সাইবার যুদ্ধ

শায়খ আবু উবাইদা আল-কুরাইশী

 মার্কিন প্রশাসন মুজাহিদদের বিরুদ্ধে সমস্ত ক্ষেত্রে প্রধানত:  সামরিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিজয় অর্জনের জন্য মিডিয়াকে সর্বশক্তি দিয়ে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে।

তবে, আমেরিকার প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর পদ্ধতিগুলো বিগত দশক ধরে যেভাবে কার্যকর ছিল সেভাবে এখন আর কার্যকর নয়।

আর এর কারণ হল, আমেরিকা নিজেই এখন ভিলেনের  মসনদে জেঁকে বসেছে। এটা আল্লাহর দয়া ও অনুকম্পারই প্রতিফল, আর তিনিই আদি থেকে অনাদি সব কর্তৃত্বের একচ্ছত্র অধিপতি।

১. আমেরিকা ও প্রতারণাঃ ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ

এ কথা সুস্পষ্ট যে আমেরিকার ইতিহাস হচ্ছে অত্যাচার ও প্রতারণার ইতিহাস। তবে এ প্রতারণা শুধুমাত্র তথ্যপ্রযুক্তি বা মিডিয়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং এগুলো ছাড়াও অন্যান্য অঙ্গনে যখন যেভাবে পেরেছে আমেরিকা প্রতারণা করে গেছে। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, তারাই বিজয় অর্জন করেন, যাদেরকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বিজয় দিতে ইচ্ছে করেন।

অনেকেই অবাক হয়ে যাবে যখন তারা জানবে একসময়  আমেরিকা আঞ্চলিক অঙ্গনে কেবল এক ছোট খেলোয়াড় ছিল।

পরে, ঘৃণ্য লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতারক আমেরিকা তার ছদ্মবেশী মিডিয়া ব্যবহার শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট কিউবার হাভানা বন্দরে “ইউএসএস মেইন” [1] ডুবে যাওয়ার ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করার জন্য সংবাদপত্রের মালিকদের[2] প্ররোচিত করেছিল[3],[4]

রুজভেল্ট, স্পেনের সাথে যুদ্ধ করার জন্য  অজুহাত খুঁজছিল। ক্যারিবিয়ান সাগর এবং ফিলিপাইনে স্পেনীয় উপনিবেশ স্থাপন আমেরিকার স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাই স্পেনের উপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তৃষ্ণার্ত আমেরিকা USS Maine ঘটনাকে ব্যবহার করে সাধারণ জনগণকে  ক্ষেপিয়ে তোলে। এ যুদ্ধ একটি আবেগতাড়িত যুদ্ধ ছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘটনাবলী এবং ইউএসএস মেইন সংক্রান্ত  ঘটনার দ্বারা প্রোপাগান্ডা চালিয়ে  তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson) জনগণকে যুদ্ধের দিকে টানতে সফল হয়েছিল।

তারা জার্মান বাহিনীকে নৃশংস ঘাতক হিসেবে উপস্থাপন করে প্রোপাগান্ডা চালিয়েছিল। জনগণকে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য খেপিয়ে তুলেছিল। তারা প্রোপাগান্ডা চালিয়েছিল যে, ইউরোপীয় শিশুদেরকে বর্বর জার্মানরা নৃশংসভাবে হত্যা করছে।[5]

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার রাজনৈতিক প্রচার প্রচারণা, মিডিয়া এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের উৎকৃষ্ট উদাহরন হল – পার্ল হারবার (অপারেশন জেড.কে.) হামলার[6] ঘটনাকে প্রোপাগান্ডার জন্য সফলভাবে ব্যবহার করা। এটা এমন এক আক্রমণ ছিল, যা চিত্রায়িত করা সত্যিই কঠিন। যুদ্ধের পুরোটা সময় আমেরিকা এই পার্ল হারবারের ঘটনাকে ব্যবহার করে জনগণকে যুদ্ধ করার জন্য উজ্জীবিত রেখেছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আরেকটি সামরিক অভিযান, মনস্তাত্ত্বিক ফ্রন্টে পূর্ণ মাত্রায় ব্যবহৃত হয়েছিল। আর তা হল নরম্যান্ডি যুদ্ধ । ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে  আমেরিকা ও তার মিত্ররা সম্মিলিতভাবে হিটলারের বাহিনীর উপর হামলা চালায়।

