জন্য হেদায়েত নির্ধারণ করেন আর যে সঠিক পথের উপর পথভ্রষ্টতাকে প্রাধান্য দেয়, তার জন্য পথভ্রষ্টতা লিখে দেন। একারণেই তিনি বলেছেন:

وَمَا تَفَرَّقُوا إِلَّا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ

“আর তারা যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে, তা করেছে তাদের কাছে নিশ্চিত জ্ঞান আসার পরই।” (সূরা আশ-শূরা 42:১৪)

অর্থাৎ তারা তাদের নিকট হক পৌঁছে যাওয়া এবং তার ব্যাপারে প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার পরও হকের বিরোধিতা করেছে। একমাত্র অবাধ্যতা, অহংকার ও কষ্টই তাদেরকে এতে প্ররোচিত করেছিল।

ইবনে কাসির রহিমাহুল্লাহর কথা থেকে আমাদের নিকট প্রতিভাত হয় যে, মানুষ যখন অনুরাগী হতে চায় এবং অনুরাগী হয়ে যায়, তখন আল্লাহ তা’আলা তাকে হেদায়েত দান করেন।

সা’দী রহিমাহুল্লাহ বলেন:

“আর যে কেউ তাঁর অনুরাগী হয়, তাকে হেদায়েত দান করেন”-এই যে কারণটা, যেটার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর হেদায়েত লাভ করে, তা হল নিজ রবের প্রতি অনুরাগ তৈরি হওয়া ও মনোযোগ সেদিকে দেয়া। অন্তরের উদ্দীপনাগুলো তখন সেদিকেই আকৃষ্ট হয়। সুতরাং বান্দার পক্ষ থেকে হেদায়েত অনুসন্ধানের পরিশ্রমসহ যেকোন ভালো ইচ্ছাই আল্লাহর পক্ষ থেকে হেদায়েত সহজ করে দেওয়ার একটি উপলক্ষ বা কারণ। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন:

يَهْدِي بِهِ اللَّهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلَامِ

“এর মাধ্যমে আল্লাহ যারা তাঁর সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করে, তাদেরকে শান্তির পথ দেখান।” (সূরা মায়িদা ৫:১৬)”

(সা’দী রহিমাহুল্লাহর বক্তব্যটি শেষ হল।)

এমনভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরো বলেন:

قُلْ إِنَّ اللَّهَ يُضِلُّ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَنْ أَنَابَ

“বলে দাও, আল্লাহ যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন। আর তিনি তাঁর পথে কেবল তাদেরকেই হেদায়েত (দিশা) দান করেন, যারা তার অনুরাগী হয়।” (সূরা আর-রা’দ ১৩:২৭)

তাই যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে ফিরে, পূর্বকৃত সকল গুনাহ থেকে তওবা করার মাধ্যমে সর্বদা আল্লাহর প্রতি অনুরাগী থাকে, আল্লাহর হুকুমে এটাই তার হেদায়েতের কারণ হয়। সেই অস্থিরতা থেকে নিষ্কৃতি লাভের কারণ হয়, যা আজ গোটা ইসলামী বিশ্বকে ছেয়ে ফেলেছে। কেবল যাদের উপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা রহম করেছেন, তারা ব্যতীত।

ইবনে কাসির রহিমাহুল্লাহ বলেন: “বলে দাও, আল্লাহ যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন। আর তিনি তাঁর পথে কেবল তাদেরকেই হেদায়েত (দিশা) দান করেন, যারা তাঁর অনুরাগী হয়”- অর্থাৎ যে আল্লাহর প্রতি মনোযোগী হয়, তার দিকে ফিরে, তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে এবং অনুনয়-বিনয় করে।

ইমাম বাগাবী রহিমাহুল্লাহ বলেন: এই মনোযোগের কারণে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তার দিকে পথপ্রদর্শন করেন। কেউ এভাবে ব্যাখ্যা করেন: যে অন্তর দিয়ে তার দিকে ফিরে, তিনি তাকে নিজ দ্বীনের পথ দেখান।

সুতরাং এর মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, ইনাবাত বা অনুরাগ হেদায়েত লাভের একটি মাধ্যম এবং কারণ।