হিটলারের বাহিনী ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলের এই উপকূলীয় অঞ্চল দখল করে রেখেছিল। তাদের বিরুদ্ধে আমেরিকা, ব্রিটেন ও কানাডার সেনাবাহিনী এ হামলায় অংশ নিয়েছিল। এর ফলে জার্মানদের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছিল।  এই ঘটনাকে আমেরিকা প্রোপাগান্ডা চালানোর কাজে ব্যবহার করেছিল।

১৯৫৪ সালের ২রা আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন  রাষ্ট্রপতি লিন্ডন বি জনসন  দাবি করেছিল যে উত্তর ভিয়েতনামের টর্পেডো একটি মার্কিন যুদ্ধ জাহাজে আঘাত করেছে। তার এ দাবি ছিল মিথ্যা। প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন, ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেবার জন্য হন্য হয়ে ছুটে এসেছিল কংগ্রেসে।

এই ইস্যুটিই শেষ পর্যন্ত উত্তর ভিয়েতনাম এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়াও, এটা ছিল দক্ষিণ ভিয়েতনাম যুদ্ধের বড় ধরনের পূর্বাভাস । এরপর, আমেরিকা ৬০-এর দশকের শুরুতে ভিয়েতনাম যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে।

দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ব্যবহার করা হয়েছিল প্রচুর পরিমাণে। মিথ্যা প্রোপাগান্ডার  সাড়া জাগানো একটি ঘটনা হল – Congressional Human Rights Caucus এ  নায়িরাহ নামের এক মহিলা উপস্থিত হয়ে দাবি করলো যে,  সে দেখেছে  ইরাকি সৈন্যরা হাসপাতালের ইনকিউবেটর[7] থেকে কুয়েতি শিশুদের বের করে ফেলেছে।

তারপর শিশুদের মৃত্যুর জন্য ফেলে রেখে ইনকিউবেটর নিয়ে চলে গিয়েছে। পরে দেখা গেল যে, এটি পুরোটাই  বানোয়াট গল্প।[8]

সামরিক স্তরেও একই ধরণের প্রতারণা করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল আমেরিকার এই অভিযান ক্লাসিক পদ্ধতিতে পরিচালিত  হবে। যার অর্থ সীমিত বিমান হামলা, এবং তারপরে স্থল আক্রমণ।

আক্রমণের পরবর্তী সময়ে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখা গেল- সীমিত বিমান হামলার কথা বলা হলেও ঘটনা ঘটেছিল তার বিপরীত। একটানা চল্লিশ দিন বিমান হামলা চালানো হয়েছিল। সেই সাথে কুয়েত এবং সৌদি আরব থেকে স্থল আক্রমণ চালানো হয়েছিল­­[9]

পৃথিবীর ইতিহাসে আমেরিকাই একমাত্র দেশ যা যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র (জাপানের বিরুদ্ধে), রাসায়নিক অস্ত্র (ভিয়েতনাম – ইরাক – আফগানিস্তান), এমনকি বায়োলজিক্যাল অস্ত্র (কোরিয়ার যুদ্ধে) ব্যবহার করেছে[10]। অথচ একই ধ্বংসাত্মক ও গণবিধ্বংসী অস্ত্র রাখার অভিযোগে এই আমেরিকা ইরাকে হামলা চালিয়েছে[11]!

২.ক্রসেডার: আমেরিকা ও প্রতারণা

যখন থেকে আমেরিকা প্রতারণার মাধ্যমে ক্রুসেডের বাজনা বাজাতে শুরু করে, তখন থেকেই তারা মুসলিম ভূমিতে  হামলার জন্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক জনমত গঠন শুরু করে। এটা শুরু হয়েছিল আফগানিস্তানের মাধ্যমে। আমেরিকা যে পদ্ধতিতে প্রতারণা চালিয়েছিল তা নিম্নরূপ:

  • আরব এবং অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের সরকারগুলোকে একটি বিশাল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মাধ্যমে অবরোধ করে রাখা। এবং পরবর্তীতে এই অবরোধ কেউ যেন ভাংতে না পারে সেটা নিশ্চিত করা।
  • পশ্চিমা বিশ্বে ইসলাম ও মুসলিমদের উপস্থিতির বিরুদ্ধে মিথ্যা ইতিহাস ভিত্তিক প্রচার প্রচারণা ব্যাপকভাবে চালানো। সেইসাথে সকল প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামিক দলগুলোর বিরুদ্ধে একটি সংগঠিত অভিযান পরিচালনা করা।
  • মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে এমনভাবে ক্রুসেড পরিচালনা করা যেন এই অঞ্চলটিতে কিয়ামতের বিভীষিকা গ্রাস করে। মূল লক্ষ্য হল আল-কায়েদাকে তার চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন ও কোণঠাসা করা। আর এজন্য ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ভয়-ভীতি ছড়িয়ে দেওয়া।

মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের দায়িত্বে থাকা সামরিক বিভাগ, আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে সামরিক তত্পরতা আরও তীব্র করেছিল। ইরাকের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় যে পদ্ধতি কাজ করেছিল, আফগানে তার পুনরাবৃত্তি করার চেষ্টাও তারা করেছিল।

পূর্ববর্তী পদ্ধতিতে – সর্বাধিক সংখ্যক ইরাকি সেনাদের নিষ্ক্রিয় করার জন্য প্রধানত দুটি বিষয়ের দিকে মনোযোগ দেয়া হয়েছিল। এগুলো হল

১. তাদের অন্তরে মৃত্যুর ভয় তৈরি করা/ বৃদ্ধি করা।

২. রাজনীতির মাধ্যমে ফায়দা গ্রহণের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করা।[12]

তবে, শীঘ্রই এই পদক্ষেপগুলি অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল। মুজাহিদরা এমনিতেই শাহাদাতের সন্ধান করছিলেন।  তাঁরা দৃঢ়তার সঙ্গে ক্বিতাল করার জন্য নিজেরা মাঠে নেমেছিলেন, অন্যদের উৎসাহিত করেছিলেন।

ফলে, সাধারণ মুজাহিদ এবং নেতৃস্থানীয়দের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির কোন রাস্তাই অবশিষ্ট ছিল না।

আমেরিকানরা মুজাহিদদের সন্ধান পাবার জন্য আকাশ থেকে লক্ষ লক্ষ লিফলেট ফেলেও সফল হয় নি। এরপরে আমেরিকান সেনাবাহিনী, মুজাহিদদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানোর চেষ্টা করেছিল। সেখানেও তারা ব্যর্থ হয়।

এরপর, বোকা মার্কিন প্রশাসন শাইখ ওসামা বিন লাদেন এর ছবি ছড়িয়ে দিয়ে তাঁকে ধরতে তাদের সমস্ত চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালায়। এখানেও তাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়। আল্লাহ্‌ তায়ালা শাইখকে পরিপূর্ণ সাহায্য করুন[13]! (আমীন)

তিনি যুদ্ধের ময়দান থেকে এসে তাঁর অনুগামীদের কাছে ফিরে না গিয়ে অন্যত্র আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন। ফলে আমেরিকা তাঁর ছবি প্রচার করে (এডিট করে দাড়িবিহীন ছবিও) কিছু করতে পারে নি।

এমনিভাবে তারা মোল্লা ওমর (আল্লাহ্ তা’য়ালা তাঁকে পরিপূর্ণ সাহায্য করুন!) এর একটি কথিত ছবি প্রচার করেছিল। আমেরিকার ভাষায় – ‘মোল্লা ওমরকে আমরা দেখেছি এবং আমরা তার খুব কাছ থেকে ছবি তুলতে সক্ষম হয়েছি’।