এমনভাবে আল্লাহর আয়াতসমূহ স্মরণ করাও হেদায়েত লাভের একটি মাধ্যম। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আয়াতসমূহ স্মরণ করার কারণসমূহ থেকে একটি কারণ হল – আল্লাহর দিকে অনুরাগী হওয়ার পর তার আয়াতসমূহ দ্বারা যেন সত্যকে বুঝা এবং জানা যায়। আল্লাহর এই বাণীই তা প্রমাণ করে-

وَمَا يَتَذَكَّرُ إِلَّا مَنْ يُنِيبُ

“উপদেশ তো সেই গ্রহণ করে, যে (আল্লাহর প্রতি) অনুরাগী হয়।” (সূরা মু’মিন ২৩:১৩)

ইবনে আতিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন: আল্লাহর বাণী- “উপদেশ তো সেই গ্রহণ করে, যে (আল্লাহর প্রতি) অনুরাগী হয়”- এর অর্থ হল, এমনভাবে গ্রহণ করা, যা গ্রহণযোগ্য এবং যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে উপকৃত করে। কারণ আমরা দেখি, অমনোযোগীও উপদেশ গ্রহণ করে। কিন্তু যেহেতু সেটা উপকারী নয়, একারণে সেটাকে ‘উপদেশ গ্রহণ করা হয়নি’ বলে গণ্য করা হয়েছে।

আল্লাহর কিতাবে আমাদেরকে অনুরাগীদের পথ অনুসরণ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ তারাই অন্যান্য মানুষের তুলনায় হেদায়েতের অধিক নিকটবর্তী। তাই অনুরাগীদের পথ অনুসরণ করার দ্বারা আমরাও সত্যের দিশা, তথা হেদায়েত পেতে পারব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ

“এবং সেই ব্যক্তির পথ অনুসরণ কর, যে আমার অভিমুখী হয়েছে।” (সূরা লোকমান ৩১׃১৫)

ইমাম সা’দী রহিমাহুল্লাহ বলেন: “এবং সেই ব্যক্তির পথ অনুসরণ কর, যে আমার অভিমুখী হয়েছে”- তারা হল, যারা আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাসী, তাদের রবের কাছে আত্মসমর্পণকারী এবং তাঁর অনুরাগী। তাদের পথের অনুসরণ করার অর্থ হল, আল্লাহর প্রতি মনোযোগী হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের নীতি অনুসরণ করা অর্থাৎ অন্তরের উদ্দীপনা ও ইচ্ছাগুলো আল্লাহর দিকে আকৃষ্ট হওয়ার পর সেই কাজের জন্য শারীরিক চেষ্টা-প্রচেষ্টা করা, যা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে এবং তাঁর নিকটবর্তী করে দেয়।

সুতরাং আমরা আল্লাহর অনুরাগী হওয়ার মাধ্যমে হেদায়েতের পথ জানতে পারব। এই আদর্শের উপরই ছিলেন জাতির পিতা ইবরাহীম খলিলুল্লাহ আলাইহিস সালাম। যেমন আল্লাহ তা’আলা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের বিষয়টি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:

إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَحَلِيمٌ أَوَّاهٌ مُنِيبٌ

“নিশ্চয়ই ইবরাহীম অত্যন্ত সহনশীল, (আল্লাহর স্মরণে)অত্যধিক উহ্-আহ্কারী (এবং সর্বদা আমার প্রতি)অনুরাগী ছিল।” (সূরা হুদ ১১:৭৫)

একারণেই ইবরাহীম আলাইহিস সালাম জাতির নেতা ছিলেন এবং সৃষ্টিজীবের হেদায়েতের মাধ্যম ছিলেন।

আমাদেরকে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের আদর্শ অনুসরণ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম একটি জাতি ছিলেন, যেমনটা আল্লাহ তা’আলা উল্লেখ করেছেন। জাতির নেতা ও নবীদের বাবা ইবরাহীম আলাইহি সালাম অনুরাগী-মনোযোগীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। একারণেই তিনি আল্লাহর হুকুমে হেদায়াতপ্রাপ্তদের প্রধান হয়েছেন।

মহান আরশের অধিপতি মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে অনুরাগীদের অন্তর্ভুক্ত করেন এবং তার সরল-সঠিক পথের হেদায়েত (দিশা) দেন। নিশ্চয়ই তিনি এ কাজে সক্ষম এবং দু’আ কবুলকারী।

আমাদের সর্বশেষ কথা: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক।

(Visited 28 times, 1 visits today)