কিন্তু এটা আতঙ্কের চেয়ে হাসির বিষয় হিসেবে সবখানে ছড়িয়ে পড়েছিল। কারণ, এটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, ছবিটি মোটেও মোল্লা ওমরের নয়, বরং ইসলামী ইমারত আফগানস্তানের একজন কর্মকর্তার [14]

মুজাহিদদের সন্ত্রস্ত ও বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে সকাল আটটায় আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দিয়ে দৈত্য আকারের বোমারু বিমান ওড়ানো  হয়েছিল। তবে মুজাহিদরা এসকল হুমকির তোয়াক্কা করেননি, ফাঁদেও পা দেননি।

এগুলোর মাধ্যমে আমেরিকার উদ্দেশ্য কখনো অর্জিত হবে না। যতক্ষণ না আমেরিকা গতকালের (আল-কায়েদা ও তালেবান ব্যতিত অন্যান্য) শত্রু এবং আজকের (আল-কায়েদা ও তালেবান) শত্রুদের মধ্যকার পার্থক্যটি খুঁজে না পায়। অবশ্য আমেরিকা নামক “শকুন”টি শিক্ষা গ্রহণ করেছিল এমন সময়, যখন তাদের ডানা ভেঙে গিয়েছিল।

যারা মিডিয়ার খোঁজ খবর রাখেন তারা দেখতে পাবেন, এখন মুজাহিদরা নিজেদের প্রতিরক্ষার চাইতে পাল্টা আক্রমণের দিকে মনযোগ দিয়ে যুদ্ধের ময়দানে লড়ছেন। পূর্ববর্তী দশকগুলোতে সমস্ত সংবাদই নিজেদের মনমতো সাজিয়ে পরিবেশন করা যেত।

কিন্তু যোগাযোগ প্রযুক্তির উত্থানের কারণে এখন কারও পক্ষে তথ্যের একচেটিয়াকরণ সম্ভব নয়। এই বিশেষ কারণটিই মুজাহিদদের সামনে (মিডিয়া ব্যবহার করে) পাল্টা আক্রমণ করার জন্য বিস্তৃত দিগন্তের সূচনা করে দেয়। এটি অপ্রত্যাশিত গতিতে প্রতিপক্ষের মধ্যে ত্রাস ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল।

১৯৯১ সালে সংঘটিত দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় আমেরিকার পক্ষে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারের ক্ষেত্রে আমেরিকাভিত্তিক স্যাটেলাইট চ্যানেল ‘CNN’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। আমেরিকার পক্ষে এটিই একমাত্র মাধ্যম যা সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচার করে। মার্কিন প্রশাসন যেভাবে তাদের জনগণকে যুদ্ধ দেখাতে চেয়েছে সেভাবেই সংবাদ প্রচার করেছে CNN।

কিন্তু, আফগানিস্থান থেকে শুরু হওয়া  নব্য ক্রুসেডে,  আল-জাজিরা , ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে আমেরিকা কী পরিমাণ বিদ্বেষ পোষণ করে – এটি স্পষ্ট করে দিয়েছিল।

বিশেষ করে, আফগানিস্তানে আল জাজিরার সদর দফতরে বোমা হামলার আগ পর্যন্ত আফগান যুদ্ধে আমেরিকার নৃশংসতা ও বর্বরতার চিত্র তুলে ধরছিল। একারণেই আল-কায়েদা, এই বিশেষ চ্যানেলটি বিশ্বের কাছে তার কণ্ঠস্বর হিসেবে ব্যবহার করেছিল। আল-কায়েদা আল-জাজিরাকে তাদের শত্রু আমেরিকার বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল।

এসময়টাতে মুজাহিদরা কিন্তু বেকার বসে থাকেননি পাল্টা জবাবের জন্য যেকোনো পরিকল্পনা অবশ্যই বিজ্ঞান সম্মত এবং মৌলিক নীতিমালার উপর ভিত্তি করে তৈরি করতে হয়। আর একাজের জন্য অনেক তথ্য-উপাত্তের উপর বিস্তর গবেষণা চালাতে হয়। মুজাহিদদের কার্যাবলী ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য ছিল –

১. শত্রুর চিন্তাধারাকে সংজ্ঞায়িত করা। কারণ, শত্রুর প্রচারের শক্তিশালী মাধ্যমগুলো চিহ্নিত করা গেলে, সেগুলোকে গুরুত্ব অনুযায়ী আলাদা করা যাবে। তারপর, এসকল মাধ্যমের মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা সহজ হবে।

২. এই পদক্ষেপগুলো খুবই স্পর্শকাতর। তাই কারও প্রভাব ও আবেগ থেকে এগুলোকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করা। এভাবে নানান পদক্ষেপের মাধ্যমে শত্রুদের পর্যায়ক্রমে আক্রমণ করা। তাদের মাঝে মতানৈক্য তৈরি করার চেষ্টা জারি রাখা।

৩. শত্রুর প্রচারমাধ্যমগুলোর দুর্বল পয়েন্টগুলিতে দৃঢ়ভাবে আক্রমণ করা।

৪. এসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী শত্রুর প্রচারণার মুখোমুখি হওয়া এড়িয়ে চলা।

৫. তথ্য-প্রমাণসহ শত্রুর প্রচারণার জবাব দেওয়া।

৬. শত্রুকে সর্বদা রক্ষণাত্মক করে তোলার লক্ষ্যে, সবর্দা শত্রুর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা।

৭. অনন্য, অনুপম আদর্শ গ্রহণ করা, কারণ এটি জনমত সৃষ্টিতে শক্তিশালী প্রভাব ফেলে।

২০০২ সালের সেপ্টেম্বরের ৯ তারিখ থেকে আল-কায়েদার মিডিয়া লড়াই’এর সক্ষমতা অত্যাচারী আমেরিকার বুঝতে সক্ষম হয়। আল-কায়েদা, আল জাজিরার মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে অডিও টেপ সম্প্রচার করতে সক্ষম হয়েছিল।

৯/১১ হামলায় আল-কায়েদার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ হিসেবে – হামলার প্রথম বার্ষিকীতে প্রচারিত ঐ অডিও টেপটিতে শাইখ উসামা বিন লাদেনের একটি অডিও রেকর্ডিংও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

এই অডিওতে ৯/১১ অপারেশন পরিচালনাকারীদের পরিচিত করে দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের প্রশংসা করা হয়েছিল। সেইসাথে প্রথমবারের মতো আল-কায়েদা  স্পষ্ট এবং দ্ব্যর্থহীনভাবে ৯/১১ হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছিল।

সুস্পষ্টভাবে আক্রমণের দায়িত্ব স্বীকারে বিলম্ব করার কারণ মিডিয়া দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিছু বিশ্লেষকের মতে, শক্তিশালী শত্রুর প্রচারের মুখোমুখি না হওয়ার জন্য এমনটি করা হয়েছে। তবে, এটা তেমন গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নয়।

এরপরে, অক্টোবরের শুরুতে প্রচারিত এক অডিওটেপের মাধ্যমে শাইখ আইমান আল-জাওয়াহিরি আমেরিকার সাথে জোটবদ্ধ পশ্চিমা দেশগুলোকে হুমকি দিয়েছিলেন। এই হুমকি যে শুধু হুমকিই নয় তার প্রমাণ পাওয়া যায় কুয়েতে মর্টার হামলা, ফরাসি ট্যাঙ্কারে বোমা হামলা, ইন্দোনেশিয়ায় বিমান ঘাঁটিতে বোমা হামলা থেকে।

অনেক বিশেষজ্ঞ এই বার্তাটিকে বিপরীত কৌশলগত আক্রমণের সূচনা হিসাবে বুঝেছিল। তারা ব্যাখ্যা করেছিল যে, এই সব কর্মযজ্ঞ, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে একটি বিশেষ অভিব্যক্তি বহন করে। এটি শত্রুর প্রচারণার প্রতিক্রিয়া জানানোর সর্বোত্তম উপায়।

এই হল ঘটনাগুলোর একটির সাথে আরেকটির সম্পর্ক। আমেরিকা আল কায়েদার বিরুদ্ধে বিজয় দাবি করেছিল। মুজাহিদদের অবশিষ্টাংশকে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ক্রমাগত অপারেশন থেকে দূরে রাখার জন্য মিথ্যা হুমকি দিয়েছিল। আমেরিকার এই দাবি ও হুমকির অসারতা প্রমাণ করে তাদেরকে লজ্জায় ফেলে দেবার জন্য এই আক্রমণগুলো করা হয়েছিল।

শাইখ উসামা বিন লাদেনের শেষ অডিওটেপ আমেরিকা ও তার মিত্রদের উপর বজ্রপাতের মত আঘাত হেনেছিল। মুসলিমদের মধ্যে হতাশা ও অস্থিরতার বীজ বপন করার জন্য শাইখ উসামার মৃত্যু হয়েছে বলে সেসময় প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছিল আমেরিকা। তারা শাইখ উসামা বিন লাদেনের কথিত মৃত্যুর পর কয়েক মাস পর্যন্ত গলাবাজি করে গেছে। ঠিক সেই মূহুর্তে শাইখ উসামা বিন লাদেনের প্রত্যাবর্তন ছিল পুরো অন্যমাত্রার।

পশ্চিমা বিশ্বসহ সবাইকে শাইখ বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, চলমান সংঘাতটি কী নিয়ে? এটি বোঝানোর জন্য তিনি দৃঢ় এবং সংক্ষিপ্ত বার্তা পাঠিয়েছিলেন। অডিও টেপটিতে লক্ষণীয় বিষয় ছিল এই যে, শাইখ উসামা বিন লাদেন সম্পূর্ণভাবে আমেরিকার জনগণের কাছে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। আমেরিকার মিত্র সরকারগুলোকেও  ডিঙ্গিয়ে সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন।

শাইখ উসামা, আমেরিকা ও তার মিত্রদের জনগণকে নিজ নিজ সরকারের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার ব্যাপারে সতর্ক করেন। শাইখ বলেন, ‘যদি জনগণ তাদের সরকারগুলোকে অন্যায় আচরণ থেকে বিরত রাখতে না পারে তাহলে তারাও (জনগণ) তাদের প্রাপ্য শাস্তি পাবে’।

শাইখ উসামা বিন লাদেনের ভাষণে অনেক চিন্তাশীল বাক্যও অন্তর্ভুক্ত ছিল যা নিঃসন্দেহে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। এই বাক্যগুলির মধ্যে একটি হল, “নিরাপত্তা নামক রাস্তাটির সূচনা হয় আগ্রাসন উঠিয়ে নেবার মাধ্যমে”।

তিনি এই কথাটিও বলেছিলেন,”সময় এসেছে লেনদেন চুকিয়ে নেবার । সূতরাং তোমরা যেমন হত্যা করছ, তোমাদেরও তেমনিভাবে হত্যা করা হবে। তোমরা যেমন বোমা নিক্ষেপ করছ, তোমাদের ওপরও তেমনই বোমা নিক্ষেপ করা হবে। তোমরা ঐ সুসংবাদ গ্রহণ কর, যা তোমাদেরকে কষ্ট দেয়।”

এই কথাগুলো অনেক ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। [15]

মার্কিন প্রশাসনের লোকদেরকেও এই ভাষণটি স্পর্শ করেছিল। পর্যবেক্ষকদেরকে অবাক করে দিয়েছিল। শাইখ উসামার বার্তা দেবার পদ্ধতিটি শত্রুর কূটকৌশলের জবাব দেবার বুদ্ধিদীপ্ত উপায় হিসাবে গণ্য করা হয়।

এই বার্তার পরোক্ষ প্রতিক্রিয়া হল এর মাধ্যমে মার্কিন নেতাদের নৃশংস সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম উন্মোচিত হয়েছিল। সম্ভবত, এই একটি অডিওবার্তাই হোয়াইট হাউস গ্যাংকে অতুলনীয় ত্রাসের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল।

যেহেতু শাইখ উসামা বিন লাদেন এর আগে জাতির উদ্দেশ্যে সম্বোধন করে কিছু বলেননি, তাই এই বক্তব্যটিই আমেরিকার জন্য মূল হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এভাবেই মুজাহিদগণ শত্রুর বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে মোকাবেলার চেষ্টা করেছিলেন এবং অনেক সফলতাও পেয়েছিলেন।

অবশ্যই আমেরিকা তার অনিবার্য পরিণতিতে পৌঁছানোর পূর্বে হার মানবে না। বিশেষত যখন তার মধ্যে পাগলামি রয়েছে। এবং বড় ধরনের বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। তারা অবশ্যই মিডিয়া এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের গতি বাড়ানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।

সম্প্রতি তাদের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের কৌশলে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। তারা অনলাইন মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিতে তাদের পক্ষে বলার জন্য বিভিন্ন মানুষকে দাঁড় করাচ্ছে।

মিডিয়ায় মুজাহিদদের প্রভাব বা উপস্থিতি কমিয়ে দেবার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। যেমন: আল-কায়েদার তৃতীয় ব্যক্তি বলে দাবি করে এমন একজনের বার্তার আবির্ভাব ঘটিয়েছে।

মার্কিন সার্চ ইঞ্জিন দ্বারা সম্প্রতি আরেকটি কৌশলগত পরিবর্তন তারা এনেছে। মুজাহিদিনদের মধ্যে বিরোধ তৈরি করার জন্য তারা কিছু প্রবন্ধ লিখেছে। এই লেখাগুলো তারা ইন্টারনেটে বিশেষ বিশেষ ওয়েবসাইটে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

মুজাহিদদের মধ্যে মতবিরোধের বীজ বপন করার চেষ্টা করছে। এগুলি এমন সব সাইট যা মুজাহিদদের মাঝে মিথ্যা ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে থাকে।

সাম্প্রতিক এরকম ঘটনার একটি উদাহরণ হল – আযযাম (শহীদ ড. আব্দুল্লাহ্ আযযাম রহিমাহুল্লাহর নামে পরিচালিত) নামে সন্দেহজনক ইংরেজি সাইটের সন্ধান পাওয়া। এটি ইন্টারনেটে ভালো সাইটগুলোকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ধ্বংস করার জন্য আমেরিকার পদক্ষেপগুলির একটি।

এছাড়াও, মাঝে মাঝে গুয়ান্তানামোয় আটকদের ছবি ফাঁস করা হয় (আল্লাহ্ তা’য়ালা তাঁদের পরিবারের মঙ্গল করুন)। মার্কিন সামরিক পরিবহণ বিমানের মাধ্যমে আটককৃতদের নির্বাসনস্থলে নিয়ে যাবার সময়কার অত্যন্ত অপমানজনক পরিস্থিতির ছবি মাঝে মাঝে উন্মোচন করা হয়। এটাও আমেরিকার মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের একটি অংশ।

আমেরিকার আরেকটি কৌশল হল পূর্বের প্রচেষ্টাগুলির গ্লানি হ্রাস করার জন্য মুসলমানদের সন্ত্রস্ত করার চেষ্টা করা।  আমেরিকা আরো একটি কৌশল প্রয়োগ করে, তা হলো মুসলিমদের মাঝে ব্যাপকহারে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেওয়া। তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করে – যতটা সম্ভব মুসলিমরা যেন চলমান যুদ্ধ থেকে বিচ্যুত থাকে । আমেরিকানদের  প্রচারিত অনৈতিক জীবনদর্শনকেই যেন মডেল হিসেবে গ্রহণ করে।

কৌশলগত দিক থেকে আমেরিকা, তথ্যের উত্সগুলি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য দ্রুত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে চাইছে। শিক্ষা পাঠ্যক্রমের বিষয় হিসেবে তারা এটাকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে। এই কৌশলটিকে তারা Information Dominance বা‘তথ্যের আধিপত্য’ বলে অভিহিত করছে।[16]

তাই, এটাকে অনুধাবন করা একান্তই জরুরী এবং এর জন্য পূর্ণ শক্তি কাজে লাগাতে হবে। ৯০ এর দশকে মার্কিন বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে আগত যুদ্ধগুলিতে তারা বিজয়ী হবে না, যারা বৃহত্তম বোমা নিক্ষেপ করবে। বরং তারাই বিজেতার আসন গ্রহণ করবে, যারা “তথ্যের উৎস” নিয়ন্ত্রণ এবং নিজের মতো করে উপস্থাপন করতে পারবে।

এই উপস্থাপনা অনেকসময় এমন হবে যার সাথে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক থাকবে না। এখন পর্যন্ত যা প্রকাশিত হয়েছে তা থেকে বুঝা যাচ্ছে মুজাহিদরা সাইবার যুদ্ধে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছেন। এটাই কথা ও কাজে বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে ইনশা আল্লাহ।

সুত্র- আল-আনসার ম্যাগাজিন, ২১ তম সংখ্যা, ১৫ রামাদান ১৪২৩ হিজরি, ২০ নভেম্বর ২০০২ ইংরেজি পৃষ্ঠা: ৯-১৫

[1] আমেরিকার একটি যুদ্ধ জাহাজ

[2] New York Journal এর উইলিয়াম রেনডলফ  এবং New York World এর জোসেফ পুলিৎযার

[3] সে সময় কিউবাতে আমেরিকার ব্যবসায়িক স্বার্থ ছিল। অন্যদিকে, স্পেন কিউবা দখল করে রেখেছিল। কিউবার জনসাধারণ এই দখলদারিত্বের প্রতিবাদ করে আসছিল। আমেরিকা নিজেরদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার জন্য কিউবা থেকে স্পেনকে সরাতে চাইছিল। ১৮৯৮ সালে USS Maine ডুবে যাওয়াকে ইস্যু বানিয়ে তারা স্পেনের উপর হামলা চালায়। এই যুদ্ধ আমেরিকা-স্পেন যুদ্ধ নামে পরিচিত।

[4] (1995)  وسائل الإعلام والسياسة الخارجية ، ترجمة د. محمد مصطفی غنيم عالم الكتب

[5] Noam Chomsky, Propaganda and the Public Mind (South End Press 2001)

[6]  জাপান কর্তৃক মার্কিন নৌঘাঁটির উপর হামলা।

[7]  একধরণের মেডিকেল এপারেটাস যার মধ্যে নবজাতক অসুস্থ বাচ্চাদের রাখা হয়

[8] Alvin Toffler, from a transcript of The I-Bomb, a documentary produced for BBC Horizon by Broadcasting Support Services Produced by Kate O’Sullivan and edited by Peter Millson.

[9] Libicki, Martin. “What is Information Warfare??” article for the Institute for National Strategic Studies.

[10] Stephen Endicott and Edward Hagerman, The United States and Biological warfare: Secrets from the Early Cold War and Korea (Bloomington 1999).

[11] এটাও ছিল একটি মিথ্যে অজুহাত।

[12] Libicki, Martin. “What is Information Warfare? article for the Institute for National Strategic Studies.

[13] মোল্লা ওমর রহিমাহুল্লাহ  এবং  শাইখ  উসামা রহিমাহুল্লাহর শাহাদতবরণের (ইনশাআল্লাহ) বহু পূর্বে এই প্রবন্ধটি লিখা হয়েছিল।

[14] Newsweek October 14, 2002.

[15] انظر نشرة الحركة الإسلامية للإصلاح العدد 341 بتاريخ 18 نوفمبر 2002

[16] Arquilla and Ronfeldt “Cyberwar is Coming!”,RAND.

(Visited 96 times, 1 visits today)